বৃহস্পতিবার   ২৪ অক্টোবর ২০১৯ ||  কার্তিক ৮ ১৪২৬ ||  ২৪ সফর ১৪৪১

যে কারণে পাঙ্গাসে অনীহা ভোক্তাদের, সম্ভব হচ্ছে না রপ্তানিও

বিশেষ প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ০০:৪২, ২৯ অক্টোবর ২০১৮

পাঙ্গাস মাছ। ছবি: কৃষি প্রতিদিন

পাঙ্গাস মাছ। ছবি: কৃষি প্রতিদিন

বাজারে গিয়ে পাঙ্গাস মাছ দেখে অনেকেই নাক শিটকান আবার দামে সস্তা হওয়ায় ভাতের পাতে মাছের যোগান দিতে অনেকের পাঙ্গাস মাছই ভরসা। তবে মাংসল এ মাছটি রপ্তানির সম্ভাবনা নিয়ে চাষ শুরু হয়েছিলো পুকুরে। কিন্তু শুধু রপ্তানি নয়, দেশের ভোক্তাদের কাছেও ফুরিয়ে যাচ্ছে মাছটির আবেদন। কিন্তু কেন? 

সম্প্রতি বাংলাদেশ ‍ও ডেনমার্কের তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় বেরিয়ে এসেছে এর প্রধান কারণ। রপ্তানি না হওয়া এবং ভোক্তাদের কাছে অপ্রিয় হওয়ার জন্য এই গবেষণা দায়ী করছে পাঙ্গাসের দুটি বৈশিষ্ট্যকে। এর একটি হচ্ছে চাষের পাঙ্গাস মাছে দুর্গন্ধ এবং অন্যটি হচ্ছে এর ফিলেট বা মাংসের হলুদ রং।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি শিক্ষার্থী শেখ রাজিবুল ইসলাম যিনি পাঙ্গাস নিয়ে এই গবেষণাটি করছেন তিনি বলেন, বাংলাদেশের পাঙ্গাস মাছের উপর গবেষণা করে দেখা গেছে মাছের দুর্গন্ধের পেছনে মূলত পুকুরের পানির গুনগত মান এবং মাছের মাংসের হলুদ রং এর জন্য দায়ী মাছের খাদ্যের উপকরণ। 

তাঁর মতে, মাছের খাবারের মধ্যে থাকা জিয়াজেনথেন এবং লুটেইন নামক দুটি রাসায়নিক উপাদান মূলত হলুদ রং এর জন্য দায়ী। মৎস্য খাদ্যে ব্যবহৃত ভূট্টা ও খৈল এ দুটি রাসায়নিকের প্রধান উৎস। এ তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা পুকুরে পানির সঠিক মান নিয়ন্ত্রণ এবং বিভিন্ন রকমের খাদ্য উপকরণ ব্যবহার করে একটি গবেষণা করা হয়। গবেষণার ফলাফলের ভিত্তিতে খুব শিগগির গুণগতমান সমৃদ্ধ পাঙ্গাস মাছ উৎপাদন এবং বহির্বিশ্বে রপ্তানি সম্ভব হবে বলে জানান শেখ রাজিবুল ইসলাম। 

ব্যাংফিশ প্রকল্পের আওতায় তাঁর এই গবেষণায় সহযোগিতা করছে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ডেনমার্কের কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়। বাকৃবি একোয়াকালচার বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মাহফুজুল হক ও কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. নিল ও জি জরজেনসন এর তত্ত্বাবধানে শেখ রাজিবুল ইসলাম গত ৩ বছর ধরে এ গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন।

ড. মাহফুজুল হক কৃষি প্রতিদিনকে বলেন, সাধারনত ইউরোপ-আমেরিকার বাজারে সাদা মাংসের পাঙ্গাসের চাহিদা রয়েছে। কিন্তু দেশে পানির গুণাগুণের সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে যেমন দুর্গন্ধযুক্ত পাঙ্গাস উৎপাদন হচ্ছে তেমনি পাঙ্গাসের মাংসের রং হলুদ হচ্ছে। তাই পাঙ্গাসের মাংসের এই হলুদ রং এবং দুর্গন্ধের কারণে বিদেশের বাজার ধরতে পারছে না এই মাছ। সে সুযোগে সাদা মাংসের পাঙ্গাস রপ্তানির মাধ্যমে ইউরোপ-আমেরিকার বাজারে তাদের শক্ত অবস্থান তৈরি করে নিয়েছে ভিয়েতনাম।

নরওয়ের একটি অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ড. মাহফুজুল হক বলেন, সেখানে একবার একটি সুপার মার্কেটে মাছ কিনতে যেয়ে’ একোয়াকালচার ষ্ট্যুয়ার্ডশিপ কাউন্সিল (এএসসি)’ কর্তৃক সার্টিফাইড পাঙ্গাস ফিলেট পেলাম যা ভিয়েতনাম থেকে আমদানীকৃত। ৮শ’ গ্রাম পাঙ্গাস ফিলেট প্যাকেটের দাম নিলো বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় ৮শ’ ৭৫ টাকা। ভিয়েতনামী পাঙ্গাস ইউরোপের অন্যতম ধনী দেশ নরওয়ের জনগন উচ্চ দামে কিনে খাওয়ার কারণ হচ্ছে ভিয়েতনামী চাষীরা এএসসি সার্টিফিকেশনের আওতায় একটি মানদন্ড অনুসরণ করে পাঙ্গাস উৎপাদন করছে। নিঃসন্দেহে ভিয়েতনামের পাঙ্গাস চাষীরা এতে অনেক লাভবান হচ্ছেন।

“ভিয়েতনাম রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা, দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ ইত্যাদি কারনে পাঙ্গাস রপ্তানি অনেক আগে থেকে শুরু করতে পেরেছে। সম্প্রতি আমাদের দেশেও কয়েকজন উদ্যোগতা পাঙ্গাস প্রসেসিং প্লান্ট স্থাপন করেছেন এবং প্রসেসিং কার্যক্রম  শুরু করেছেন। আশা করা যায় বাংলাদেশের পাঙ্গাস এএসসি সার্টিফিকেশন বা অন্য কোন কাস্টমাউজড সার্টিফিকেশনের আওতায় উৎপাদিত হয়ে বিশ্ব বাজারে স্থান করে নিবে” বলেন ড. মাহফুজ।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও মাৎস্য বিজ্ঞানী ড. আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, সঠিক পদ্ধতিতে চাষ করলে সহজেই পাঙ্গাস মাছের দুর্গন্ধ দূর করা সম্ভব। হলুদ রঙ দূরীকরণে আরও বিশেষ গবেষণা প্রয়োজন। “শেখ রাজিবুল ইসলামের এই গবেষণা পাঙ্গাসের হলুদ রং দূর করতে বড় ভূমিকা রাখবে বলে আমি মনে করি” বলেন ড. আনোয়ার। 

এই মৎস্য বিজ্ঞানী বলেন, রপ্তানি বাজারে পাঙ্গাসের অনুপস্থিতি এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্য কম থাকায় চাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যে কারণে পাঙ্গাস চাষের ক্ষেত্রে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে তারা। ফলে বিপুল সম্ভাবনাময় এই মাছের উৎপাদনই এখন হুমকির মুখে বলেও মনে করেন তিনি। এসব কারণে চাষ ভিত্তিক মৎস্য উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে পঞ্চম হওয়া স্বত্বেও মৎস্য রপ্তানিতে কোন অবস্থানই নেই বলেও জানান ড. আনোয়ার।

বাংলাদেশে বর্তমানে মোট চাষকৃত মাছের শতকরা ১৬ ভাগ আসে পাঙ্গাস থেকে। গবেষণার ফলাফলের ভিত্তিতে খুব শীঘ্রই গুণগতমান সমৃদ্ধ পাঙ্গাস মাছ উৎপাদন এবং বহির্বিশ্বে রপ্তানি সম্ভব হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।