বৃহস্পতিবার   ২৪ অক্টোবর ২০১৯ ||  কার্তিক ৮ ১৪২৬ ||  ২৪ সফর ১৪৪১

প্রবাসে আলোকিত এক কৃষিবিদ ড. নার্গিস বানু

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১০:০২, ৮ অক্টোবর ২০১৮

ড. নার্গিস আখতার বানু

ড. নার্গিস আখতার বানু

ড. নার্গিস আখতার বানু। মহিয়সী, মমতাময়ী ও প্রত্যয়ী এক নারীর প্রতিচ্ছবি। কুমিল্লার মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে নার্গিস আখতার স্কুল-কলেজ জীবনের অধ্যায় পেরিয়ে পা রেখেছিলেন প্রকৃতি কন্যা বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় আঙিনায়। সেই থেকে তাঁর শুধু সামনে এগিয়ে যাওয়ার গল্প শুরু। দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও তাঁর সাফল্যের একেকটি পালক তৈরি করছে অন্যদের অনুপ্রেরণা।

বর্তমানে সিডনীতে বসবাসরত ড. নার্গিস বানু অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমান ১৯৯৪ সালে। সুদর প্রবাসে গিয়ে আবার শুরু করেন নিজেকে গড়ে তোলার নতুন যুদ্ধ। অস্ট্রেলিয়াতে গিয়ে কাজের পাশাপাশি নার্গিস বানু নিউ সাউথ ওয়েলস ইউনিভার্সিটি থেকে এনভায়রনমেন্টাল স্টাডিজে মাস্টার্স ডিগ্রী এবং পরবর্তীতে অস্ট্রেলিয়ান সরকারের বৃত্তি (APA) নিয়ে সিডনী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এনভায়রনমেন্টাল সয়েল কেমেস্ট্রিতে পিএইচডি ডিগ্রী লাভ করেন এ কৃষিবিদ।

অস্ট্রেলিয়ায় ১৯৯৫ সালে এনভায়রনমেন্টাল রিভিউ অফিসার হিসেবে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয় নিউ সাউথ ওয়েলসের ভূমি ও পানি সংরক্ষণ অধিদপ্তরে। পরে এনভায়রনমেন্টাল প্রটেকশন অথরিটি, রোডস এবং ট্রাফিক অথরিটি, এনার্জি অষ্ট্রেলিয়া, অষ্ট্রেলিয়ান রেল ট্রেক কর্পোরেশনেও এ পরিবেশবিদ দক্ষতার সাথে কাজ করেছেন। বর্তমানে আলোকিত এ নারী এক যুগেরও বেশি সময় ধরে সিডনী ওয়াটার কর্পোরেশনে কর্মরত আছেন। 

এগার ভাইবোনের মধ্যে ষষ্ঠ ড. নার্গিস বানু কুমিল্লা জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা ছিলেন হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক। কুমিল্লা জেলায় শিক্ষকতা করার কারনে পড়াশোনা শুরুটা কুমিল্লা জেলায়ই। ড. নার্গিস বানু বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃষিতে স্নাতক এবং মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই নেতৃত্বের বহিপ্রকাশ। ১৯৯২-১৯৯৩ সালে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদে সদস্য নির্বাচিত হন এবং খেলাধুলায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে প্রতিনিধিত্ব করেন এই সংগ্রামী নারী।

বাবার শিক্ষকতা পেশার অনুভুতিটা মগজে ঢুকে গিয়েছিলো সেই ছোট বেলাতেই। তাই দেশে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়েছিলো বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচারার হিসেবে। অস্ট্রেলিয়াতেও ক্যাজুয়াল একাডেমিক হিসেবে সিডনী বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছু সময় শিক্ষকতা করেছেন ড. বানু। নিজ পেশার কাজের পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার পরপরই ১৯৯৫ সাল থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত কমিউনিটি লেংগুইজ স্কুলে এই প্রজন্মের ছেলে-মেয়েদেরকে বাংলা শিখিয়েছেন নার্গিস বানু। 

সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে যেখানে জীবন চলে সেখানেও নিজের ভাগ্য পরিবর্তনে শুধু কাজের মধ্যে ডুবে থাকেননি এ গুণী কৃষিবিদ। দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য নিজেকে নিবেদিত করার প্রত্যয় তাঁকে পরিচিতি দিয়েছে অস্ট্রেলিয়ার স্থানীয় বাংলাদেশী কমিউনিটিতে। বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অব অস্ট্রেলিয়ার নির্বাচন পরিচালনা এবং পরবর্তীতে এসোসিয়েশনের পরিচালনা এবং এসোসিয়েশন কমিটির সাথে যুক্ত ছিলেন ড. নার্গিস বানু।

নিজের অধ্যাবসায় আর মেধা দিয়ে প্রতিটি জায়গাতেই কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন, আপন করে নিয়েছেন প্রিয় মাতৃভূমির প্রবাসী মানুষগুলোকে। প্রতিটি মুহুর্তেই নিজেকে নিজে ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতা তাঁকে আলাদা করেছে অন্য সবার থেকে। ২০০৪ সাল থেকে রেডিও 99.9 এফএম থেকে “দ্য ভয়েস অব বাংলাদেশ” নামে একটি কমিউনিটি রেডিও পরিচালনা করছেন ড. নার্গিস বানু এবং রেডিও স্টেশন পরিচালনা কমিটির বোর্ড সদস্য। সমসাময়িক বিষয়ের পাশাপাশি মানবাধিকার, বহুসংস্কৃতিবাদ এবং নাগরিক সেটলমেন্টসহ বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক বিষয়গুলির সচেতনতা বাড়াতে শুরু করেন বিভিন্ন অনুষ্ঠান। আর এসব অনুষ্ঠানে তাঁর দক্ষ উপস্থাপনা নজর কাড়ে সবার।  

ড. নার্গিস বানু বর্তমানে নিউ সাউথ ওয়েলসের জাস্টিস অব দ্য পিস হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ২০০৮-২০০৯ সালে মানবাধিকার সংস্থার “ফোকাস্ বাংলাদেশ”এর সভাপতি দায়িত্ব পালন করেন এবং ২০০৯ সালে ‘কমিউনিটি 2770’ এর আবাসিক প্রতিনিধি নিযুক্ত হন। সামাজিক কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ২০০৯ সালে ব্ল্যাকটন কাউন্সিলের ‘বর্ষসেরা আন্তর্জাতিক নারী পুরস্কার’ লাভ করেন এ বাংলাদেশী। ২০১৩ সালে ওয়েস্টার্ন সিডনী ইউনিভার্সিটি ড. নার্গিস বানু  উইমেন অব দ্য ওয়স্টে এ্যাওয়ার্ডে মনোনয়ন পান, পরের বছর মেরী মেক্লওয়েড এ্যাওয়ার্ডের জন্যও মনোনীত হন ড. নার্গিস। স্বীকৃতির পালকে  ২০১৫ সালে যুক্ত হয় আরটিভি অস্ট্রেলিয়া প্রদত্ত “আলোকিত নারী” পদক।

কমিউনিটি সাংবাদিক হিসেবেও ড. নার্গিস বানুর রয়েছে বিশেষ খ্যাতি যা তিনি কৃতিত্বের সাথে করে যাচ্ছেন। তাছাড়া সময় পেলে ড. বানু লেখালেখি করেন ড. নার্গিস। তাঁর লেখা কলাম বাংলাদেশের যায় যায় দিন, নিউ এজ, নয়া দিগন্ত এবং অনেক স্থানীয় পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।

কঠোর অধ্যবসায়, দৃঢ় প্রত্যয়ী, মেধা, একাগ্রতা ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে জীবনকে আলোকিত করা ড. নার্গিস বানু পারিবারিক জীবনে এক মেয়ের গর্বিত মা। দূর প্রবাসে সাফল্যের প্রতীক ও প্রবাসী বাংলাদেশীদের অনুপ্রেরণার বাতিঘর হয়ে উঠা ড. নার্গিস বানু শেকড়ের টানে প্রায়ই ছুটে আসেন মাতৃভূমিতে।

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কিংবা বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম থেকে শুরু করে যুগ যুগ ধরে কবি, সাহিত্যিক ও ঔপন্যাসিকরা নারীকে যে বহ্নিশিখা রূপে জাগাতে চেয়েছেন, নারীর যে জয়গান গেয়েছেন, সূদূর অস্ট্রেলিয়ার প্রবাস জীবনে যেন সবার কাছে তাঁরই এক প্রতীক হয়ে উঠেছেন প্রকৃতি কন্যার বুক থেকে জন্ম নেয়া এই নারী কৃষিবিদ।