মঙ্গলবার   ২০ অক্টোবর ২০২০ ||  কার্তিক ৫ ১৪২৭ ||  ০৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

ACI Agri Business

রাষ্ট্রায়ত্ত অটো-রাইসমিল স্থাপনের এখনই সময়

আফরোজা চৌধুরী 

প্রকাশিত: ০১:০৪, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২০

করোনার অভিঘাত যখন দেশের অর্থনীতি ও বিভিন্ন খাতের সামনে অগ্নি পরীক্ষার রূপে আবির্ভূত হয়েছে, কৃষি খাত তখন এক অপ্রতিরোধ্য অগ্রগতি দেখিয়েছে। রাইস সেক্টর কৃষির একটি উপখাতের চেয়েও দেশের অর্থনীতির ভিত্তি হিসেবে তার মৌলিকতা মেলে ধরেছে। বিশ্বময় খাদ্য ঘাটতির আশঙ্কার বিপরীতে এবছর উপর্যুপরি ঝড়, বন্যা, লকডাউনের পরও চাল উৎপাদক দেশের সারিতে একধাপ ওপরে উঠে এসেছে বাংলাদেশ।   

কথায় বলে, সব ভালো তার শেষ ভালো যার। বাম্পার ফলন, ধানের ভালো দামের মত ধারাবাহিক সুখবরের শেষ রক্ষা হচ্ছে না চালের বাজারদরে। ডিজিটালাইজেশনের বিপুল আয়োজনের পরও সরকারি গুদামের ধান-চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়ায় সরকার কিছুটা অপ্রস্তুত বোধ করছে। ধানের বাজারদর প্রতিযোগিতামূলক হওয়ায় কৃষক সরকারি গুদামমুখী হচ্ছে না, আবার মিলাররাও বাড়তি খরচের দোহাই দিয়ে চাল সরবরাহে অনীহা প্রকাশ করে যাচ্ছে। দেশীয় উৎস থেকে ধান-চাল সংগ্রহ চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়ায় মাঝে কিছুদিন চাল আমদানির গুঞ্জনও শোনা গেছে। দেশের সীমারেখার ভেতর পর্যাপ্ত চাল থাকার পরও সরকারের এ অসহায়ত্ব সংশ্লিষ্ট সকলকে ভাবিয়ে তুলেছে, আসলে গলদটি কোথায়!

করোনা কাল আমাদেরকে স্বাস্থ্য ও কৃষিখাতের অগ্রাধিকার আরেকবার স্মরণ করিয়ে দেওয়ায় সাম্প্রতিক সময়ে রাইস সেক্টরকে তার চিরাচরিত পলিসি প্রোকাস্টিনেশন বা নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের কালক্ষেপন থেকে বেরিয়ে আসতে দেখা গেছে। লকডাউনের সময়ে সারাদেশে রাষ্ট্রীয় প্রত্যক্ষ নজরদারিতে শ্রমিক, সার-বীজ ও কৃষি যন্ত্রের সরবরাহ নিশ্চিত করে রিসোর্স মোবিলাইজেশনের দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে। কিন্তু কৃষির এ আড়ম্বর বরাবরের মত মাঠেই সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে, নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠিকে চড়া দামেই চাল কিনতে হচ্ছে। 

আমরা আজকাল প্রতিনিয়ত কৃষিকে লাভজনক ও বাণিজ্যিক রূপ দানের প্রত্যয় শুনি। এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের অংশ হিসেবেও বাংলাদেশ ক্ষুদ্রপরিসর খাদ্য উৎপাদকদের আয় দ্বিগুণে বদ্ধপরিকর। ধানের ন্যায্য দামের বছর হিসেবে চলতি বছরের অভিজ্ঞতা থেকে এটি স্পষ্টত বোঝা যাচ্ছে যে, বাজারে ভালো দাম পেলে কেউই অফিসে অফিসে ধন্যা দিতে চায় না। আমরা যদি একই সাথে সরকারি গুদামের আপৎকালীন মজুদ অটুট রাখতে চাই এবং কৃষিকে লাভজনক দেখতে চাই তাহলে ভবিষ্যৎ টেকসই কৃষির বিনির্মাণে এখনই চাল সংগ্রহ অভিযানকে স্বনির্ভর ও কৃষক বান্ধব করতে হবে এবং এজন্য কিছু রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক উদ্যোগ গ্রহণের কথা ভাবতে হবে। 

চালকল মালিক বা মিলার হচ্ছে চাল বিক্রির লভ্যাংশের সিংহভাগের দাবিদার। একই শীষ থেকে উদ্ভব হলেও বাজার রূপ বিবেচনায় ধান ও চাল দুটি ভিন্ন পণ্য। ধান পুরোদস্তুর কৃষি পণ্য হলেও চাল মূলত একটি প্রক্রিয়াজাত মেশিন আউটপুট। দুটি ভিন্ন পণ্য ধান ও চালের বেলায় মিলারই একমাত্র কমন স্টেক হোল্ডার যে সুযোগ পায় ধান আর চালের দামের পার্থক্যটুকু ট্রান্সলেট করে নিজের কাছে রেখে দেওয়ার। যদিও ভেজা ধান শুকিয়ে, ভাঙ্গিয়ে গুদামজাত করতে তাকেই শ্রম, সময় ও অর্থ বিনিয়োগ করতে হয়।

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইন্সটিটিউটের বাজার গবেষণায় দেখা গেছে, চালের নিট মার্জিনের ৪৫ ভাগ ও ভ্যালু এডিশনের ২২ ভাগ মিলারেরই অবদান। প্রতি মওসুমে বড় ব্যবসায়ী ও রাইসমিলারদের কিছু আগাম প্রস্তুতি এবং দামের সমীকরণ সেট করা থাকে। এ কারণে ধানের ফলন বাম্পার হোক বা দুর্যোগ পর্যুদস্ত, চালের দামের ওঠানামার কারণ খুঁজে গেলে প্রায়শই কোন যৌক্তিক উপসংহার টানা সম্ভব হয় না। চালের বাজারদর বা মজুদ মনিটরিংয়ে সরকারের কোন একক কর্তৃপক্ষ নেই। কৃষি বিপণন আইন, ২০১৮-তে ব্যবসার ভলিয়ম বিবেচনা না করে মজুদের শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছে লাখ টাকা, আইন প্রয়োগের নজির যদিও বিরল। বড় ব্যবসায়ীদের না ঘাঁটিয়ে কেবল তাদের নীতিবোধের কাছে চালের বাজারের নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দেওয়া এবং নিছক হাপিত্যেশ বা রাজনৈতিক সতর্কবাণী কাজে দেবে আশা করা বিশেষ ফলদায়ী হওয়ার কথা নয়।

ধানের জাত বৈচিত্র্যের দেশে ভাতের থালায় আমরা চাইলেও অথেনটিক চাল পাই না। চাল রপ্তানির ভবিষ্যৎ সুযোগ লুফে নিতে হলে আমাদের বাংলাদেশি রাইস ব্র্যান্ড গড়ে তুলতে হবে যা গুণে ও মানে হবে শতভাগ বিশস্ত। বর্তমানে অটো-রাইসমিলগুলোতে স্ট্যান্ডার্ড পলিশিং সিস্টেম মানা হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে। দশ ভাগের জায়গায় ২০-২৭ ভাগ পর্যন্ত ছাঁটায়ের ফলে, চালের বহিস্তরে থাকা আমিষ, জিংক, আয়রন ও ভিটামিনের মত পুষ্টিমানগুলো আর অবশিষ্ট থাকে না বললেই চলে (তথ্যসূত্রঃ শস্যমান ও পুষ্টি বিভাগ, ব্রি)। সস্তায় কেনা মোটা চাল কেটে মিনিকেটসহ বাহারি নামে বেশি দামে বিক্রি করে অটো-রাইসমিলগুলো প্রতি কেজি চালে ১০-২৫ টাকা লাভ করে। মোটা চাল ছাঁটাই করে চিকন করায় জাতীয় উৎপাদনের একটি অংশ ইচ্ছাকৃত অপচয় হয়ে যাচ্ছে। ধানের পুষ্টিমান বাড়াতে গবেষণায় সরকারি বিনিয়োগের কোন সুফল আমরা পাচ্ছি না, উল্টো ছাটাইকৃত চাল খেয়ে স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়তে হচ্ছে। 

রাষ্ট্রায়ত্ত অটো-রাইসমিল প্রতিষ্ঠা করা হলে, কৃষক সহজে যে কোন আর্দ্রতা ও পরিমাণের ধান সরাসরি মিলগেটে বিক্রয় করতে পারবে। কৃষকের কাছ থেকে কেনা ধান ভাঙাতে সরকারকে কোন থার্ড পার্টির দ্বারস্থ হতে হবে না। শস্যের রাষ্ট্রীয় মজুদ ও খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির সেফটি নেটের জন্য ব্যবসায়ীদের উপর নির্ভরশীলতা কমে আসবে। ধান-চালের বাজারে সুষম প্রতিযোগিতা ও যৌক্তিক দামকরণের ক্ষেত্র সৃষ্টি হবে। চাল রপ্তানির মুনাফা এককভাবে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে যোগ হবে। 

কৃষিকে বেসরকারি খাত হিসেবে বিবেচনা না করে বৃহৎ জনগোষ্ঠির খাদ্য নিরাপত্তার রাজনৈতিক মূল্যের হিসাব কষে দেখার দরকার আছে। সরকারি চাল সংগ্রহকে ঢেলে সাজানো, বাজার নিয়ন্ত্রণ বা ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট ভাঙার চেয়ে বিকল্প প্রস্তাব হিসেবে উদ্বৃত্ত ধান উৎপাদন অঞ্চলে রাষ্ট্রায়ত্ত অটো-রাইসমিল প্রতিষ্ঠা একটি সহজ উদ্যোগ বৈ কি। 

লেখকঃ গবেষক ও কৃষি অর্থনীতিবিদ, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইন্সটিটিউট।
 

Advertisement
Advertisement