রোববার   ২৬ জুন ২০২২ ||  আষাঢ় ১১ ১৪২৯ ||  ২৬ জ্বিলকদ ১৪৪৩

ACI Agri Business

হাটখোলার হালখাতা

ড. এম এ সাত্তার মণ্ডল

প্রকাশিত: ১২:২১, ১৬ এপ্রিল ২০২২

পহেলা বৈশাখে গিয়েছিলাম গজারিয়া হাটখোলায়। বাল্যবন্ধু অবসরপ্রাপ্ত কৃষনারডাংগী হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক সুকুমার সাহার আড়তে গেলাম তারই হালখাতার নিমন্ত্রণে। রাখিমালের ব্যবসা করে পৈত্রিকসূত্রে। তিনখানা লাল মলাটের হিসাবের খাতা- জমা খাতা, তেরেজ খাতা ও টালি খাতা হালনাগাদ করেছে সকাল থেকে। ঘরদোর, গদি, দাড়িপাল্লা সব কিছু ঝেড়ে ধুয়ে মুছে পরিস্কার করেছে তার সরকারকে (হিসাব রক্ষক) নিয়ে।  হালখাতার সম্মানে একটা তরমুজ কিনে নিয়ে গেলাম।  বন্ধুও রোজার কারণে কিছু খাওয়াতে না পেরে বড় একটা স্প্রাইটের বোতল দিয়ে দিলো।

গ্রামীণ অর্থনীতি বদলে গেছে। আগে মানুষ দোকান থেকে বাকি খেতো। তাই পহেলা বৈশাখে হালখাতার দিন বাকি বকেয়া আদায়ের জন্য হালখাতার নিমন্ত্রণ দেয়া হতো, যাতে ক্রেতাগণ আংশিক বা পুরোপুরি বাকি বকেয়া মিটিয়ে খুশিতে মিস্টিমুখ করে যায়। 

শৈশবে কত যে রসগোল্লা নিমকি খেয়েছি ধীরেন কাকার দোকানে। এখন মানুষের আয় বেড়েছে। বাকি খাওয়ার দরকার পড়েনা। এখন নগদে বেচাকেনা হয় বেশি। বিকাশও আসছে।  আগের মত খাতায় বাকি লেখা নেই, হালখাতাও তেমন হয়না। তবে আমেজটা আছে।

অনেকেই নব বর্ষের সকালে বাড়িতে পূজো অর্চনা করেছে। মুসলমান ব্যবসায়ী কেই কেউ মিলাদ পড়িয়ে মিস্টিমুখ করে যার যার মত করে নতুন হিসাবের খাতা হালনাগাদ করেছে। মিস্টি খাওয়া হয়েছে একে অপরের দোকান গদিতে গিয়ে। এইতো ফারুক চেয়ারম্যান সুকুমারের আড়তে এলো। আমাকে সালাম দিলো। সুকুমার গিয়েছিলো তার গুদামে শুভেচ্ছা জানাতে। মিস্টিমুখ করে ফিরে এলো। অসাম্প্রদায়িক সম্পর্কের কী চমৎকার নিদর্শন।

আমার ছোটবেলার হাটটি দেখছিলাম ঘুরে ঘুরে বন্ধু সুকুমারকে নিয়ে। হরেক রকমের শাক সবজি খাদ্য পণ্য উঠেছে। সখ করে পরিচিত এক কৃষকের কাছ থেকে  করোল্লা কিনলাম কেজি পাঁচচল্লিশ টাকা দরে। ইচ্ছে করে আরও পাঁচ টাকা বেশি দিয়েছি। সকালে  বেপারিরা কিনে নিয়েছে পয়ত্রিশ টাকা দরে। পাঁচ কেজি পেঁয়াজ কিনলাম একশত টাকা দিয়ে। তরতাজা ঢেড়স সকালে বিক্রি হয়েছে তিরিশ টাকা দরে। এখন দুপুরের কড়কড়া রোদে বিক্রি হচ্ছে বিশ টাকা দরে। রোজার মাস। বেগুন কেজি প্রতি ষাট টাকা। বিক্রেতা কৃষকের কাছ থেকে কিনেছে পঞ্চাশ টাকা দরে। কৃষক খুশি। শহরের স্বভাব তো, তাই ভাবছিলাম আরও কমে পাওয়া যায় কিনা।  ফরিদপুর শহরে কেজি প্রতি পাঁচ দশ টাকা বেশি বিক্রি হবে। তা না হলে বেপারি সাহেবের পেট চলবে কিভাবে? ঢাকা শহরে কেজিতে আরও  দশ পনেরো টাকা বেশি দিতে হবে পরিবহণ, খাজনা, বেপারির সময়, শ্রম, নষ্ট পচন এসবের খরচ হিসাবে। 'মধ্যস্বত্বভোগীদের' কিছু না দিতে চাইলে প্রতিদিন শহর থেকে গজারিয়া হাটে আসতে হবে। সোজা অর্থনীতি।

নব বর্ষের শুভেচ্ছা জানাতে গিয়েছিলাম মাখন কাকার বাড়িতে। বার্ধক্যের দুর্বলতা আছে, কিন্তু মনের জোর ও স্নেহমমতা কাকা কাকীর আগের মতই আছে। ফরিদপুর ডেইরি ফার্মের পরিচালক অরুনের বাবা মা। অরুন সকাল বেলা এক কেজি ছানা সন্দেশ নিয়ে হাজির আমার বাড়িতে। ওর সংগেই গেলাম ওদের বাড়িতে। একটা তরমুজ নিলাম সাথে। মাখন কাকা পহেলা বৈশাখের পূজা আরাধনা ও হিসাবের খাতাপত্র হালনাগাদ করেছেন বাড়িতে বসেই। আমি রোজা ছিলাম বলে বরাবরের মত কিছু খাওয়াতে পারলেননা।  কাকীর কী যে  আফসোস। কাকীমা এক কাধি কচি ডাব ও কয়েকটি পাকা বেল দিয়ে দিলেন গাড়িতে। অরুনের বৌ সীমা আমাকে চালতার আচার খাওয়াবে শুনে জিভে জল আসছিলো। বন্ধু সুকুমারের বৌ একদিন নিরামিষ রেধে খাওয়াবে সে আমন্ত্রণ গ্রহণ করে বাড়ির দিকে রওনা দিলাম। আর ভাবলাম, শৈশব থেকে দেখা বাঙালির সেই অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক বন্ধন টিকে থাকুক চিরকাল।
 

লেখক: সাবেক উপাচার্য, প্রাক্তন এমিরেটাস অধ্যাপক, কৃষি অর্থনীতি ও গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞান অনুষদ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।

Advertisement
Advertisement