উপকূলীয় অঞ্চলের মাটির গভীরে সুপেয় পানির ভান্ডারের সন্ধান

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১৮:২৯, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | আপডেট: ১৮:২৯, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

উপকূলীয় অঞ্চলের মাটির গভীরে সুপেয় পানির ভান্ডারের সন্ধান

বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় অগভীর স্তরের ভূগর্ভস্থ পানি লবণাক্ত হওয়ায় কৃষকেরা দীর্ঘদিন ধরে কেবল বর্ষানির্ভর আমন ধানের ওপর নির্ভর করে আসছেন। পানীয় জলের জন্য বৃষ্টির পানি পুকুরে সংরক্ষণ করাই তাঁদের প্রধান ভরসা, যা অনেক ক্ষেত্রে শুষ্ক মৌসুম শেষ হওয়ার আগেই ফুরিয়ে যায়। এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের মধ্যেই নতুন আশার খবর দিয়েছে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশের গবেষকদের একটি যৌথ গবেষণা।

নেচার আর্থ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণায় জানানো হয়েছে, উপকূলীয় অঞ্চলের মাটির গভীরে বিশাল সুপেয় পানির ভান্ডার রয়েছে, যা মূলত শেষ তুষারযুগের পলিস্তরের সঙ্গে সম্পর্কিত। লবণাক্ত পানি সুপেয় পানির তুলনায় বেশি বিদ্যুৎ পরিবাহী—এই বৈশিষ্ট্য কাজে লাগিয়ে গবেষকেরা বিদ্যুৎ–চৌম্বকীয় (ইলেকট্রোম্যাগনেটিক) পদ্ধতিতে ভূগর্ভস্থ পানির স্তরের মানচিত্র তৈরি করেন।

গবেষণা পরিচালনার জন্য যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রায় ৬৪০ কেজি যন্ত্রপাতি বাংলাদেশে আনা হয়। কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যামন্ট রিসার্চ অধ্যাপক মাইকেল এস স্টেকলাসহ ১২ সদস্যের একটি দল ‘এমভি কোকিলমনি’ নামের একটি নৌযানে করে সুন্দরবনের ভেতরে ২৫ দিনব্যাপী অভিযান চালায়। সুন্দরবনের শ্বাসমূল ও ঘন ঝোপঝাড়ের ভেতর দিয়ে নির্দিষ্ট দূরত্বে প্রায় তিন ফুট লম্বা ম্যাগনেটোমিটার পুঁতে সেন্সর বসাতে হয়েছে। বাঘের আশঙ্কায় গবেষকেরা সব সময় সশস্ত্র প্রহরীসহ দলবদ্ধভাবে কাজ করেন। অভিযানের সময় বাঘের পায়ের ছাপ দেখা গেলেও সরাসরি মুখোমুখি হতে হয়নি; তবে হরিণ, কুমির, বন্য শূকর ও বানরের উপস্থিতি ছিল নিয়মিত।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অগভীর লবণাক্ত স্তরের নিচেই সুপেয় পানির স্তর রয়েছে, তবে সেটি সর্বত্র একটানা নয়। প্রায় ২০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে একটি লবণাক্ত অংশ এই ভান্ডারকে দুই ভাগে বিভক্ত করেছে। গবেষকেরা জানিয়েছেন, এটি মূলত তুষারযুগে গঙ্গা নদীর তৈরি একটি প্রাচীন উপত্যকা, যেখানে পরবর্তীতে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ায় লবণাক্ত পানি প্রবেশ করে। কিন্তু উপত্যকার দুই পাশের উঁচু ভূস্তরে আগের সুপেয় পানি অক্ষত রয়ে গেছে।

এত দিন এই অঞ্চলে গভীর নলকূপ স্থাপন অনেকটাই ভাগ্যের ওপর নির্ভর করত—হাজার ফুট খনন করেও অনেক সময় লবণাক্ত পানি পাওয়া যেত। নতুন এই মানচিত্রের ফলে এখন নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব হবে কোথায় খনন করলে সুপেয় পানি মিলবে। অধ্যাপক স্টেকলা বলেন, ভূগর্ভস্থ সুপেয় পানির অবস্থান কোনো দৈব বিষয় নয়; বরং তা তুষারযুগের ভূতাত্ত্বিক কাঠামোর সঙ্গে সম্পর্কিত। এই গবেষণা ভবিষ্যতে উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের পানিনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

আরও পড়ুন