শুক্রবার   ০৭ আগস্ট ২০২০ ||  শ্রাবণ ২২ ১৪২৭ ||  ১৭ জ্বিলহজ্জ ১৪৪১

ACI Agri Business

আত্মকথন- চতুর্থ পর্ব

সহধর্মিনী ও সহযাত্রী

প্রফেসর ড. এ এস মাহফুজুল বারী

প্রকাশিত: ২২:৫৭, ২৯ জুন ২০২০

সহধর্মিনী প্রফেসর ড: ফরিদা ইয়াসমিন এর ডিভিএম ফাইনাল পরীক্ষার রেজাল্টের পর ওর ক্যারিয়ার প্রথমে ফিজিওলজিতে করার জন্য বাকৃবির ভেটেরিনারি অনুষদের ফিজিওলজি বিভাগের মরহুম প্রফেসর ড. ফজলুর রহমান স্যারের কাছে এমএসসিতে ভর্তি হয়। কিন্তু সেটা আর সে কন্টিনিউ করতে পারেনি। তখন ডীন ছিলেন মেডিসিন বিভাগের মরহুম প্রফেসর ড. আব্দুর রহমান স্যার। 

ফরিদা ইয়াসমিনের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষাগুরু এবং মেন্টরবৃন্দ বিশেষ করে প্রফেসর ড. মানিক লাল দেওয়ান স্যার এবং প্রফেসর ড. হেফাজত উদ্দিন শেখ স্যারেরা, কেউই আমাদেরকে বললেন না ফরিদাকে ঐ অবস্থায় একা বাংলাদেশ রেখে যেতে। আর আমার বাবা মা, শ্বশুর-শাশুড়ি ওনারাতো প্রথম থেকেই বলে আসছেন ওকে অবশ্যই সঙ্গে নিয়ে যাবে। সবাই বললেন তোমরা একসঙ্গেই ইংল্যান্ডের চলে যাও এবং বললেন তোমাদের সময়ই বলে দেবে কখন কি করতে হবে। তাছাড়া কমনওয়েলথ কমিশন থেকে যেহেতু স্পাউস এর জন্য ট্রাভেল এবং ফুল মেইনটেনেন্স অ্যালাউন্স প্রদান করবে সে ক্ষেত্রে চিন্তা করে দেখলাম কেন রেখে যাবো? আমরাও তাই আলোচনা করে ভবিষ্যতের দিনগুলোকে পরম করুণাময় আল্লাহর হাতেই ছেড়ে দিয়ে সিদ্ধান্ত নিলাম একসঙ্গেই একই ফ্লাইটে আমরা ইংল্যান্ডে যাব।
 
তখন ব্রিটিশ কাউন্সিলে প্রোগ্রাম অফিসার হিসাবে কাজ করতেন বৈদ্যনাথ বাবু। বৈদ্যনাথ বাবু অবশ্য একবার বলেছিলেন, “ফরিদা ম্যাডামের এই প্রেগনেন্সি অবস্থায় ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ অনুমতি দিবে কিনা বলতে পারছিনা, পরে আপনাকে জানাবো”। বৈদ্য বাবুর ওই কথায় আমার আরেকটা চিন্তার উদ্রেক হয়ে দাঁড়ালো। কিন্তু তার পরের দিন ই আবার বৈদ্য বাবু আমাকে বাকৃবিতে ফ্যাক্স করে জানালেন, “British airways have no objection, you could travel together"। ফ্যাক্সটি হাতে পেয়ে আমি একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিলাম। আলহামদুলিল্লাহ।

বাংলাদেশের ব্রিটিশ কাউন্সিলের বৈদ্য বাবুর পরামর্শে গুলশানের একটি নির্দিষ্ট ডায়াগনোস্টিক সেন্টারে আমরা চলে গেলাম আমাদের মেডিকেল চেকআপের জন্য। ডায়াগনোস্টিক সেন্টার হতেও ওরকম আর কোন কিছুই বললেন না। আমাদের দুজনের সব রিপোর্ট নরমাল ছিল তাই মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে গেলাম যে ফ্লাই করতে আর কোন অসুবিধা ইনশাআল্লাহ হবে না।

আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছুটির দরখাস্ত করার পর প্রয়োজনীয় গভমেন্ট অর্ডার সঙ্গে নিয়ে আমরা ফ্লাইট এর ৩/৪ দিন পূর্বে টাঙ্গাইলের বাড়ি তে চলে গেলাম।

যেদিন রাত্রি ১০ ঘটিকায় আমাদের ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের ফ্লাইট, ভেবেছিলাম দুপুরের লাঞ্চের পর টাঙ্গাইল থেকে কুর্মিটোলা বিমানবন্দরে যাত্রা শুরু করব। কিন্তু সে দিনের আগের রাত্রি হতে স্মরণকালের মুষলধারে এক প্রচন্ড বৃষ্টি শুরু হয়েছিল। সেই বৃষ্টি তার পরের দিনও আর থামতে চায়  না। ভয়াবহ সেই বৃষ্টির মাঝে একটু দুশ্চিন্তায়ই পড়ে গেলাম কিভাবে এই বৃষ্টির মাঝে নির্দিষ্ট সময়ে বিমানবন্দরে পৌঁছাব!
 
ঐ অঝোর ধারা বৃষ্টিপাত আমাদের বিবাহিত জীবনের শুরু থেকেই আরম্ভ হয়েছিল। আমার মনে পড়ে বিয়ের দিন টাঙ্গাইল হতে সিরাজগঞ্জে বরযাত্রায় সারা রাস্তায়ই ছিল মুষলধারে বৃষ্টি। আর তখন কিন্তু যমুনা ব্রিজও হয়নি। তার মানে ঐ বিয়ের দিন টাঙ্গাইল হতে সিরাজগঞ্জ যেতে বাংলাদেশের এমন কোন যানবাহন নেই যে আমাদের উপভোগ করতে হয়নি। মাইক্রোবাস, রিক্সা, ফেড়ী, তারপর বাংলাদেশ রেল ওয়েতে ভ্রমণ। বর যাত্রায় পাবলিক বাস বাদে আর সব ধরনের যানবাহনই অন্তর্ভুক্ত ছিল। 

বরযাত্রীতে বাকৃবির কোন বন্ধুকে আমি পাইনি কারণ বিয়ের দিন ঠিক করা হয়েছিল কোরবানি ঈদের ছুটিতে। সবাই ছুটিতে বাড়িতে চলে গেছে। তবে আমার একজন বন্ধুই ছিল সেই বরযাত্রীর সঙ্গে, তার কোন ঈদ ছিল না আর সে হল বাকৃবির রসায়ন বিভাগের প্রফেসর কার্তিক চন্দ্র সাহা। 

ভুয়াপুর হতে যমুনা নদী পার হবার পর সিরাজগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশনে পৌছালাম। ওই স্টেশন হতে যখন জামতৈল রেলওয়ে স্টেশনে যাবার জন্য ট্রেনের অপেক্ষা করছিলাম ঐ সময়টা ছিল আমার জীবনের আরেকটি মহা স্মরণীয় দিন। চতুর্দিক থেকে স্টেশনের প্রায় অধিকাংশ যাত্রীরাই কৌতূহলের বশবর্তী হয়ে বরকে দেখার জন্য দর্শনার্থী, উঁকি মারতে মারতে ঘেরাও করে ভিড় করেছিল এবং তাদের বিভিন্ন জনের বিভিন্ন রকম মন্তব্য শুনে তখন আমার মনে হয়েছিল বরেরা কি কোন অন্য গ্রহের প্রাণী!

যাহোক টাঙ্গাইল হতে ব্রিটিশ এয়ারওয়েশ এর ফ্লাইট ডিপারচারের দিন বিমানবন্দরে ফ্লাইট ধরার জন্য সময় নষ্ট না করেই ঐ বৃষ্টির মাঝেই দ্রুত সিদ্ধান্ত নিলাম। দুইটা ট্যাক্সি ক্যাব ভাড়া করে বেশ কয়েক ঘন্টা পূর্বেই আমরা কুর্মিটোলা বিমানবন্দরে যথা সময়েই পৌঁছে গিয়েছিলাম। তখন বিকেল পাঁচটা বাজে আর আমাদের ফ্লাইট ছিল রাত্রি সাড়ে দশটায়।

বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর কাস্টমস ইমিগ্রেশনের ব্যাপারে আমাদের খুব একটা সময়ক্ষেপন হয় নাই কারন আমার বড় ভাইরা ভাই তখন ঐ বিমানবন্দরের এডিশনাল সিকিউরিটি অফিসার।

ইমিগ্রেশন দ্রুত পার হয়েই ভিতরে ওয়েটিং এরিয়াতে গিয়ে দেখি বন্ধু মাহবুব মোস্তফা ভাবি সাথে ওনার মেয়ে মৈত্রী এবং শহীদ ভাইয়ের বোন আমার বান্ধবী রেখা অনেক আগেই ইমিগ্রেশন ক্রস করে সেখানে অবস্থান করছে। তখন তো আর মোবাইল ছিল না সুতরাং পূর্ব থেকে কোন যোগাযোগের সুযোগ ছিল না।

১৯৮৬ সালের সেপ্টেম্বরের ২৬ তারিখে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের ঐ ফ্লাইটি ছিল ঢাকা হতে লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরে ভারত মহাসাগরের উপর দিয়ে একটা লম্বা জার্নির ফ্লাইট। পথিমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ মাসকাটে কিছু সময়ের জন্য ল্যান্ড করেছিল শুধুমাত্র প্লেনের ফুয়েল নেওয়ার জন্য, কিন্তু ঐ সময়ে কোন যাত্রীকেই ঐ উড়োজাহাজের ভিতরে হতে নামতে দেয়া হয়নি। 

এরপর মাস্কাট টু হিথ্রো এয়ারপোর্ট, লন্ডন এর দীর্ঘ এক ৮/৯ ঘন্টার নন স্টপ ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের জার্নি যার গড় গতিবেগ ছিল ঘন্টায় ৫০০ হতে ৬০০ কিমি, আর ঐ বিষয়টি প্রতিটি সামনের সিটের পিছনে একটি করে মনিটর ছিল সেখানে সবসময়ই দেখা যাচ্ছিল। এছাড়াও কেউ ইচ্ছা করলে বিভিন্ন চ্যানেলে সেখানে বিভিন্ন ধরনের মুভি /গান ইত্যাদি শোনা যেত। অর্থাৎ কিনা কারোর বোরিং হওয়ার কোন সুযোগ ছিল না।

বিমানে বিভিন্ন ধরনের প্রচুর খাবারের সমারোহ ছিল। বিমানবালারা সকল যাত্রীকে ডিনার এবং ব্রেকফাস্ট যা চাইতেন তাই সরবরাহ করতেন। 

মনে আছে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ মাস্কাট হতে টেক ওভার করার পর বন্ধু মোস্তফার মেয়ে মৈত্রীকে নিয়ে ভাবি এক অসুবিধায় পড়ে গিয়েছিলেন। মৈত্রী কোনক্রমেই প্লেনে ঐ ক্রাউড পরিস্থিতিতে থাকতে রাজি না। তার কাছে ওটা একটা বদ্ধ জায়গা মনে হচ্ছিলো। শুধু কান্নাকাটি ।এয়ার হোস্টেসরা মৈত্রীকে নিয়ে এক বিরাট চ্যালেঞ্জে পরে গিয়েছিল। তার কান্না থামতেই চায়না, যাহোক এক সময়ে মৈত্রী কাঁদতে কাঁদতে শান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল। শুধু মৈত্রী না আরো দুই একজন ছোট শিশুরা ছিল তারাও একই সমস্যায় ভুগতে ছিল। আমার মনে হয় বায়ুর চাপের পার্থক্য এ কানের ভিতর হয়তো তালা লেগে যায় যে কারণে অনেক বাচ্চারাই এমন কান্নাকাটি করে, বিমানবালারা এ বিষয়টি ভালো করেই জানেন যে কারণে নানান খেলনার বিষয়বস্তু দিয়ে বাচ্চাদের মনোযোগ কামনা করেন।

যথাসময়ে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের ঐ ফ্লাইট ক্যাপ্টেন ঘোষণা দিলেন সম্মানিত যাত্রীবৃন্দ একটু পরেই আমরা লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরে অবতরণ করবো, আমাদের সহযোগিতা করার জন্য স্টুয়ার্ডদের পক্ষ থেকে আপনাদের ধন্যবাদ জানাচ্ছি। দয়া করে আপনারা সবাই আপনাদের সিট বেল্ট বেঁধে নিন। সিট গুলোকে সোজা করে বসুন। বুঝলাম লন্ডনে এসে গেছি।

.........( চলবে )

লেখক: অধ্যাপক, প্যাথলজি বিভাগ ও ডিরেক্টর, ইন্টার ডিসিপ্লিনারি ইনস্টিটিউট ফর ফুড সিকিউরিটি, বাকৃবি এবং প্রাক্তন ভাইস-চ্যান্সেলর, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও এনিমেল সাইন্স বিশ্ববিদ্যালয়।

Advertisement
Advertisement