মঙ্গলবার   ২৭ অক্টোবর ২০২০ ||  কার্তিক ১১ ১৪২৭ ||  ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

ACI Agri Business

ভিটামিন ডি ঘাটতির লক্ষণ ও খাবার

পুষ্টিবিদ ইসরাত জাহান

প্রকাশিত: ০১:০৩, ১ সেপ্টেম্বর ২০২০

করোনা মহামারিকালীন শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নিয়ে যত আলোচনা হয়েছে তার সাথে আবশ্যিকভাবেই এসেছে ভিটামিন ডি এর কথা। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং শারীরিক অবস্থার উন্নতি ঘটাতে ভিটামিন ডি খুবই উপকারী। ভিটামিন ডি হচ্ছে একটি ফ্যাট সলিউবল সিকুস্টেরয়েড, যার কাজ হচ্ছে ইনটিস্টাইন থেকে ক্যালসিয়ামকে শোষণ করা। পাশাপাশি এটি আয়রন, ম্যাগনেসিয়াম এবং ফসফরাসকেও দ্রবীভূত করে পুষ্টিবিদ উপাদান গ্রহণের মাত্রা বাড়িয়ে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে বাড়িয়ে তুলে।

কিন্তু দু:খজনক হচ্ছে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার একটা বড় অংশই ভিটামিন ডি-এর ঘাটতিতে ভুগছে। করোনা শুরু হওয়ার পর থেকে বাজারে বেড়ে গেছে ভিটামিন ডি ক্যাপসুলের চাহিদা। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে অনেকেই ক্যাপসুল আকারে গ্রহণ করছেন ভিটামিন ডি। ভিটামিন ডি যে শুধু রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় তা নয়, এর ঘাটতি হওয়া মানে ধীরে ধীরে হাড় দুর্বল হয়ে পরা। আর এমনটা হওয়া মানেই আর্থারাইটিসের মতো রোগ মাথা চাড়া দিয়ে ওঠা। আরেকটি বিষয়ও মাথায় রাখা জরুরি যে ভিটামিন ডি হাড়কে শক্তিশালী করার পশাপাশি হার্ট, ব্রেনকেও সুরক্ষা দেয়। 

এখন প্রশ্ন হল শরীরে ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি কিভাবে পূরন করবেন? এক্ষেত্রে কতগুলি সহজ পদ্ধিতি অবলম্বন করার মাধ্যমে এ সমস্যা সহজেই দূর করতে পারেন। কিন্তু তার আগে জেনে নেয়া উচিত কী কী লক্ষণ দেখলে বুঝবেন আপনার শরীরে ঘাটতি রয়েছে এই ভিটামিনের।  

মাংসপেশীর দূর্বলতা:
শরীরের ভিটামিন ডি এর অভাবে মাংসপেশীর দূর্বলতা বেড়ে যায়। বিশেষ করে মাংসপেশী বেড়ে যাওয়া এবং মাংসপেশী কাঁপার মতো সমস্যাগুলো হয়ে থাকে। কাজেই মাংসপেশীর দুর্বলতা কাটাতে নিয়মিত ভিটামিন ডি খান।

বিষণ্ণতা:
বিষণ্ণতা বাড়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে ভিটামিন ডি। এর ফলে সারাক্ষণ মানসিক চাপ অনুভূত হয়। তখন কোনো কারণ ছাড়াই অতিরিক্ত বিষণ্ণতায় ভুগতে পারেন। শুধু তাই নয়, এর অভাবে মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়। ফলে মানুষ এমনি এমনি রেগে যায়।

হাড়ে ফাটল:
ভিটামিন ডি এর অভাবে হাড়ে সহজেই ফাটল ধরে। এর ফলে একটু পড়ে গেলে কিংবা সামান্য আঘাত পেলেই হাড়ে চির ধরে যায়। আবার অনেক সময় হাড়ে প্রচন্ড ব্যাথা করলেও বুঝবেন আপনার শরীরে ভিটামিন ডি এর অভাব রয়েছে।

দাঁত ভেঙ্গে যাওয়া:
সবসময় আপনার দাঁতে সমস্যা। শক্ত কোন কিছুই খেতে পারেন না। যদি এমনটি হয়ে থাকে তাহলে বুঝবেন আপনার শরীরে ভিটামিন ডি' এর অভাব রয়েছে। ভিটামিন ডি এর অভাবে দাঁত ক্ষয়ে যাওয়ার পাশাপাশি ভেঙ্গেও যায়।

উচ্চ রক্তচাপ:
ভিটামিন ডি এর অভাবে উচ্চ রক্তচাপ বেড়ে যেতে পারে। কাজেই সময় থাকতে আগে থেকেই সচেতন হোন এবং ভিটামিন ডি সমৃদ্ধ খাবার খান।

ক্লান্তি ও ঘুম:
ভিটামিন ডি এর অভাবে একটুতেই অনেক ক্লান্তি নেমে আসে। ফলে অনেক ঘুম পায়। তাই কর্মক্ষেত্রে আরও কর্মঠ কর্মী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইলে নিজের শরীরে ভিটামিন ডি এর অভাব পূরণ করুন।

মেজাজে প্রভাব:
ভিটামিন ডি এর অভাব যে কোন মানুষের মেজাজ-মর্জিতে প্রভাব ফেলে। এ সময় মনের মধ্যে চাপা একটা অশান্তি কাজ করে। ফলে সবসময় মেজাজ রুক্ষ থাকে। কেউ ভালো কথা বললেও প্রচণ্ড রাগ হয়।  তাই কারো সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হওয়ার আগেই শরীরে ভিটামিন ডি এর চাহিদা পূরণ করুন।

ওজন বৃদ্ধি:
ওজন বাড়ানোর জন্যও দায়ী ভিটামিন ডি। কাজেই প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় ভিটামিন ডি সমৃদ্ধ খাবার অবশ্যই রাখুন। 
 
মানুষের শরীরে ভিটামিন-ডি এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ উপকারী উপাদান যা অষ্টিওপরোসিস, বিষণ্ণতা, জরায়ু ক্যান্সার, স্তন ক্যান্সার এমনকি ডায়বেটিকস এবং মেদ বৃদ্ধি প্রতিরোধে সহায়তা করে। অনেকেই আছেন যারা নিজেরাও জানেন না তারা ভিটামিন ডি এর অভাবে ভুগছেন। কাজেই আপনি যদি নিজের মধ্যে উপরোক্ত লক্ষণগুলো বুঝতে পারেন তাহলে এর মাত্রা জানতে সঙ্গে সঙ্গে শরীর চেকআপ করে নিন। 

ভিটামিন ডি এর উৎস
ক্যাপসুল খেয়ে ভিটামিন ডি এর অভাব হয়তো পূরণ করা যায়। কিন্তু তার চেয়ে ভালো উপায় হচ্ছে আপনি প্রাকৃতিক উপায়েই পেতে পারেন শরীরে পর্যাপ্ত ভিটামিন ডি। সূর্যের আলো ভিটামিন ডি এর অন্যতম একটি উৎস। তবে সূর্যের কড়া আলোতে না গিয়ে হালকা রোদ গায়ে লাগান। ভিটামিন ডি এর অভাব পূরণের জন্য হালকা রোদে সামান্য ব্যায়ামও করতে পারেন। সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত রোদ সবচেয়ে ভালো। এই সময় সূর্যের যে আলো আসে, সেটি ভালো। কেবল শীতকাল নয়, সব ঋতুতেই যদি আমরা কিছুক্ষণ রোদে বসি, পাঁচ মিনিট থেকে আধা ঘণ্টা পর্যন্ত সপ্তাহে দুবার, তাহলে উপকৃত হওয়া যায়। 

এছাড়া নিয়মিত ৫টি খাবার খেলেও ভিটামিন ডি দেহে তৈরি হয়। জেনে নিন, সেই ৫টি খাবারের নাম- 

১) চিজ
ভিটামিন ডি শরীরের তৈরি করতে গেলে চিজ খান। এছাড়াও চিজ খেলে শরীরে ক্যালশিয়ামের মাত্রা বাড়ে। 

২) মাশরুম
খাওয়ার আগে অবশ্যই মাশরুম ভাল করে ধুয়ে রান্না করবেন। অ্যালার্জির প্রবণতা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। 

৩) তেলযুক্ত মাছ বা সামুদ্রিক মাছ
মাছের তেলে ভিটামিন ডি থাকে। তাই যথেষ্ট পরিমাণে সামুদ্রিক মাছ খান। 

৪) দুধ 
মাশরুমের মত দুধেও প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ডি রয়েছে। তাই শরীরের ভিটামিন ডি-এর যোগান বৃদ্ধির করার জন্য দুধ বা দুগ্ধজাত খাবার খাওয়া খুবই জরুরি।

৫) ডিম
শরীরে ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি মেটাতে প্রতিদিনের খাবার তালিকায় একটি করে ডিম থাকা খুবই জরুরি। ডিমে প্রোটিন এবং উপকারী কোলেস্টেরলের পাশাপাশি ভিটামিন ডি-ও রয়েছে। তাই শরীরকে কর্মক্ষম রাখতে এবং হাড়ের রোগবালাই থেকে রক্ষা পেতে প্রতিদিন একটা বা দুটো ডিম খাওয়া উচিত।

করোনাকাল থেকে আমাদের যে বড় শিক্ষা তা হলো রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো। আর সেটি রাতারাতি খাবার খেয়ে বা ক্যাপসুল খেয়ে সম্ভব নয়। তাই আগে থেকেই ভিটামিন ডি এর অভাবজনিত লক্ষণগুলো জেনে নিন এবং সতর্ক থাকুন। নিয়মিত ভিটামিন ডি সমৃদ্ধ খাবার খান। সুস্থ থাকুন।

Advertisement
Advertisement