শুক্রবার   ০৭ আগস্ট ২০২০ ||  শ্রাবণ ২২ ১৪২৭ ||  ১৭ জ্বিলহজ্জ ১৪৪১

ACI Agri Business

লাম্পি স্কিন রোগ; বৈশ্বিক উষ্ণায়ন, করোনা ও কোরবানি

প্রফেসর ড. মো: মাহমুদুল হাসান শিকদার

প্রকাশিত: ০১:০৬, ৫ জুলাই ২০২০

সারাদেশ যখন  করেনাভাইরাসের আতঙ্কে আতঙ্কিত, ঠিক সে সময়ে প্রাণিসম্পদ সেক্টরে লাম্পি স্কিন রোগ (Lumpy Skin Disease; LSD) এর মহামারী খামারিদের নীরব কান্নার উপলক্ষ করে  দিয়েছে। কিছুদিন আগেও যে রোগের অস্তিত্ব বাংলাদেশে ছিল না, আজ সে রোগের কারণে প্রাণিসম্পদ খাত এক কঠিন বাস্তবতার সম্মুখীন। গরম তাপমাত্রায় যে রোগটি মূলত চিহ্নিত করা হতো, সে রোগটি এখন বাংলাদেশের নাতিশীতোষ্ণ তাপমাত্রায় জেঁকে বসেছে। খামারের পর খামারে প্রাদুর্ভাব ঘটছে এ রোগের। করোনাকালীন সময়ে সারা বাংলাদেশের প্রাণিসম্পদ ক্ষেত্র ক্ষতির সম্মুখীন। কৃষক তার উৎপাদিত পণ্য যেমন দুধ, ডিম মুরগি বিক্রি করতে পারছে না। লোকসানে প্রচুর খামার বন্ধ হচ্ছে প্রতিনিয়ত। মরার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মত খামার গুলোতে একে একে LSD ছড়িয়ে পড়ছে। খামারিকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দিচ্ছে।

জাতিসংঘের অন্তর্ভুক্ত ‘খাদ্য ও কৃষি সংস্থা’ (Food and Agricultural Organization, FAO)  ২০১৩ সালেই বৈশ্বিক উষ্ণায়নের (Global wrming)  কারণে যে রোগ গুলো  গবাদিপশুর মাঝে ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বিস্তার লাভ করতে পারে বলে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল LSD তার অন্যতম। ২০১৯ সালের  প্রথম থেকেই বিভিন্ন মাধ্যমে এ রোগের প্রাদুর্ভাব এর কথা শোনা গেলেও  প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর  ২০১৯  সালের  ২২শে জুলাই OIE  এই এর নিকট বাংলাদেশে এই রোগটির উপস্থিতি অবহিত করে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যমতে,  চট্টগ্রামের আনোয়ারা, কর্ণফুলী, এবং পটিয়া উপজেলায় প্রথম এ রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। বছরের শেষ নাগাদ অধিদপ্তর  নিশ্চিত করে যে, প্রায় ছয় লক্ষের অধিক গবাদিপশু এই রোগে আক্রান্ত হয়েছে। এ কথা উড়িয়ে দেয়া যায় না যে, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের সাথে আমাদের একটি   বিস্তৃত সীমান্ত রয়েছে, যা অতিক্রম করে বৈধ কিংবা অবৈধ পথে নিয়মিত গবাদি পশু বাংলাদেশে প্রবেশ করে। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এবং অন্য দেশ থেকে আসা সঙ্গনিরোধ না মেনে এই গবাদি পশুগুলো বাংলাদেশের প্রাণিসম্পদে অন্তর্ভুক্তি নতুন রোগের উৎস হিসেবে কাজ করে। LSD  দীর্ঘদিন ধরে আফ্রিকায় একীভূত ছিল। গত দশকের শুরু থেকেই ধীরে ধীরে এই রোগটি মধ্যপ্রাচ্য ও তুরস্কে দেখা দেয় এবং তারপর ইউরোপসহ অন্যান্য দেশে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। ২০১৩ সালের পর থেকেই এই রোগটি তুরস্ক, আলজেরিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্য এবং মধ্য ইউরোপের দেশ গুলোতে দেখা যায়। 

লাম্পি স্কিন ডিজিজ মূলত: একটি ভাইরাস ঘটিত রোগ, LSDV ভাইরাসের সংক্রমণে এ রোগ হয়। এ ভাইরাসটি Capripox  Genus এবং Poxviridae  ফ্যামিলির অন্তর্ভুক্ত। Sheep pox virus (SPV)  এবং  Goat pox virus (GOV)  ও এই ভাইরাসের কাছাকাছি গোত্রের। এ ভাইরাসটি একটি ডাবল স্ট্যান্ডার্ড DNA ভাইরাস। যেহেতু এ ভাইরাসের মিউটেশন খুব কম ঘটে, ভাইরাল সিকোয়েন্সিং করার মাধ্যমে কোন একটি নতুন খামারে কোন উৎস থেকে রোগটি এসেছে তা নির্ধারণ করা যায় না। LSD  ভাইরাসের পোষক নির্দিষ্ট। এ ভাইরাস প্রধানত গরু এবং মহিষকে সংক্রমিত করে। এখন পর্যন্ত এই রোগে সংক্রমণের ক্ষেত্রে ছাগল কিংবা ভেড়ার ভূমিকা নির্ধারণ করা যায়নি। তবে এ ভাইরাস কখনো মানুষকে আক্রান্ত করে না। Arthopod জাতীয় Vector সমূহ মশা কিংবা  আঠালি’র মাধ্যমে এটি একটি আক্রান্ত পশু থেকে অন্য অন্য প্রাণীকে আক্রান্ত করে। আক্রান্ত মৃত প্রাণী থেকে সুস্থ প্রাণীতে এই রোগ সংক্রমণের ঝুঁকি রয়েছে, কিন্তু এটি বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা দ্বারা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। একইভাবে স্পর্শের মাধ্যমে এ রোগ ছড়ানোর ঝুঁকি থাকলেও তা-ও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। আক্রান্ত প্রাণী কয়েকদিন থেকে দুই সপ্তাহ অধিক পর্যন্ত পর্যন্ত Viremic (রক্তে ভাইরাসের উপস্থিতি) থাকতে পারে, এমনকি ১৮ দিন পর্যন্ত  মুখের লালা ও Nasal discharge  এই ভাইরাসের উপস্থিতি নির্ণয় করা গেছে।ক তদিন পর্যন্ত ভাইরাস এই discharge এ থাকতে পারে তা গবেষণার মাধ্যমে নির্ধারণ করা জরুরি। রোগাক্রান্ত  ষাড়ের বীজ (Semen) এর মাধ্যমে এ রোগ গাভীতে  ছড়ায়। গর্ভাবস্থায় মা আক্রান্ত হলে তার ভূমিষ্ঠ বাছুর এ রোগসহ জন্মগ্রহণ করতে পারে।বাছুর মায়ের দুধ খাওয়ার মাধ্যমে কিংবা অধিক সংক্রমণের ক্ষেত্রে Teat Lesion সংস্পর্শে এসে মায়ের কাছ থেকে সুস্থ বাছুরে আক্রান্ত হতে পারে ।

 এ রোগের সুপ্তিকাল চারদিন থেকে পাঁচ সপ্তাহ পর্যন্ত হতে পারে। আক্রান্ত পশুতে প্রচণ্ড জ্বর ও তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাবে। চোখ নাক দিয়ে পানি পড়তে পারে। দুগ্ধবতী গাভীর দুধ উৎপাদন মারাত্মকভাবে কমে যাবে। সংক্রমণ মৃদু থেকে তীব্র হতে পারে। এ রোগের প্রধান লক্ষণ হলো চামড়ার উপর গুটি (Nodule)  তৈরি হওয়া যা ১০-৫০ মিমি পর্যন্ত হতে পারে। Sub-scapular prefemorla lymph nodes গুলো বড় হয়ে যায় এবং সহজেই অনুভব করা যায়। মুখ ও নাসা গহবর এ Necrotic Plague তৈরি হবে। তীব্র ক্ষেত্রে নডিউলগুলো তে ইনফেকশন তৈরি  হয়ে Secondary Bacterial Infection হতে পারে। কোন কোন ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া হতে পারে। পোস্টমর্টেম এর ক্ষেত্রে digestive and respiratory tract এ পক্স এর মত গুটিগুটি দেখা যাবে। এই ধরনের গুটিগুটি অন্য অঙ্গসমূহের উপরিভাগে দেখা যেতে পারে।  তীব্র সংক্রমণ যুক্তপ্রাণীতে সহজেই LSD রোগ নির্ণয় করা যায়। ল্যাবরেটরি তে সাধারণত PCR পদ্ধতিতে এই রোগের ডায়াগনোসিস করা হয়। তবে মনে রাখতে হবে এই রোগের ডায়াগনোসিস করার ক্ষেত্রে  কিছু কিছু রোগের সাথে পার্থক্যমূলক রোগ নির্ণয় জানা গুরুত্বপূর্ণ। Psedu lumpy skin disease/Insect bites, Pseducowpos, Dermatophilosis, demodicosis, bovine popular stomatitis ইত্যাদি রোগের সাথে LSD এর তুলনামূলক ডায়াগনোসিস করতে হবে।

ভেটেরিনারিয়ানরা রোগের লক্ষণ এর উপর ভিত্তি করে এই রোগের চিকিৎসা দিয়ে থাকেন। খামারিদের উচিত হবে রোগের লক্ষণ দেখামাত্রই কিংবা আশেপাশে খামারে এই রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা গেলে ভেটেরিনারিয়ানের সাথে যোগাযোগ করা। মনে রাখতে হবে কোয়াক বা অন্য প্রাণী কর্মী সমূহের ভুল চিকিৎসা কারণেই LSD মৃত্যুর হার বাড়ছে। বর্তমানে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর Goat Pox ভ্যাকসিন ব্যবহার করছে। এখন পর্যন্ত এই ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা সন্তোষজনক পাওয়া গেছে। রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা গেলে রোগাক্রান্ত এলাকার গরু-ছাগলের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। তবে যে সমস্ত প্রাণীদের টিকা রয়েছে তাদের চলাচলের অনুমতি দেয়া যেতে পারে। যে দেশে এ রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা গিয়েছে সে দেশ থেকে পশু আমদানি বন্ধ করতে হবে।  খামার, গোয়ালঘর কিংবা তার আশেপাশের এলাকা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে যেন Vector বা মশা-মাছির উৎপাদন না বাড়ে।  প্রয়োজনে খামারে প্রাণীদের জন্য মশারি ব্যবস্থা করতে হবে। 

একথা অনস্বীকার্য যে LSD এর কারণে বর্তমানে বাংলাদেশের খামারিরা অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন। সরকার প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মাধ্যমে এ রোগ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। প্রাথমিক অবস্থায় এ রোগটি নির্ণয় করা গেলে চিকিৎসার মাধ্যমে সহজে নিরাময় করা সম্ভব। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই হাতুড়ি প্রাণী কর্মীদের হাত ঘুরে এসে রেজিস্টার্ড ভেটেরিনারিয়ানের কাছে আসতে আসতে অনেক দেরি হয়ে যায়। খামারিদের এ ক্ষেত্রে সচেতনতা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আসছে কোরবানির সময় আক্রান্ত পশু যেন কোরবানির হাটে না উঠে কিংবা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় স্থানান্তরিত না হয় সে বিষয়ে বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখা বাঞ্চনীয়। প্রয়োজনবোধে বিভিন্ন উপজেলা থেকে যে প্রাণীসমূহ গরুর হাটে যাচ্ছে তা ভেটেরিনারিয়ান এর সার্টিফাই করে নেয়া জরুরি।  

৭ প্রতি বছর কোরবানির ঈদের সময় বাংলাদেশের চামড়া শিল্পের ব্যবসায়ীরা কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করেন। ট্যানারি পল্লী সাভার স্থানান্তরিত  হবার পর এ শিল্পে অস্থিরতা বিরাজ করছে। গতবছর কোরবানিতে চামড়া সংগ্রহের হ-য-ব-র-ল অবস্থা তৈরি হয়েছিল। করোনাভাইরাস এই মহামারীর সময়ে ট্যানারি পল্লী সমূহ প্রায় তিন মাস ধরে বন্ধ আছে। LSD তে মৃত্যুর হার কম হলেও  আক্রান্ত পশুর চামড়া সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।  এই ক্ষতিগ্রস্ত চামড়া এবং করোনা ভাইরাসের কারণে বিপর্যস্ত ট্যানারি শিল্প  আরো বেশি বিপর্যস্থ হয়ে যাবার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। এমতাবস্থায় খামারিদের জন্য এবং এ শিল্পের সাথে সংশ্লিষ্ট সকলের জন্য প্রণোদনার ব্যবস্থা করা জরুরি। সরকারের সর্বশেষ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ঈদে কোরবানির হাট বসছে-যদিও স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয় কোরবানির হাটের জন্য একটি স্বাস্থ্যবিধি তৈরি করছে। তবে পশু হাটের জন্য করোনাভাইরাস এই  বিস্তৃতি বাড়বে বলেই ইতিমধ্যেই জনসাস্থ বিদরা সতর্ক করে দিয়েছেন। আশঙ্কার কথা হলো পশুর হাটগুলো হয়ে উঠতে পারে আক্রান্ত প্রাণী থেকে সুস্থ প্রাণীতে LSD  সংক্রমনের হটস্পট। এ বিষয়ে সকলের সমন্বয় একান্তভাবেই জরুরি। সকলের সমন্বিত প্রচেষ্টা ই পারে  প্রাণিসম্পদ খাতকে LSD মুক্ত করতে।

লেখক: বিভাগীয় প্রধান, ফার্মাকোলজি বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। ইমেইল- drmsikder@bau.edu.bd

Advertisement
Advertisement