বৃহস্পতিবার   ২৪ অক্টোবর ২০১৯ ||  কার্তিক ৮ ১৪২৬ ||  ২৪ সফর ১৪৪১

বর্ণাঢ্য আয়োজনে দেশব্যাপী উদযাপিত হলো বিশ্ব ডিম দিবস

প্রকাশিত: ২৩:৪৭, ১৩ অক্টোবর ২০১৮

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিল-বিপিআইসিসি শোভাযাত্রা ছবি: কৃষি প্রতিদিন

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিল-বিপিআইসিসি শোভাযাত্রা ছবি: কৃষি প্রতিদিন

শোভাযাত্রা, আলোচনা সভা, বিনামূল্যে ডিম বিতরণের মধ্য দিয়ে দেশব্যাপী পালিত হলো বিশ্ব ডিম দিবস। বিশ্ব ডিম দিবসের এবারের স্লোগান ছিলো সুস্থ সবল জাতি চাই সব বয়সেই ডিম খাই।

দিবসটি উদযাপনে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিল-বিপিআইসিসি যৌথভাবে আয়োজন করে শোভাযাত্রা, ডিম বিতরণ ও আলোচনাসভার। শুক্রবার (১২ অক্টোবর) সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে থেকে বের করা হয় বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা  যা পল্টন মোড় ঘুরে সিরডাপ মিলনায়তনে এসে শেষ হয়। 

রাজধানীর পাশাপাশি বিশ্ব ডিম দিবস উপলক্ষ্যে সবক’টি বিভাগীয় শহরেও ছিলো পোল্ট্রি শোভাযাত্রা এবং আলোচনা সভার আয়োজন। এছাড়া বেশকিছু জেলা শহর এবং উপজেলা সদরে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ও পেশাজীবী সংগঠনের সহযোগিতায় ডিম দিবস উদযাপন করা হয়। 

ঢাকায় সারাদিন ঘুরে ঘুরে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে, কারওয়ান বাজার, মিরপুর এবং ধানমন্ডিস্থ রবীন্দ্র সরোবর এলাকায় শ্রমজীবি ও সাধারণ মানুষের মাঝে বিনামূল্যে ৩০ হাজার সিদ্ধ ডিম বিতরণ করা হয়। সেই সাথে এস.ও.এস শিশু পল্লী, স্যার সলিমুল্লাহ এতিমখানা, ঢাকা অরফানেজ সোসাইটি’র শিশুদের জন্য এবং প্রবীণ হিতৈষী সংঘের সদস্যদের জন্য বিনামূল্যে ১৫ হাজার ডিম দেয়া হয়েছে বলেও জানান আয়োজকরা। 

সিরডাপে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিল আয়োজিত আলোচনা সভা। ছবি: কৃষি প্রতিদিন

বিকালে রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এক গোলটেবিল বৈঠকে পোল্ট্রির নানাবিধ উপকারিতার কথা তুলে ধরা হয়। আলোচনা সভার প্রধান অতিথি প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. হীরেশ রঞ্জন ভৌমিক বলেন- ডিম খাওয়ার কোন বয়স নেই। শিশু থেকে বৃদ্ধ সকলেই ডিম খেতে পারেন। প্রান্তিক খামারিদের জন্য সিঙ্গেল ডিজিটে ক্ষুদ্র ঋণ এবং কৃষি রেটে বিদ্যুৎ সরবরাহের কথা ভাবছে সরকার। ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ ডিমে স্বয়ং সম্পুর্ণ হবে বলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন ডা. হীরেশ। ইন্টারন্যাশনাল এগ কমিশনের আদলে বাংলাদেশেও একটি এগ কমিশন গঠনের প্রস্তাব দেন তিনি। নকল ডিম উৎপাদন বিষয়ে বলেন, নকল ডিম বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন সম্ভব নয়। 

বিপিআইসিসি’র সভাপতি মসিউর রহমান বলেন, চাল, চিনি, দুধ, আটা এমনকি লবনের বিজ্ঞাপনও গণমাধ্যমে প্রচারিত হয় কিন্তু সাধারণত ডিমের কোন বিজ্ঞাপন দেখা যায়না আমাদের দেশে। ডিম বিক্রি থেকে যে লাভ পাওয়া যায় তা দিয়ে বিজ্ঞাপন প্রচারের খরচ বহন করা সম্ভব হয়না। তাই একাজে তথ্য মন্ত্রণালয়কে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, বিগত প্রায় এক বছর ডিমের দাম না পেয়ে অনেকেই খামার বন্ধ করে দিয়েছেন। এদিকে এইচ৯এন১ ভাইরাসের সংক্রমণে ডিমের উৎপাদন কমে গেছে। সার্বিক বিচারে ডিমের উৎপাদন প্রায় ৩০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। তবে উদ্যোক্তারা উৎপাদন বাড়াতে ইতোমধ্যেই উদ্যোগ নিয়েছেন বলেও জানান বিপিআইসিসি সভাপতি।

ওয়ার্ল্ড’স পোল্ট্রি সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন-বাংলাদেশ শাখার সভাপতি শামসুল আরেফিন খালেদ বলেন, ডিমের চাহিদা আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। হাউসহোল্ড ইনকাম এন্ড এক্সপেন্ডিচার সার্ভের রিপোর্ট অনুযায়ী ২০১০-২০১৬ মেয়াদে ডিমের মাথাপিছু কনজাম্পশন ৭.২ গ্রাম থেকে বেড়ে হয়েছে ১৩.৫৮ গ্রাম। এই মেয়াদে গরুর গোশতের কনজাম্পশন ১০ শতাংশ ও মাছের কনজাম্পশন ২৬ শতাংশ বেড়েছে কিন্তু ডিমের কনজাম্পশন বেড়েছে ৮৮ শতাংশ।

তিনি বলেন- বিপিআইসিসি’র হিসাব মতে দেশে বর্তমানে ডিমের বাণিজ্যিক উৎপাদন দৈনিক প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী বাণিজ্যিক উৎপাদন এবং গৃহপালিত মুরগি, হাঁস ও কোয়েল পাখির ডিম হিসাব করলে দৈনিক গড় উৎপাদন ৪ কোটি ৭১ লাখের ওপরে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ডিম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১,৬৬৫ কোটি পিস। এর মধ্যে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর -এই তিন মাসে ডিমের মোট উৎপাদন হয়েছে ৪৩৩.৫৩ কোটি পিস। প্রতিটি ডিমের গড় মূল্য ৭ টাকা ধরা হলে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে প্রায়  ৮,৩৩৮.৬৮ কোটি টাকা এবং ২০১৬-১৭ অর্থবছরে প্রায় ১০,৪৫২.১২ কোটি টাকার ডিম কেন্দ্রিক বাণিজ্য হয়েছে। চলতি অর্থবছরে প্রায় ১১,৬৫৫ কোটি টাকারও অধিক ডিম কেন্দ্রিক বাণিজ্য হবে বলে আশাকরা যায়। খালেদ বলেন- বিশ্বব্যাপী ডিম দিবসে এবারের থিম হচ্ছে “protein for life” আর বাংলাদেশে আমাদের স্লোগান হচ্ছে “সুস্থ-সবল জাতি চাই, সব বয়সেই ডিম খাই”।

আলোচনা সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপক বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পোল্ট্রি সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শওকত আলী এবং বারডেম হাসপাতালের প্রধান পুষ্টিবিদ শামসুন নাহার নাহিদ বলেন, ডিম নিয়ে আমাদের সমাজে অনেক ভুল ধারনা প্রচলিত আছে কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান বলছে ডিম হার্টের জন্য উপকারি, ডিম খেয়ে ওজন কমানো যায়, ব্রেন ডেভেলপমেন্ট এবং হাড় মজবুত করতে ডিম অত্যন্ত কার্যকর। ডায়াবেটিসের রোগিরাও ডিম খেতে পারবেন। অনেকে ডিমের কুসুম না খেয়ে সাদা অংশ খান এতে তাঁরা ডিমের পরিপূর্ণ পুষ্টি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

এছাড়াও গতকাল রাজধানীর পল্টন টাওয়ারে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) হল রুমে দিবসটি উপলক্ষে বাংলাদেশ এনিমেল এগ্রিকালচার সোসাইটিসহ এ খাতের কয়েকটি সংগঠন সেমিনারের আয়োজন করে। এতে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ এনিম্যাল এগ্রিকালচার সোসাইটির (বিএএএস) সভাপতি এবং এক্সেল লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কৃষিবিদ মো. মোরশেদ আলম, রেনেটা এগ্রো ইন্ড্রাস্টিজ রিমিটেডের ব্যবস্থাপক খালিদ দীন আহমেদ, পুর্ণভা’র মার্কেটিং ম্যানেজার ড. লাবনি আহসান প্রমুখ। সেমিনারে বলা হয়, গত ১০ বছরে ডিমের উৎপাদন বেড়েছে তিনগুণের বেশি। বাংলাদেশে ডিম উৎপাদনে বেশি সফলতা দেখিয়েছে সম্প্রতি সময়ে। 

কৃষিবিদ মোরশেদ আলম বলেন, বছর ব্যবধানে ডিমের দাম বেড়েছে ঠিকই কিন্তু এতে খামারারী লাভের মুখ দেখতে পারছে না। কারণ এক বছর ধরে এখাতের কাঁচামালের দাম বেশি ছিল। যা এখনো বিদ্যমান। এর সঙ্গে ডিমের ভালো দাম পায়নি খামারিরা। ফলে অনেক খামারি উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে। তবে বর্তমানে কোরবানির মাংসের মজুদ কমায় এবং ইলিশ বিক্রি বন্ধ থাকায় আবার ডিমের চাহিদা বেড়েছে। আর এই চাপের কারণেই চাহিদার সঙ্গে সরবরাহের বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে। তাই এখন বাড়তি দাম দিয়ে ডিম কিনতে হচ্ছে ভোক্তাদের। তিনি বলেন, ডিমের ভালো দাম পেয়ে অনেকে খামারে নতুন করে মুরগি ওঠাচ্ছেন। ফলে ধীরে ধীরে দাম আবার স্বাভাবিক হবে।

এর আগে সকালে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ ও  বাংলাদেশ এনিম্যাল এগ্রিকালচার সোসাইটির (বিএএএস) বেলুন উড়িয়ে শোভাযাত্রার মাধ্যমে দিনটি উদযাপন করে খামাড়বাড়িতে। সেখানেও বিনামূল্যে বিতরণ করা হয় সিদ্ধ ডিম।