মঙ্গলবার   ১০ ডিসেম্বর ২০১৯ ||  অগ্রাহায়ণ ২৬ ১৪২৬ ||  ১২ রবিউস সানি ১৪৪১

ভবিষ্যত ভাতের চাহিদা মেটাতে এখনই প্রস্তুতি প্রয়োজন

ড. জীবন কৃষ্ণ বিশ্বাস

প্রকাশিত: ২০:৪৩, ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৮

একসময় আমাদের দেশে ভাতের অভাব ছিল চরম। তখন পুরোটাই ছিল প্রকৃতিনির্ভর আবাদ ব্যবস্থা। খরা-বন্যার আচরণ যে খুব একটা বন্ধুসুলভ, এমন নয়। তাই এক বছর ধানের ফলন ভালো হলেও আরেক বছর হয়তো তেমন কিছু ঘরে আসত না। ফলনও আহামরি কিছু ছিল না। হেক্টরপ্রতি গড়ে এক থেকে দেড় টন মাত্র। অতএব সামগ্রিক ফলন দাঁড়াত প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। ১৯৭১ সালের কথা যদি ধরি, দেশের লোকসংখ্যা ছিল সাত কোটির কিছু বেশি। উৎপাদিত চালের পরিমাণ ১০ মিলিয়ন টনের মতো। অথচ দরকার আরো ১০ মিলিয়ন টন। তখন পুরো এশিয়ায়ই ধানের ফলন খুব একটা ভালো অবস্থায় ছিল না। চাইলেও বাইরে থেকে জোগাড় করা যেত না। কিনে আনার সংগতিও ছিল না। তাই অনেকটাই খয়রাতি সাহায্যের ওপর নির্ভর করতে হতো। সেখানে আমাদের পছন্দের খাবার থাকত না। হয়তো গম অথবা খুদের চাল পেয়ে খুশি থাকতে হতো। না পাওয়া গেলে বিপুল জনগোষ্ঠীকে অবধারিত আকালের মুখোমুখি হতে হতো। এ অবস্থা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ঠাট্টা-মশকারিও কম হয়নি। ‘বাংলাদেশ আর তলাবিহীন ঝুড়ি নয়। এখন ঝুড়ি থেকে খাদ্য উপচে পড়ছে।’

আমাদের দেশে ধানের জাত উন্নয়ন কার্যক্রম শুরু হয় ১৯১০-১১ সালে। সেই থেকে আজ পর্যন্ত ধান গবেষণার কর্মকালকে পাঁচ পর্বে ভাগ করা যায়। যেমন—১৯১০ থেকে ১৯৪০ সাল পর্যন্ত আদি পর্ব। ১৯৪০ থেকে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত প্রাক-প্রস্তুতি পর্ব। ১৯৬০ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত প্রস্তুতি পর্ব। ১৯৭০-২০১০ সাল উফশী পর্ব। ২০১০ সাল থেকে সামনের দিকে উফশী-উত্তর পর্ব। উফশী পর্বকে সবুজ বিপ্লবের পর্ব হিসেবেও গণ্য করা যায়। আর উফশী-উত্তর ধাপকে সবুজ বিপ্লবোত্তর পর্ব। এর মধ্যে ২০০১ সালের আগে একবার চালে স্বয়ম্ভরতা অর্জনের সুযোগ হয়েছিল। নানা কারণে সে অবস্থা ধরে রাখা যায়নি। এরপর ২০১৫ সালে আবার স্বয়ম্ভরতা অর্জন সম্ভব হয়েছে। এখন আমাদের এ স্বয়ম্ভরতা টেকসই করার পালা। যাতে করে ২০০১ সাল-পূর্ববর্তী সময়ের অবস্থায় আর যেন ফিরে যেতে না হয়।

ধান নিয়ে আমাদের যে ধাপে ধাপে যাত্রা, তার প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল দেশকে খাদ্যে স্বয়ম্ভর করা। তা সম্ভব হয়েছে। এমনকি কিছুটা উদ্বৃত্তও আছে। এখনকার উদ্দেশ্য হলো টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা।

১৯১৪-১৫ বছরে সারা দেশে উৎপাদিত চালের পরিমাণ ছিল ৩৪.৮৬ মিলিয়ন মে. টন। আর জনসংখ্যা ১৫৮.৪৯। মাথাপিছু বছরে চালের চাহিদা বর্তমানে ১৪৮ কেজি। একসময় ছিল ১৭০ কেজি। বছরে কমছে ০.৭ শতাংশ হারে। এই হিসাবে এ বছর চালের দরকার ২৪.১ মিলিয়ন মে. টন। উৎপাদিত চালের ২৫ শতাংশ আমাদের খাওয়ার কাজে ছাড়া অন্য কাজে ব্যবহৃত হয়। যেমন—বীজ হিসেবে ১২ শতাংশ ব্যবহৃত হয়। বাকিটা পশুর খাবার ও অন্যান্য কাজে। না চাইলেও কিছু পরিমাণ নষ্ট হয়ে যায়। এর মোট পরিমাণ দাঁড়ায় ৮.৭ মিলিয়ন মে. টন। অতএব খাওয়া, বীজ ও আর সব দিয়ে মোট ৩২.৮ মিলিয়ন মে. টন চাল কাজে লাগার পর উদ্বৃত্ত থাকছে ২.০৬ মিলিয়ন মে. টন। খাদ্য নিরাপত্তার খাতিরে আমাদের ন্যূনতম প্রতিবছর দুই মিলিয়ন মে. টন খাবার অবশ্যই হাতে রাখতে হবে। সেটা কি সম্ভব? কারণ জমি কমছে। ধানের জমি কমার পরিমাণ প্রতিবছর ০.৪ শতাংশ। প্রতিবছর বাড়তি জনসংখ্যা ২.২ মিলিয়নের জন্য বাড়তি চালের দরকার হচ্ছে ০.৩৪ মিলিয়ন মে. টন। ধানবিজ্ঞানীদের হিসাবে ২০৫০ সাল নাগাদ ২১ কোটি ৫৪ লাখ মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় চালের পরিমাণ দাঁড়াবে ৪৭.২ মিলিয়ন মে. টন। এই হিসাব ২৫ শতাংশ খাদ্য হিসাবে ব্যবহারের বাইরে এবং উদ্বৃত্ত চালের পরিমাণ ২.৬ মিলিয়ন মে. টন ধরে। বেশ উচ্চাভিলাষী চিন্তাভাবনা মনে হতে পারে। কারণ এ পথে চ্যালেঞ্জ কম নেই। জমি কমার হিসাব যদি ধরি। চালের (ধান নয়) জাতীয় গড় ফলন হেক্টর ৩.১৯ টন এখনো। ২০৫০ সালে জনসংখ্যা দাঁড়াবে ২১ কোটি ৫৪ লাখ। এ অবস্থার কোনো উন্নতি না হলে চালের উৎপাদন ঘাটতি দাঁড়াবে ১৬.১ মিলিয়ন মে. টন। উদ্বৃত্ত বাদ দিয়ে এ হিসাব দাঁড়াবে ১৩.৫ মিলিয়ন মে. টন। তবুও বিরাট ঘাটতি। এ ছাড়া আরো অনেক সমস্যা আছে। আমাদের জমির উর্বরতা ধরে রাখা যাচ্ছে না। জৈব পদার্থের পরিমাণ কমে যাচ্ছে। মাটির উৎপাদিকা শক্তি কমে যাচ্ছে। যতই চেষ্টা করি না কেন, ক্রপিং ইনটেনসিটি বাড়ানোর সুযোগ কম। ২০৫০ সালের পর কোনোক্রমেই ২.২১-এর ওপরে নেওয়া যাবে না। পানির স্তর অনেক জায়গায় আশঙ্কাজনক হারে নিচে নেমে যাচ্ছে। গ্লোবাল-ওয়ার্মিংয়ের কারণে ফসলের চলতি ধরনের জাতগুলো দিয়ে আর বেশি ফলন না পাওয়ার আশঙ্কা। উপরন্তু ফলন যথেষ্ট পরিমাণে কমে যেতে পারে বলেই অনেক গবেষক আশঙ্কা করছেন। ভবিষ্যতের এসব ঝামেলা থেকে মুক্তির উপায়ও আছে।

শুধু জাত নয়, ভালোমতো পরিচর্যা দিয়েও আমরা ‘জেনেটিক গেইন’ বাড়াতে পারি। আমরা জানি, আমাদের ধানের খামার পর্যায়ের পটেনশিয়াল ফলন চালের হিসাবে গড়ে চার মে. টন হেক্টরপ্রতি। কিন্তু পাওয়া যাচ্ছে ৩.১৭ মে টন। ঘাটতি বা ণরবষফ মধঢ় প্রায় এক মে. টনের কাছাকাছি (২০ শতাংশ)। কিন্তু কৃষিতাত্ত্বিক ব্যবস্থাপনা দিয়ে এটা যদি কমিয়ে ফেলা যায়, তাহলে বিরাট লাভ। একটু সতর্ক হলেই সেটা সম্ভব বলে বিজ্ঞানীরা মনে করেন। আরো কিছু হিসাব কষা গেছে। নতুন ভালো জাত দিয়ে পুরনো জাত, তা সে যতই ভালো হোক, প্রতিস্থাপন করা। যেমন আমাদের দেশে সবচেয়ে জনপ্রিয় জাত হলো ব্রি ধান২৮ ও ব্রি ধান২৯। বোরো মৌসুমে ৭০ শতাংশের বেশি জায়গাজুড়ে জাত দুটি আবাদ করা হয়। এদের বয়স ২০ বছরের বেশি। জনপ্রিয়তার শীর্ষে উঠতে সময় নিয়েছে প্রায় ১৫ বছর। কিন্তু এটাকে যদি আরো আগেই কৃষকের কাছে পৌঁছে দেওয়া যেত, তাহলে তার ফলন পটেনশিয়ালের আরো বেশি সদ্ব্যবহার করা যেত। আমরা জানি, একটা জাতের নিজস্ব গুণাগুণ নিশ্চয়ই নষ্ট হয় না। কিন্তু বদলে যাওয়া পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে অবশ্যই বেশ অসুবিধা হয়। হয়তো নতুন ধরনের বৈরী পরিবেশ মোকাবিলা করতে হয়। ফলে ফলন কমে যায়। এ জন্য অস্ট্রেলিয়া-আমেরিকার মতো দেশে একটি জাত অবমুক্ত হওয়ার কয়েক বছর পরেই আবার নতুন জাত দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হয়। কিন্তু আমাদের দেশে এখনো তা সম্ভব হচ্ছে না। কিন্তু যদি দেওয়া যেত, তাহলে ভালো হতো। এক অনুসন্ধানে জানা গেছে, এখন যে ফলন আমরা পাচ্ছি তা দিয়েই যদি কৃষকের কাছে চটজলদি জাত প্রতিস্থাপন করা যেত, তাহলেও চালের জোগান চাহিদামতো বজায় রাখা যেত।

সুতরাং বাধাগুলো অতিক্রমের উপায় কিন্তু আছে। আমাদের শুধু সুযোগ ও জায়গা বুঝে সেগুলো প্রয়োগ করতে হবে।

২০৭০ সালে আমাদের জনসংখ্যা দাঁড়াবে ২৫ কোটি। তারপর নানা কারণে জনসংখ্যা আর বাড়বে না। মানুষের দৈনন্দিন খাবারের তালিকায় ভাতের পরিমাণ যথেষ্ট পরিমাণে কমে যাবে। নিশ্চয়ই প্রযুক্তিগত অনেক উন্নতি হবে। অদূর ভবিষ্যতে কৃষি এমন জায়গায় যাবে, যাকে Precision agriculture বললে কম বলা হবে। হয়তো তাকে সে সময় Digital agriculture বা nano agriculture বা ultra precision agriculture বলা হতে পারে। তখন ধান গবেষণার আজকের যে চেহারা তার খোল-নলচে বদলে যাবে। আর সেই প্রস্তুতি আমাদের এখনই শুরু করা দরকার। বা শুরু হয়ে গেছে বলা যায়। এবং তা দরকার আমাদের উত্তর পুরুষের অস্তিত্বের প্রয়োজ নেই।

লেখক: সাবেক মহাপরিচালক, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, গাজীপুর।