বুধবার   ২৮ অক্টোবর ২০২০ ||  কার্তিক ১৩ ১৪২৭ ||  ১১ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

ACI Agri Business

আত্মকথন- দ্বিতীয় পর্ব

স্বপ্নের স্কলারশিপ, অতঃপর স্বপ্নভঙ্গ

প্রফেসর ড. এ এস মাহফুজুল বারী

প্রকাশিত: ০০:৩১, ২৭ জুন ২০২০

তিন যুগ আগে ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্যাথলজি বিভাগে সহকারী প্রফেসর হিসেবে উন্নীত হই। এরপর হতেই মূলত উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য কমনওয়েলথের অন্তর্ভুক্ত দেশ কানাডা অথবা ইংল্যান্ডে পিএইচডির করার লক্ষে এডমিশনের জন্য শুধুমাত্র ভেটেরিনারি প্যাথলজির প্রফেসরদের সাথে যোগাযোগ শুরু করেছিলাম। সেই সময়ে একটা একটা করে সাধারণ "টাইপ রাইটারে" চিঠি টাইপ করে এয়ার মেইলে পোস্ট করা শুরু করলাম। সে ছিল এক কঠিন জামানা, ডিজিটালের কোন কম্পিউটার ছিল না।

আমার প্রথম চিঠিটি লিখেছিলাম কানাডার ইউনিভার্সিটি অফ গুয়েল্ফের এক ভেটেরিনারি প্যাথলজির প্রফেসরের কাছে। উনার নামটা এই মুহূর্তে আর মনে পড়ছে না। আমি কৃতজ্ঞ চিত্তে স্মরণ করতে চাই মেডিসিন বিভাগের প্রফেসর ডঃ সামাদ স্যারকে অনুরোধ করার পর স্যার আমাকে ঐ প্রথম চিঠিটি ড্রাফ্ট করে দিয়েছিলেন ।আমার চিঠিতে আমার বায়োডাটা এবং পিএইচডির রিচার্জ প্ল্যান টা পেয়ে ঐ প্রফেসর তা পর্যবেক্ষণ করেন এবং আমার পিএইচডির সুপারভাইজার হিসাবে কাজ করতে সম্মতি পত্র দিয়ে দিলেন তবে একটা শর্ত দিলেন তা হল আমাকে অবশ্যই আমার নিজের ফাইনান্সিয়াল সাপোর্ট সহকারে যেতে হবে এবং ল্যাবরেটরি রিসার্চ এর খরচ উনি বহন করবেন, যদি রাজি থাকে তবেই উনি সুপারভাইজার হিসাবে কাজ করতে রাজি আছেন। আমি তো আসলে এটাই চেয়েছিলাম এবং সাথে সাথেই পরবর্তী পোস্টে আমি ওনাকে আমার সম্মতি দিয়ে জানিয়ে দিলাম দিলাম। এখন আমার প্রয়োজন ফাইনান্সিয়াল সাপোর্ট ।

আমি ওই বছরই কমনওয়েলথ স্কলারশিপ কমিশনে এপ্লাই করলাম, সাথে প্রফেসরের ঐ চিঠিটি সংযুক্ত করে দিলাম যাতে আমার কেস টা একটা শক্ত ফাইনান্সিয়াল সাপোর্টের জন্য একটি শক্ত অবস্থানে থাকে। আল্লাহর রহমতে আমি ঐ বছরই কমনওয়েলথ স্কলারশিপ পেয়ে গেলাম। আমার যে কানাডায় এডমিশন নিশ্চয়তা আছে সে বিষয়ে প্রফেসরের ঐ চিঠিটি সংযুক্ত করেছিলাম সম্ভবত এটাই আমাকে কমনওয়েলথ স্কলারশিপের সিলেকশন পেতে সহযোগিতা করেছিল। যাহোক কমনওয়েলথ কমিশন হতে কানাডার ওই প্রফেসর আমার বিষয়ে চিঠি দিয়ে জানিয়ে দিলেন। ইউনিভার্সিটি অফ গুয়েল্ফে আমার এডমিশন ও কনফার্ম হয়ে গেল।সেপ্টেম্বরের ২৫ তারিখে আমার ও আমার সহধর্মীনির ফ্লাইট কনফার্ম হয়ে গেল। 

আমার সহধর্মিনী ফরিদা ইয়াসমিন বারীর ঐ বছরের নভেম্বরেই তার ডিভিএম ফাইনাল পরীক্ষা শুরু। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম ফরিদা ফাইনাল পরীক্ষা শেষ করেই কানাডায় চলে আসবে। ফরিদার ফাইনাল পরীক্ষার পূর্ব মুহূর্তে ওকে বাংলাদেশ রেখে আমার কানাডায় যাওয়াটা খুব একটা আনন্দঘন ছিল না। কিন্তু এছাড়া আর অন্য কোন উপায়ও ছিল না। 

ঐ বছর কানাডিয়ান কমনওয়েলথ ফেলোশিপে বাংলাদেশি যে ১০ জন শিক্ষক বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় হতে সিলেকশন পেয়েছিলেন তার মাঝে আমাদের বাকৃবি হতেই আমরা চারজন ছিলাম। আমি সহ, কৃষি অনুষদ এর ক্রপ বোটানির আমার বন্ধু মাহবুব, কৃষি অর্থনীতির আরেক বন্ধু রাখাল চন্দ্র সরকার, আর মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের ফিশারিজ বায়োলজির বড় ভাই নজরুল ইসলাম।

কানাডায় যাবার পূর্বে কানাডিয়ান হাই কমিশনার আমাদের সকল ফেলোদেরকে ফ্যামিলির সহকারে কানাডিয়ান হাইকমিশনে একটা ফেয়ারওয়েল পার্টিতে আমন্ত্রণ জানালেন। আমি ও আমার স্ত্রী যথারীতি সেখানে সবার সঙ্গেই যোগদান করলাম। পরের দিন The Observer পত্রিকায় ফলাও করে ছবি সহ সব নাম প্রকাশ করে হলো, কে কে বাংলাদেশ হতে কানাডায় কোন কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে ঐ বছর পিএইচডি করতে যাচ্ছে। আমার মনে আছে চট্টগ্রামের নিজের বাসা হতে প্লান্ট পথলজির শিক্ষক বড় ভাই ড: বাহাদুর ভাই আর ভাবি ঐ পত্রিকায় ছবি দেখে আমাদেরকে কনগ্রাচুলেশন জানিয়েছিলেন।

পরের দিন ছিল আমার মাথার ওপর একটি বজ্রপাত। হঠাৎ করে কানাডিয়ান প্রফেসরের একটি ফ্যাক্স পেলাম । লিখেছেন তিনি এক বছরের জন্য সাউথ আফ্রিকার এক বিশ্ববিদ্যালয় সাবাটিক লীভে থাকবেন। তাই ঐ বছর আমাকে কানাডা যেতে মানা করলেন, আমাকে পরের বছর যেতে বললেন। কিন্তু কমনওয়েলথ কমিশন আমাকে জানিয়ে দিলেন স্কলারশিপটা ক্যান্সেল হয়ে গেল। নতুন করে আমাকে আবার এপ্লাই করতে হবে। আমার মাথায় তখন পৃথিবীর উপর সবচাইতে বড় বজ্রপাত আঘাত হানলো। ঐ প্রফেসর তো জানেনা বাংলাদেশে কমনওয়েলথ স্কলার্শিপ সিলেকশন পাওয়াটা, কত যে একটা কঠিন ব্যাপার। আমি সত্যি হতাশায় পড়ে গেলাম। দুইদিন পরেই ফ্লাইট। আর আজ সব লন্ডভন্ড হয়ে গেল। কাউকে কোন কিছু বলি না। 

প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয় হতে যে ছুটির অর্ডারটা হয়েছিল ওটা ক্যানসেল করার জন্য বিভাগীয় প্রধান মানিকলাল দেওয়ান স্যারকে বললাম। বিষণ্ণ চেহারায় স্যার আমার দিকে তাকিয়ে বললেন মন খারাপ করো না হয়তো এর চেয়ে একটা ভালো কিছু হবে। কিন্তু আমি অস্বস্তিতে পরে গেলাম এই কথাটা আমি কিভাবে ফরিদা ইয়াসমিনকে বলবো যে আমার স্কলারশিপ ক্যান্সেল হয়ে গেছে। যেদিন আমার কানাডার ফ্লাইট তার ২ দিন পরেই ফরিদা ইয়াসমিনের ফাইনাল পরীক্ষা শুরু। 

আমি যেদিন রিগ্রেট লেটারটি ফ্যাক্স এ পেয়েছিলাম, ঐদিন ই বিকালেই দেখি আমার আব্বাজী টাঙ্গাইল থেকে ময়মনসিংহ চলে এসেছেন। আমি আব্বাজীর মুখের দিকে তাকিয়েই বুঝতে অসুবিধা হলোনা যে আমার পার্মানেন্ট ঠিকানাতেও কমনওয়েলথ কমিশন একটা ফ্যাক্স পাঠিয়েছেন। আমি কোন কিছু বলার আগেই আগেই আব্বাজী আমার চোখের দিকে তাকিয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে বললেন তুমিও হয়তো জানো, আমাকেও ফ্যাক্স করেছে কানাডা হচ্ছে। তোমার কানাডার গুয়েল্ফ ইউনিভার্সিটি' হতে প্রফেসার রিগ্রেট করেছে বাবা, তোমার হয় নাই বাবা। আমাকে রেটিং বললেন তূমি বৌমাকে ওর পরীক্ষার আগে এসব কিছুই বলোনা। তোমার মাকেও আমি এখনো জানায়নি ।টাঙ্গাইল গিয়েই জানাবো। আমাকে শুধু বলেছিলেন, তুমি মন খারাপ করো না, ওয়ামা তাওয়াক্কালতু আল্লাহ।। মনে রেখো আল্লাহ যা করেন সবকিছুই ভালোর জন্যই করেন। ঐ মুহুর্তের আমি খুবই আবেগপ্রবণ হয়ে গিয়েছিলাম কিন্তু আব্বাজি কে আমি বুঝতে দেয়নি।

ফরিদার প্রথম পরীক্ষার পর পরই ঐ দুঃসংবাদটা জানিয়েছিলাম, শুনার পর বিষন্ন মনে হতভম্বের মত আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে একটা কথাই বলেছিল মন খারাপ করোনা আল্লাহ যা করেন হয়তো ভালোর জন্যই করেন। 

আর হা আমরা যে চারজন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় হতে কানাডিয়ান বিশ্ববিদ্যালয় ঐ বছরে কমনওয়েলথ স্কলারশিপ সিলেকশন পেয়েছিলাম আমি বাদে বাকি তিনজন পিএইচডি সম্পন্ন করে আর দেশে ফেরেননি ওখানেই পার্মানেন্ট রেসিডেন্সি আর চাকুরী নিয়ে বসবাস করছেন। পরের বছরের কমনওয়েলথ স্কলারশিপের জন্য আমি আবার ও অ্যাপ্লিকেশন করলাম কিন্তু এবার আর কানাডায় নয় এবার ইংল্যান্ডের বিশ্ববিদ্যালয়ে দরখাস্ত করলাম। (চলবে......)
 

লেখক: অধ্যাপক, প্যাথলজি বিভাগ ও ডিরেক্টর, ইন্টার ডিসিপ্লিনারি ইনস্টিটিউট ফর ফুড সিকিউরিটি, বাকৃবি এবং প্রাক্তন ভাইস-চ্যান্সেলর, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও এনিমেল সাইন্স বিশ্ববিদ্যালয়।

Advertisement
Advertisement