মঙ্গলবার   ১০ ডিসেম্বর ২০১৯ ||  অগ্রাহায়ণ ২৬ ১৪২৬ ||  ১২ রবিউস সানি ১৪৪১

বাকৃবি গবেষকদের সাফল্য

বিলুপ্ত প্রায় ভাগনা মাছ ফিরে আসছে আবার

বাকৃবি প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ০০:০০, ৫ অক্টোবর ২০১৮

বিলুপ্ত হতে যাওয়া দেশীয় সুস্বাদু ভাগনা মাছ আবারও ফিরে পাচ্ছে হারানো গৌরব। আবারও পুকুর-নদী, খাল-বিলে ছড়িয়ে পড়বে এই মাছ। কারণ মাছটির পোনা উৎপাদন ও জাত উন্নয়নের সফলতা পেয়েছেন গবেষকরা। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্বদ্যিালয়ের মাৎস্য বিজ্ঞান অনুষদের গবেষকরা দীর্ঘ তিন বছরের গবেষণায় এ সফলতা অর্জন করেন। 

গবেষণায় নেতৃত্ব দেন মাৎস্য বিজ্ঞান অনুষদের বায়োলজি অ্যান্ড জেনেটিক্স বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. এ.কে. শাকুর আহম্মদ এবং অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ গোলাম কাদের খান। কৃষি গবেষণা কাউন্সিল ও ন্যাশনাল এগ্রো টেকনোলজি ফেইজ-২ এর আর্থিক সহায়তায় গবেষণাটি সম্পন্ন হয়। বুধবার অনুষদীয় চেম্বারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়।

ভাগনা মাছটি বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন নামে পরিচিত। যেমন ভাংগন বাটা, ভাগনা, ভাংগন, ভাগনা বাটা ইত্যাদি। মাছটি আকারে ৩০ সেমি এবং ওজনে প্রায় ৫০০ গ্রাম পর্যন্ত হয়। 

গবেষকরা জানান, লাইন ব্রিডিং পদ্ধতির মাধ্যমে পোনা উৎপাদন এবং জাত উন্নয়ন করতে সক্ষম হয়েছেন তারা। লাইন ব্রিডিং এমন একটি পদ্ধতি যেখানে একটি মাছকে তার বংশধরদের সঙ্গে ক্রস করানো হয়। ঐতিহ্যগতভাবে একটি পুরুষ মাছকে অনেকগুলো মহিলা মাছের সঙ্গে প্রজনন ঘটানো হয়। লাইন ব্রিডিং প্রোগ্রামের মাধ্যমে বিভিন্ন স্টকের মধ্য থেকে উচ্চ বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ভাগনা মাছ আবিষ্কার করে পরবর্তী জেনারেশনে বংশধরদের মাঝে তাদের জিনগত অবদান বাড়ানো হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন লাইনের মধ্যে প্রজনন ঘটিয়ে প্রজাতির মধ্যে জিনগত বৈচিত্রতা রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে ভাগনা মাছে, বলেন গবেষকরা। 

প্রধান গবেষক অধ্যাপক ড. এ.কে. শাকুর আহম্মদ বলেন, লাইন ব্রিডিং কৌশলে ভাগনা মাছের পোনা উৎপাদন এটিই বাংলাদেশে প্রথম। এই পদ্ধতির মাধ্যমে ভাগনা মাছকে সংরক্ষণ ও বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করতে হলে উচ্চ গুণসম্পন্ন পোনা উৎপাদনের কোনো বিকল্প নেই। দেশে আমিষের চাহিদা পূরণ ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে এই মাছটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

ড. শাকুর আহম্মদ জানান, এই গবেষণায় বাংলাদেশের তিনটি নদী আত্রাই (দিনাজপুর), কংস (ময়মনসিংহ) এবং যমুনা (সিরাজগঞ্জ) থেকে প্রাকৃতিক ভাগনা মাছের পোনা জেলেদের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়। নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে তাদেরকে লালন পালন করে গোনাডাল ম্যাচুরেশনকে ত্বরান্বিত করা হয়। এরপর লাইন ব্রিডিংয়ের মাধ্যমে ভাগনা মাছের উচ্চ গুণাগুণ সম্পন্ন পোনা উৎপাদন করা হয়। গবেষণায় ৬টি লাইন তৈরি করা হয়। এরমধ্যে লাইন-৪ (কংস ও আত্রাই) এর দৈর্ঘ্য ও ওজন সবচেয়ে বেশি পাওযা যায়। বর্তমানে লাইন-৪ থেকেই উন্নতজাতের মা মাছ তৈরি করা হচ্ছে বলেও জানান ড. শাকুর।

তিনি জানান, বর্তমান সময়ে প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট কারণে ভাগনা মাছের প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। প্রাকৃতিক উৎস থেকে অধিক পরিমাণে আহরণ, বাসস্থান ধ্বংস এবং ইকোলজিক্যাল পরিবর্তনের কারণে এই মাছটি এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে। ভবিষতে অধিক সংখ্যক পোনা উৎপাদন করে দেশের উন্মুক্ত জলাশয় বিশেষ করে হাওড় অঞ্চলে ছাড়ার পরিকল্পনা আছে। এছাড়া এই চলমান গবেষণা সম্পন্ন হলে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন মৎস্য হ্যাচারিতে এ মাছ পৌঁছে দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানিয়েছেন গবেষকরা।

ছোট কার্প জাতীয় মাছগুলোর মধ্যে ভাগনা একটি অন্যতম জনপ্রিয় মাছ। এটি বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডে ব্যাপকভাবে বিস্তৃত। বাংলাদেশের আত্রাই, যমুনা, কংস, ও ব্রহ্মপুত্র নদীতে এই মাছটি পাওয়া যায়। এটি উচ্চ পুষ্টিগুণ সম্পন্ন মাছ এবং এতে প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট ও ফ্যাট রয়েছে। খেতেও অনেক সুস্বাদু। অতীতকাল থেকেই ভাগনা মাছটি বাংলার মানুষের কাছে একটি স্বাদের মাছ হিসেবেই পরিচিত।