বৃহস্পতিবার   ২৪ অক্টোবর ২০১৯ ||  কার্তিক ৮ ১৪২৬ ||  ২৪ সফর ১৪৪১

জাপানের নাগো এগ্রি পার্ক

লাভজনক কৃষি শেখায় যে পর্যটন কেন্দ্র

মো: তাজকিরুজ্জামান সৈকত

প্রকাশিত: ১৪:৫২, ৭ আগস্ট ২০১৮

জাপানের ওকিনাওয়ার নাগো এগ্রি পার্কে লেখক

জাপানের ওকিনাওয়ার নাগো এগ্রি পার্কে লেখক

জাপান কৃষি প্রধান দেশ না। কিন্তু এই দুই বছরে জাপানের বিভিন্ন প্রান্তে কৃষি চিন্তা আর বিকাশের যে দারুণ ব্যবস্থার কিছুটা জানতে পেরেছি তা রীতিমত বিস্ময়কর। জেএ তথা জাপান এগ্রিকালচার এর সম্প্রসারণের দিকটা দেখে থাকে। খুবই কার্যকরী আর শক্তিশালী কৃষি সংগঠন। এতটাই যে, এদের ব্যাংক জাপানের অন্যতম বৃহৎ। অন্য বিষয় নিয়ে আলোচনা পরে করা যাবে, আজ ওকিনাওয়া প্রিফেকচারের নাগো এগ্রি পার্কের অভিজ্ঞতাটা জানাতে চাই।

পার্ক বলতে যা বোঝায় মানে সুন্দর একটা জায়গা ঘোরাফেরার সুবিধা, খাওয়া-দাওয়া থেকে শুরু করে থাকার ব্যবস্থা এখানে এর সবই আছে। আইডিয়াটা এ রকম যে, ছোট ছোট কৃষকের পক্ষে কৃষি বিপণন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ করা মুশকিল। এর পাশাপাশি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ, নায্যমূল্য নিশিচত করার বিষয়টিকে মাথায় রেখে এই কৃষি সমন্বয়ের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। নাগো সিটি অফিসের হর্টিকালচার এন্ড লাইভস্টক ডিভিশনের সহায়তায় এই পার্ক স্থাপন করা হয় ২০১৪ সালে। এর উদ্দেশ্য হল কৃষিকে সাপোর্ট দেয়া, এর কৌশল হল ৬ সেক্টরের ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশন অর্থাৎ শিল্পায়ন। এই পার্কে আছে কৃষি পণ্য প্রক্রিয়াজাত করা, পণ্য বিক্রি করার জন্য দোকান, রেস্টুরেন্ট এবং টুরিস্ট ফার্মসহ ৪টি কম্পোনেন্ট। পার্কে ২শ’ ৬০টি গাড়ী রাখার ব্যবস্থা আছে। শুরুটা করা হয়েছিল কৃষিতে ক্রমবর্ধমান লোকসান ঠেকাতে।

১৯৯০ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত জাপানকে কৃষিতে ৩ থেকে ৪ বিলিয়ন ইয়েন লোকসান গুনতে হয়। শুরু হয় এর কারণ খোঁজা। কৃষির ধারনা পরিবর্তন, চাষের জমির স্বল্পতা, এ সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা এ রকম নানা কারণ বের হয়ে আসে। সমাধান হিসেবে তিনটি বিষয়কে প্রাধান্য দেয়া হয়, তা হল- কৃষি জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার, বিক্রি বাড়ানোর জন্য নতুন চ্যানেল তৈরি এবং নতুন হাই-ভ্যালু প্রোডাক্ট তৈরি করা। লক্ষ্য তো ঠিক হল, এবার পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ। আর তাতে তিন ধাপে কৃষি সংশ্লিষ্টদের এক করা হল। প্রথম – নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা করা এবং স্বীকৃতি প্রদান, অদেকাকে সিচো সিৎসু মানে সিটি মেয়রের অফিস সিটিজেনদের মতামত সংগ্রহ করার কাজ করে এবং কৃষকদের নিয়ে সমন্বিত বিজনেস প্ল্যান তৈরি করে।

২০১২ সাল থেকে শুরু হয় এই পার্ক বানানোর কাজ। চার বছরে ১.৬ বিলিয়ন ইয়েন খরচ করে এ পার্ক বানানো হয় ঐ লক্ষ্যকে পূরণ করার জন্য। শুরুর পর থেকে গড়ে প্রায় ৩ লাখ পর্যটক এখানে আসেন। সুপরিসর এই ফার্ম এই আউটলুক খুবই সুন্দর। দুটো ইনকিউবিশন রুমে ফার্মাররা সরাসরি তাদের উৎপাদিত পণ্য নিয়ে এসে তার রুপান্তর করতে পারে। তাই ফলের টাটকা জ্যাম, জেলি, জুস সহজে মিলে এখানে। শাক-সবজি আর মাছ,মাংসেরও প্রক্রিয়াজাত করা যায় এখানে। কৃষক নির্ধারিত ফি দিয়ে তার পণ্য নিজেই প্রক্রিয়াজাত করতে পারে। আছে মান নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রসেসিং ল্যাবরেটরি। সেই পণ্য স্থানীয় বাজার ছাড়াও সেখানে খোলা দোকান সীমা চুরারাতে চলে যায়।

প্রোডাক্ট, প্রক্রিয়াজাত করা পণ্য, কসমেটিক সব ধরনের পণ্য এখানে পাওয়া যায়। লোকাল গ্রীন টি, করলার চা, আমের ক্যান্ডী আর হার্বের তৈরী সাবান কিনলাম ঐ দোকান থেকে। রেস্টুরেন্ট এ আপনি চেখে দেখতে পারবেন মজার মজার সব কেক, বিস্কিট, আইসক্রিম, নানান জাতের বেকারী প্রোডাক্ট। লাঞ্চ কিংবা ডিনারের জন্য স্থানীয় প্রোডাক্ট এর খাঁটি স্বাদ অপেক্ষা করছে আপনার জন্যই। ফ্রুট কেক, অরগানিক কেক কেনার সাথে সাথে করলা, ঢেঁড়স সহ নানা সবজি ও কিনে ফেলল আমাদের অনেকেই। আর টুরিষ্ট ফার্মের কনসেপ্ট টাও মজার। এখানে কৃষি উৎপাদনের নানা বিষয় চোখের সামনে দেখার পাশাপাশি বিক্রির ব্যবস্থাও আছে। সুন্দর নান্দনিক এই ফার্মে আপনি নানা জাতের ফুল, ফলের পাশাপাশি ঔষধি গাছ ও তার গুণাগূণ সম্পর্কে জানতে পারবেন।

এই পার্কের ধারনাটা হল স্থানীয় কৃষকেরা সরাসরি এই পার্কে ব্যবহার করে প্রযুক্তি পাবে, প্রক্রিয়াজাত করনের সুবিধা নেবে। উৎপাদিত পণ্য পার্কের দোকানে, রেস্টুরেন্ট ও টুরিষ্ট ফার্মে বিক্রি করবে। সেখান থেকে নতুন নতুন গ্রাহক বাড়বে, স্থানীয় জনগণ কিনবে এবং সর্বোপরি কৃষক উপকৃত হবে। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি কৃষকের এর মূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করা এবং বাইরের ও স্থানীয় জনগনের চাহিদা মেটাতে এই পার্ক কাজ করে যাচ্ছে। কৃষিতে সমন্বয়ের এক দারুণ উদাহরণ এই পার্ক।

আমার খুবই অবাক লাগে এত পৃথিবী খ্যাত সব ইন্ড্রাষ্টি যাদের দখলে তারাও কৃষি নিয়ে কি গভীর ভাবে চিন্তা করে। কারো কথায়, কাউকে খুশি করতে বা কারো ব্যক্তি স্বার্থকে পূরণ করতে না, বরং এই সেক্টরের যারা আসল স্টেকহোল্ডার তাদের উন্নতির জন্য তাদের নিয়ে কি দারুণ চিন্তা ও তার বাস্তবায়ন। প্রতিটি কাজে ধৈর্য, যত্ন, চিন্তা, বাস্তবতার নিরিখে জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রয়োগ করে ধাপে ধাপে উন্নয়ন। সবাই মিলে, সবাইকে নিয়ে কিছু করে দেখানোর সমন্বিত প্রয়াস।

পার্কে স্থানীয় জনগণ ও পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে নানা ইভেন্ট এর আয়োজন করা হয়। বাচ্চারা এসে ছবি আঁকে, গান গায়, ঘোরাঘুরি করে। বিখ্যাত গায়ক এনে কনসার্টও হয়। সব কিছুতেই উইন উইন সিচুয়েশন। কারণ এর পেছনে রয়েছে গভীর প্রজ্ঞা আর কিছু করার অদম্য আকাংখা। না এই পার্ক কেউ উদ্বোধন করেননি, নাই কোন স্মৃতিফলক। এমনও নাই যে এইটা আমার আইডিয়া। আছে শুধু সফলতা আর ক্রমান্বয়ে উন্নতির কতকথা।

লেখক: জেডি ফেলো অব ইয়ামাগুচি ইউনিভার্সিটি, জাপান।