শুক্রবার   ০৭ আগস্ট ২০২০ ||  শ্রাবণ ২২ ১৪২৭ ||  ১৭ জ্বিলহজ্জ ১৪৪১

ACI Agri Business

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষ ও মুক্তাগাছার রাজবাড়ি

আফসানা অনু

প্রকাশিত: ২১:০৮, ২৬ জুন ২০২০

সীমান্তের জেলায় জন্মগ্রহণ করে আমার বরাবর-ই ঝোক ছিল  ঐতিহাসিক স্থাপনা ভ্রমণের দিকে। আশেপাশের কোনো রাজবাড়ি ভ্রমণ আমি বাদ দিতে পারিনা। অই যুগের রাজকন্যা না হওয়ার আফসোসের সাথে এই যুগে এসব স্থাপনায় রাত্রি যাপন না করতে পারার আফসোস আমাকে ঝেকে ধরে। ময়মনসিংহ শহরে আসার পর থেকেই ইচ্ছে ছিল এর রাজবাড়ি গুলো ঘুরে বেড়ানোর, কিন্তু বাকৃবির ক্লাস-প্রাকটিক্যাল এর চাপে হয়ে উঠছিল না।

কোনো এক শুক্রবারের সকালে নাস্তা সারতে সারতে মনে হলো,ঘুরে আসা যাক। যেই বলা সেই কাজ,মুহুর্তে জড়ো হয়ে গেল ১৫-২০  জন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দিকে এই এক সুবিধা,বাতাসে এডভেঞ্চার ঘুরে বেড়ায়, আভাস পেলেই আপনি এভারেস্ট জয় বা যুদ্ধ জয় যেকোনোটির জন্যেই দল তৈরী করে ফেলতে পারবেন মুহুর্তেই।

হল থেকে বের হয়ে অটোরিকশা নিয়ে চলে এলাম টাউন হল মোড়ে, এখান থেকে লেগুনায় যেতে হবে রাজবাড়ির ফটকে। কিন্তু বিধিবাম মাঝরাস্তায় বাধ সাধলো ঝড়ো বৃষ্টি, ভিজে টইটুম্বুর অবস্থায় বৃষ্টি বিলাশের সাথে চলতে থাকলো আমাদের রাজবাড়ি যাত্রা। এখন অবশ্য এত ঝামেলা পোহাতে হয় না, ময়মনসিংহের ব্রিজ মোড়ে দাড়ালেই আপনি সহজেই পেয়ে যাবেন মুক্তাগাছাগামী বিআরটিসি বাস।

রাজবাড়িতে সহপাঠীদের সাথে।ঠিক মাঝদুপুরে পৌছে গেলাম বিশালাকার সিংহ দরজার প্রবেশমুখে। পুরো বাড়ি ঘুরে দেখার আগে এই রাজবাড়ির ঐতিহাসিক পটভূমিটি একটু পাঠকের সামনে তুলে ধরা যাক। ইতিহাস থেকে জানা যায়, জমিদার আচার্য চৌধুরী বংশ মুক্তাগাছা শহরের গোড়াপত্তন করেন। আচার্য চৌধুরী মূলত: বগুড়ার বাসিন্দা হলেও তাঁর চার ছেলে পলাশীর যুদ্ধের পর নানা কারণে মুক্তাগাছা চলে আসেন, এখানেই ১০০ একর জমির উপর গড়ে তুলেন জমিদারি। তাহলে প্রশ্ন জাগতেই পারে, তাহলে তো এটি হওয়ার কথা জমিদার বাড়ি, রাজবাড়ি বলা হয় কেনো? কারণ হচ্ছে, এখানকার জমিদার তৎকালীন নবাবের কাছ থেকে রাজা উপাধি পান, ফলে সেই উপাধির সূত্রেই বাড়িটি পরিচিতি পায় রাজবাড়ি হিসেবে। 

ময়মনসিংহ শহর থেকে প্রায় ১৭ কি.মি.দূরে এই মুক্তাগাছা রাজবাড়ির আশেপাশে সেসময় কোনো বসতি ছিল না, চারদিকে ছিল অরণ্য আর জলাভূমি। 

রাজবাড়ির ভিতরে কিছু স্থাপনা খুবই সুসজ্জিত কারুকার্যের লাল-সাদা রঙে সাজানো, আবার কিছু অংশ ধ্বংসস্তুপের অবশিষ্টাংশ। তবে একমাত্র  এই ধ্বংসস্তুপে দাড়িয়েই আপনি রাজবাড়ির সেই সময়কার সদস্যদের পদচিহ্ন অনুভব করতে পারবেন, কেননা সেই তখন থেকে এখানে কোনো কৃত্রিম রঙ করা হয় নি, হয় নি সেরকম পরিচর্যা। রাজবাড়ির ভিতরে স্থাপনার মধ্যে রয়েছে জমিদারের মায়ের ঘর, মন্দির, দরবার হল, অতিথিঘর, কাচারিঘর, সিন্দুক ঘর এবং অন্যান্য। এখানে এমন একটি ঘর রয়েছে যার চারপাশে কোনো দেয়াল নেই, এটি এমনভাবে নির্মিত যে প্রচন্ড গরমের দিনে এই ঘরটি দিয়ে বয়ে যাবে হিমশীতল হাওয়া।

মুক্তাগাছা রাজবাড়ির একাংশ।প্রায় দু-ঘণ্টা ঘুরাঘুরি এবং ফটোশ্যুট শেষে বেরিয়ে এলাম মুক্তাগাছা বাজারের দিকে। মুক্তাগাছার মন্ডার সুনাম রয়েছে সারাদেশ জুড়ে। একমাত্র এই বাজারে এসেই আপনি পাবেন আসল ও অকৃত্রিম মন্ডা। প্রতি পিস ২০-২২ টাকায় আমাদের সকলের ভোজন প্লেটেই এটি শোভা পেল। সবশেষে হল বন্ধের তাড়নায় বিকেল-বিকেলের মধ্যেই রওনা দিলাম ক্যাম্পাসের দিকে।

ঐতিহাসিক এই জায়গাটিতে মন্ডার দোকানের পাশাপাশি রয়েছে কিছু ভারী খাবারের দোকান, থাকার জন্যে রয়েছে আবাসিক হোটেল ব্যবস্থা। তাই আপনি যে প্রান্ত থেকেই আসুন না কেন, থাকা-খাওয়া নিয়ে আপনাকে খুব একটা ঝামেলা পোহাতে হবে না। খুব অনায়াসেই আপনি ভ্রমণ করতে পারবেন ময়মনসিংহের এই বিখ্যাত রাজবাড়িটি।

লেখিকা: বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী।

Advertisement
Advertisement