সোমবার   ২৫ অক্টোবর ২০২১ ||  কার্তিক ১০ ১৪২৮ ||  ১৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

ACI Agri Business

সয়ামিল রপ্তানি আদেশ বাতিল না হলে বৃহত্তর আন্দোলন-ফিআব

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২০:৪৮, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২১

ভারতে সয়াাবিন মিল রপ্তানি বন্ধ না হলে দেশের পোলট্রি, মৎস্য ও পশু খাদ্য উৎপাদনকারী-খামারিদের নিয়ে বৃহত্তর কর্মসূচি দেয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে ফিড ইন্ডাস্ট্রিজ এসোসিয়েশন বাংলাদেশ-ফিআব। পোলট্রি, মৎস্য ও পশু খাদ্য তৈরির অন্যতম এ কাঁচা উপকরণ বন্ধ করে দেশের ফিড শিল্প ও খামারিদের বাঁচানোর আহ্বান জানিয়েছেন সংগঠনটির নেতারা।

বুধবার (২২ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত ‘মিট দ্যা প্রেস’ অনুষ্ঠানে ফিআব নেতারা বলেন, সয়াবিন মিল বন্ধে কৃষি মন্ত্রণালয় এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মতামতকে উপেক্ষা করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তে বিস্ময়কর ও দুঃখজনক। সয়াবিনের উচ্চমূল্যে দেশের প্রায় ৫০টি ফিডমিল ইতিমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে এবং আরো অনেক বন্ধ হওয়ার পথে বলেও জানান তারা। সম্প্রতি ‘সয়াবিন মিল’ রপ্তানির অনুমতি প্রদান করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এ নিয়ে খামারি ও উদ্যোক্তাদের মাঝে উদ্বেগের কথা জানাতেই আয়োজন করা হয় এ সংবাদ সম্মেলনের। 

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পড়েন সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক মো. আহসানুজ্জামান। এতে আরো বক্তব্য দেন সংগঠনটির সভাপতি এহতেশাম বি. শাহজাহান, বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাষ্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিল (বিপিআইসিসি) ও ওয়ার্ল্ড’স পোল্ট্রি সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন-বাংলাদেশ শাখা (ওয়াপসা-বিবি) এর সভাপতি মসিউর রহমান, সহ-সভাপতি শামসুল আরেফিন খালেদ, ফিড ইন্ডাষ্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ –সদস্য সাইফুল আলম খান এবং আবু লুৎফে ফজলে রহিম খান।

“বাংলাদেশী গণমাধ্যমে “সয়াবিন মিল রপ্তানি রপ্তানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার” এমন খবর জাতীয় সংবাদ-মাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর থেকেই স্থানীয় সয়াবিন মিল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সয়াবিন মিলের দাম কেজি প্রতি ১০-১২ টাকা বৃদ্ধি করেছে; সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে; ফলে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি হয়েছে। সয়াবিন মিলের সংকটের কারণে অনেক ফিডমিলের উৎপাদন ব্যহত হচ্ছে; উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে। প্রচুর খামার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে; খামারি পর্যায়ে অসন্তোষ দেখা দিচ্ছে” জানান ফিআব নেতৃবৃন্দ।

সাশ্রয়ী মূল্যে দেশের মানুষের জন্য ডিম, দুধ, মাছ, মাংসের উৎপাদন ও যোগান নিশ্চিত করছে দেশীয় পোল্ট্রি, মৎস্য ও ডেইরি খাত। সাম্প্রতিক সময়ে হাঁস-মুরগি, মৎস্য ও গবাদিপশুর খাদ্য তৈরির অত্যাবশ্যকীয় একটি উপকরণ ‘সয়াবিন মিল’ রপ্তানির অনুমতি প্রদান করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এ নিয়ে খামারি ও উদ্যোক্তাদের মাঝে উদ্বেগ-উৎকন্ঠা বিরাজ করছে।

বক্তারা বলেন, পোল্ট্রি, ডেইরি ও প্রাণিখাদ্য তৈরিতে প্রধান যে কাঁচামালগুলো ব্যবহৃত হয় তার মধ্যে- ভুট্টা, সয়াবিন মিল, গম, আটা, ময়দা, ভাঙা চাউল, চাউলের কুড়া, ফিশ মিল, সরিষার খৈল, তৈল, ভিটামিন, মিনারেল ইত্যাদি অন্যতম। এর মধ্যে দু’টি উপকরণ সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় (১) ভ‚ট্টা এবং (২) সয়াবিন মিল। ভ‚ট্টার ব্যবহার প্রায় ৫০-৫৫ শতাংশ এবং সয়াবিন মিলের পরিমান প্রায় ২৫-৩৫ শতাংশ পর্যন্ত হয়ে থাকে। বাংলাদেশে বিগত কয়েক বছর থেকে ভ‚ট্টার আবাদ বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে দেশীয় মোট চাহিদার প্রায় ৫০ শতাংশ ভ‚ট্টা দেশে উৎপাদিত হচ্ছে। তবে সয়াবিনের উৎপাদন নিতান্তই নগণ্য।

তাঁরা বলেন, আমাদের দেশের ফিড মিলগুলোতে ব্যবহৃত কাঁচামালের অধিকাংশই বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করতে হয়। বর্তমানে চাহিদাকৃত ‘সয়াবিন মিল’ দেশীয় সয়াবিন তৈল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ছাড়াও ভারত, আমেরিকা, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা প্রভৃতি দেশ থেকে আমদানি করা হয়ে থাকে। আমাদের দেশে ‘সয়াবিন মিল’ এর মোট চাহিদা বছরে প্রায় ১৮-২০ লক্ষ মেট্রিক টন। এর মধ্যে ৭৫-৮০ ভাগ দেশীয় সয়াবিন তৈল উৎপাদকারি প্রতিষ্ঠান হতে এবং অবশিষ্ট ২০-২৫ ভাগ আমদানির মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়। এখানে আরও একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, দেশে উৎপাদিত সয়াবিন মিলের একমাত্র ক্রেতা হচ্ছে পোল্ট্রি, মৎস্য, ক্যাটল ও ফিড উৎপাদনকারি প্রতিষ্ঠান ও সাধারন খামারিবৃন্দ।

সয়াবিন মিলের রপ্তানির সিদ্ধান্তে খামারিরা উদ্বিগ্ন কারন ডিম, মাছ, মুরগি উৎপাদনে মোট খরচের প্রায় ৭০-৭৫ শতাংশ খরচই হয় ফিড ক্রয় বাবদ। তাই ফিডের মূল্য বৃদ্ধি পেলে খামারিদের উৎপাদন খরচ বাড়ে; অন্যদিকে খরচের বিপরীতে পণ্যের নায্য দাম না পাওয়ায় বড় অংকের লোকসানের মুখে পড়তে হয় তাঁদের।

বক্তারা আরো বলেন, দেশের মানুষের পুষ্টি চাহিদা পূরণের কথা বিবেচনায় নিয়ে সাশ্রয়ীমূল্যে সয়াবিন তৈল, পোল্ট্রি, মৎস্য ও গরুর খাদ্যের প্রধান উপাদান সয়াবিন মিলের সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য সরকার শূণ্য শুল্কে বা করমুক্ত সুবিধায় ‘সয়াবিন সীড’ আমদানির অনুমতি প্রদান করেছেন। ‘সয়াবিন সীড’ থেকে সয়াবিন তৈল বের করার পর অবশিষ্ট খৈল থেকে তৈরি হয় ‘সয়াবিন মিল’। দেশের মানুষের স্বার্থে শূণ্য শুল্ক সুবিধায় আনা সেই সয়াবিন সীড থেকে উৎপাদিত সয়াবিন মিলই এখন ৩-৪টি সয়াবিন তৈল উৎপাদনকারি প্রতিষ্ঠান মুনাফার স্বার্থে রপ্তানি করছে। অতীতে কখনও ভারতে সয়াবিন সীড কিংবা সয়াবিন মিল রপ্তানি হয়নি বরং ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রায় প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য পরিমান সয়াবিন মিল আমদানি করা হয়ে থাকে।

তাঁরা জানান, অতীতে চাহিদা মেটাতে সিংহভাগ সয়াবিন মিল বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা হলেও এলসি করা, অতিরিক্ত জাহাজ ভাড়া, চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য খালাসে জটিলতা, ল্যাব টেস্টের জটিলতা, বিলম্ব মাশুল, ইত্যাদি নানাবিধ জটিলতার কারণে সয়াবিন মিল আমদানির পরিমান সাম্প্রতিক বছরগুলো ক্রমান্বয়ে  হ্রাস পেয়েছে।

আমাদের উদ্বৃত্ত থাকলে রপ্তানি করতে কোন অসুবিধাই ছিলনা কিন্তু দেশের চাহিদা যখন দেশীয়ভাবে পূরণ করা যাচ্ছে না; তখন রপ্তানির সিদ্ধান্ত কেন- এমন প্রশ্ন রেখে পোলট্রি নেতৃবৃন্দ বলেন,  বর্তমানে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা থেকে সয়াবিন মিল আমদানি করতে হলে এলসি করা থেকে শুরু করে বন্দরে মাল এসে পৌঁছানো পর্যন্ত সময় লাগে প্রায় ৫০ দিন। যুক্তরাষ্ট্র থেকে সময় লাগে ৭০ দিন। ভারত থেকে সড়কে ৭-১০ দিন, কনটেইনারে ১৫-২০ দিন। বিশ্ববাজারে এবং সেই সাথে পাশ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারতে সয়াবিন মিলের দাম বেড়ে যাওয়ায় সে দেশের পোল্ট্রি, ডেইরি ও মৎস শিল্প রক্ষা করতে এবং স্বল্পতম সময়ে বাংলাদেশ থেকে সয়াবিন মিল আমদানির জন্য আগ্রহ বেড়েছে ভারত, নেপাল প্রভৃতি দেশের ফিড প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর।

পোলট্রি নেতৃবৃন্দ বলেন, বাংলাদেশ হতে নেপাল ও ভারতে সয়াবিন মিল রপ্তানি শুরুর সাথে সাথে আমরা বাণিজ্য, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, কৃষি ও খাদ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসমূহে অবিলম্বে সয়াবিন মিল রপ্তানি বন্ধের জন্য আবেদন জানাই। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয়, খাদ্য মন্ত্রণালয় হতে সয়াবিন মিল রপ্তানি বন্ধের সুস্পষ্ট মতামতসহ বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে চিঠি প্রদান করলে এগুলোর কোন কিছুই আমলে না নিয়ে একতরফা ভাবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় রপ্তানির সিদ্ধান্তে অনঢ় রয়েছে এবং ভারত ও নেপালে সয়াবিন মিলের রপ্তানি চালু রয়েছে। শুধু তাই নয়, কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তর সয়াবিন মিল বন্ধের আদেশ প্রদান করলেও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপের কারণে তা পুনরায় প্রত্যাহার করা হয়েছে।

বাণিজ্য উন্মুক্ত থাকা সত্ত্বেও নিজের দেশের স্বার্থ, দেশীয় শিল্পের সুরক্ষার স্বার্থে অনেক দেশই আমদানিযোগ্য বিভিন্ন পণ্যের ওপর নানা ধরনের কর ও শুল্ক আরোপ করার মাধ্যমে আমদানি নিরুৎসাহিত করে থাকে। এমনকি অনেক সময় রপ্তানিও বন্ধ করে দেয়। ভারতেও অভ্যন্তরীণ সংকট ও মূল্য বৃদ্ধি হলে চাউল, পেঁয়াজসহ অন্যান্য পণ্যের রপ্তানি বন্ধ করে দেয়া হয়; অথচ আমাদের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় অন্য দেশের শিল্পের স্বার্থে রপ্তানি উন্মুক্ত করে দিয়ে কার্যত দেশীয় ডিম, দুধ, মাছ, মাংস ও ফিড উৎপাদনকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে

Advertisement
Advertisement