সোমবার   ০১ জুন ২০২০ ||  জ্যৈষ্ঠ ১৭ ১৪২৭ ||  ০৯ শাওয়াল ১৪৪১

পরিবেশবান্ধব পুষ্টি নিরাপত্তায় আল্টিমেট পছন্দ মৎস্য খাত

কৃষিবিদ মশিউর রহমান

প্রকাশিত: ০১:৩১, ৯ মে ২০২০

আপনার খাবার প্লেটে যা কিছু দেখছেন তার একটি বিরাট প্রভাব আছে পরিবেশের ওপর। আর একটু বিস্তারিত বললে বিষয়টি পরিস্কার হবে। আর তা হলো, যে কোন খাদ্য উৎপাদনের আল্টিমেট প্রভাব গিয়ে পড়ে আমাদের পরিবেশের ওপর। ধারণা করা হচ্ছে আগামী ২০৫০ সাল নাগাদ পৃথিবীর মোট জনসংখ্যা হবে ১০ বিলিয়ন। সে সময় টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে পৃথিবীর মোট খাদ্য উৎপাদন বর্তমানের চেয়ে ৫৬ শতাংশ বাড়াতে হবে। আর এই বাড়তি খাদ্য উৎপাদনের চাপ শেষতক গিয়ে পড়বে মাটি, পানি ও জলবায়ুর ওপর।

অথচ আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসে সামান্য পরিবর্তন আনার মাধ্যমে আমরা পরিবেশের ওপর এই বিরুপ প্রভাবকে কিছুটা হলেও কমাতে পারি যা টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনে রাখতে পারে গুরুত্বপূর্ণ অবদান। সেটি অর্জন করতে হলে, বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রোটিন স্কোর কার্ডের লাল জোন থেকে কমলা জোনে এবং অথবা ধীরে ধীরে কমলা জোন থেকে সবুজ জোনের দিকে আমাদেরকে এগুতে হবে।

প্রোটিন স্কোর কার্ড হলো একটি তুলনামূলক ধারণাপত্র যেখানে আমাদের দৈনন্দিন গৃহীত প্রোটিনগুলোর উৎপাদন পর্যায়ে পরিবেশের ওপর বিরুপ প্রভাব ও ইউনিট প্রতি মূ্ল্য হিসেবে তাদেরকে লাল, কমলা ও সবুজ জোনে ভাগ করা হয়েছে। লাল জোনে থাকা প্রোটিন উৎস্যগুলো পরিবেশের ওপর সবচেয়ে বেশী প্রভাব ফেলে ও সেগুলোর উচ্চ বাজার মূল্য, এর পরে আছে কমলা জোনে থাকা প্রোটিন উৎস্য যেগুলো পরিবেশের ওপর মাঝারি বিরুপ প্রভাব ফেলে ও বাজার মূল মাঝারি। 

 

নির্ভরযোগ্য জরিপ বলছে, বাংলাদেশ বিগত কয়েক বছর আগেই সার্বিক কৃষি (ফসল, মাছ, প্রাণিসম্পদ) উৎপাদনে একটি উচ্চতর অবস্থানে চলে গেছে এবং খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ দেশ হিসেবে তার নতুন যাত্রা শুরু করেছে। এটি আমাদের একটি বিরাট অর্জন। কিসিঞ্জারের ভাষায়, একটি তলাবিহীন ঝুড়ি থেকে বাংলাদেশ  এই সম্মানজনক অবস্থানে পৌঁছে গেছে দুই দশক আগেই যা বর্তমানে আরো শক্ত ভিত্তির ওপর দাড়িয়েছে বলেই বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। এর পেছনে রয়েছে কৃষি বান্ধব বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের নানামুখী পদক্ষেপের পাশাপাশি কৃষিবিদদের উদ্যোগ আর আমাদের প্রকৃত বীর তথা কৃষক, চাষি ও খামারীদের অক্লান্ত পরিশ্রম। উল্লেখ্য, গত শতকের শেষ পর্যায়ে বাংলাদেশ যখন খাদ্যে প্রথমবারের মতো স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছিল তখনো আওয়ামী লীগ সরকারই ক্ষমতায় ছিল। 

আর প্রতিটি মানুষের জন্য খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও দেশের অর্থনৈতিক মুক্তি লাভের উচ্চাকাঙ্খাই ছিল আমাদের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের মূল লক্ষ্য। আর সেই স্বপ্ন যিনি দেখিয়েছিলেন এবং যার নেতৃত্বে বাংলাদেশ একটি সশস্ত্র মুক্তি সংগ্রামের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছিল তিনি হলেন হাজার বছরের শ্রেষ্ট বাঙালী, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তারই রক্তের সুযোগ্য উত্তরাধিকারী, সফল রাষ্ট্র নায়ক, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, শেখ হাসিনা’র নেতৃত্বেই বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। এটা বিরাট গৌরবের। স্বাধীনতা লাভের মাত্র তিন দশকের মাথায় খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়া প্রমাণ করে যে, জাতির পিতা যে স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন তাতে কোন ভুল ছিল না। আর তার স্বপ্নের সোনার বাংল তথা ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্রমুক্ত, উন্নত ও সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ বিনির্মাণে এক নিরবিচ্ছিন্ন ফুয়েল যুগিয়ে চলেছে বাংলার কৃষি খাত।   

আর এই খাদ্য নিরাপত্তা অর্জন তথা কৃষি উৎপাদনে বিল্পব সাধনই আমাদেরকে উন্নত বাংলাদেশ হিসেবে রুপান্তরের পথে প্রথম উৎসাহ – এতে কোন সন্দেহ থাকা উচিত নয়। খাদ্য ও পুষ্টির যোগানের সাথে সাথে আমাদের গড় আয়ু বেড়েছে। মানুষের মেধাশক্তি ও কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এর একটি বিরাট ধনাত্মক প্রভাব পড়েছে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে যা প্রকারান্তরে উন্নয়নের সব ক্ষেত্রেই নিরবিচ্ছিন্ন জ্বালনীর যোগান দিয়ে চলেছে। কেননা, একটি সুস্থ, সবল ও মেধাবী জাতিই পারে ব্যাপক ভিত্তিক অর্থনৈতিক কর্মকান্ড গ্রহণের মাধ্যমে নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের যুদ্ধে সামিল হতে।

 

তাছাড়া সর্বিক কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির সাথে সাথে দেশের খাদ্য আমদানী ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। ফলে সরকারের পক্ষে নানামুখী উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন অনেকখানি সহজ হয়ে গেছে। সেদিক দিয়ে বিবেচনা করলেও উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখার উৎসাহ যুগিয়েছে এদেশের কৃষি খাতের উন্নয়ন। আবার সাম্প্রতিক সময়ে করোনা ভাইরাস মহামারির কারণে পুরো বিশ্ব যখন দিশেহারা। তখন বাংলাদেশকে সেই সংকট কাটিয়ে ওঠতে আশা যাগাচ্ছে দেশের কৃষি খাত। আজ কৃষির সবগুলো উপখাত তথা দানাদার শস্য, সব্জি, মাছ, মাংস, দুধ ও ডিম উৎপাদন বেড়েছে বহুগুণ। এগুলো উৎপাদনের পরিসংখ্যান এখানে তুলে ধরে লেখার কলেবর বৃদ্ধি করার দরকার নাই। বরং এই লেখার মূল উদ্দেশ্য নিয়ে কথা বলা যাক।   

কিন্তু টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনের সাথে আরো অনেকগুলো বিষয় জড়িত। বিশেষ করে চাষযোগ্য জমির স্বল্পতা যেখানে প্রকট সেখানে আবার দ্রুত নগরায়ন ও জমির শ্রেণী পরিবর্তনের কারণে কৃষি জমি আরো কমে যাচ্ছে। ফলে তা প্রকারান্তরে খাদ্য নিরাপত্তা আরো হুমকির মুখে পড়ছে। তাছাড়া আগামী দিনের কৃষি উৎপাদন আরো অনেকগুলো চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে যাচ্ছে। বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুপ প্রভাব হিসেবে ঘন ঘন প্রাকৃতিক দূর্যোগে ফসলহানি, লবণাক্ততা, স্বাদু পানির স্বল্পতা ইত্যাদির। অন্যদিকে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে বাড়বে খাদ্য চাহিদা। এই দুইয়ের মধ্যে সমন্বয় সাধন করে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি করা সত্যিই এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। 

বলাই বাহুল্য, উন্নত বাংলাদেশে রুপান্তিরিত হওয়ার স্বার্থেই দেশের মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা একটি টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো জরুরি। আর তা করতে হলে কৃষি খাতের উৎপাদন বৃদ্ধির প্রচেষ্টা গ্রহণের পাশাপাশি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি এবং খাদ্যাভ্যাসেও আনতে হবে কিছুটা পরিবর্তন। আমাদেরকে ভাবতে হবে যে, আমরা প্রতিদিন খাবারের প্লেটে যে খাবার পাচ্ছি তা উৎপাদনের সাথে জড়িত প্রতিটি সম্পদের ওপেই একটি বিরুপ প্রভাব ফেলছে। আর কোন প্রাকৃতিক সম্পদই অফুরন্ত নয়, তার একটি সর্বোচ্চ সহনশীল মাত্রা আছে।

কাজেই অবিবেচকের মতো আমরা কেবল কৃষি খাতের উৎপাদন বাড়াতে থাকলে তা পরিবেশের ওপর যে বিরুপ প্রভাব ফেলবে তা পর্যায়বৃত্তাকারে উৎপাদন পরিকল্পনায় বিরাট অন্তরায় হিসেবে আবির্ভুত হতে পারে। সুতরাং এই চক্রাকার সমস্যা কাটিয়ে ওঠে টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা অর্জন করতে হলে আমাদেরকে অবশ্যই বিকল্প চিন্তা করতে হবে – এ ভিন্ন আমাদের সামনে আর কোন চয়েজ নাই। কি হতে যাচ্ছে সেই বিকল্প চিন্তা? 

সেই বিকল্প চিন্তা থেকেই এসেছে প্রোটিন স্কোর কার্ডের ধারণা। আমাদের দৈনন্দিন খাদ্য তালিকায় থাকা প্রোটিন উৎস্যগুলোর মধ্যে কোনটি কি পরিমাণে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর গ্রীণ  হাউজ গ্যাস নির্গমন করে তার ভিত্তিতে মূলত এই প্রোটিন স্কোর কার্ড করা হয়েছে। সেখানে প্রোটিনের ইউনিট প্রতি মূল্যকেও বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। এই দুই নির্দেশকের ভিত্তিতে বিভিন্ন প্রোটিনকে পরিবেশের জন্য উচ্চ, মধ্যম ও কম ক্ষতিকর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে যেগুলোকে আবার যথাক্রমে লাল, কমলা ও সবুজ রঙ দ্বারা প্রকাশ করা হয়েছে। উক্ত প্রোটিন স্কোর কার্ড থেকে দেখা যায় যে,  লাল ও কমলা জোনে থাকা প্রোটিনগুলো মূলত প্রাণিজ উৎস্য থেকে আসে, যেমন গরু, ছাগল, ভেড়া, পোল্ট্রি ও ডেইরি প্রোডাক্ট যেগুলো পরিবেশের ওপর তুলনামূলকভাবে বেশী বিরুপ প্রভাব ফেলে। এগুলোর ইউনিট প্রতি মূল্যও তুলনামূলকভাবে বেশী। অন্যদিকে সবুজ জোনে থাকা প্রোটিনগুলো মূলত উদ্ভিজ্জ উৎসের প্রোটিন যেগুলো পরিবেশের ওপর বিরুপ প্রভাব কম ফেলে এবং সেগুলোর বাজার মূল্যও তুলনামূলকভাবে কম।

তথ্য বলছে, উদ্ভিজ প্রোটিনের সমপরিমাণ (equivalent)  গরুর মাংস (beef) উৎপাদন করতে ২০ গুণ বেশি জমির প্রয়োজন হয় এবং যা থেকে ২০গুণ বেশী গ্রীণ হাউজ গ্যাস নির্গত হয়। এক্ষেত্রে কেবল ব্যতিক্রম হলো মাছ। মাছ একটি প্রাণীজ প্রোটিন হলেও পরিবেশের ওপর বিরুপ প্রভাব কম হওয়ায় তা প্রোটিন স্কোর কার্ডে সবুজ জোনে স্থান করে নিয়েছে।

কাজেই, আমাদেরকে খাদ্যাভ্যাসে ক্রমান্বয়ে পরিবর্তন আনতে হবে। তবে তার আগে প্রোটিন স্কোর কার্ডে নিজেদের অবস্থান নির্ণয় করতে হবে। এরপর সেখান থেকে নিজেদের অবস্থান ক্রমান্বয়ে পরিবর্তন করে সবুজ জোনের দিকে যেতে হবে। উদাহরণস্বরুপ, যার খাদ্যাভ্যাস লাল জোনে, তিনি ক্রমান্বয়ে কমলা জোনে যাবার চেষ্টা করবেন। তারপর সেখান থেকে তিনি সবুজ জোনে যাবার চেষ্টা করবেন। আর যিনি আগে থেকেই কমলা জোনে অবস্থান করছেন তিনি চেষ্টা করবেন সেখান থেকে সবুজ জোনে প্রবেশ করতে।

কিন্তু বিষয়টা এত সহজ নয়। কেননা, বাঙালীর পরিচয় ভোজন রসিক হিসেবে। বাঙালীর খ্যাতি রসনা বিলাসে। হাজার বছর ধরে চলে আসা এই অভ্যাস হঠাৎ পরিবর্তন করা সম্ভব নয় জানি। তবুও আমাদেরকে সেদিকেই নজর দিতে হবে। তার জন্য নিজেদের মানসিকতায় যেমন পরিবর্তন আনতে হবে। তেমনি উৎপাদন ব্যবস্থায়ও আনতে হবে বিরাট পরিবর্তন। আর সেখানে দেশের বিপুল সম্ভবনাময় মৎস্য খাত হতে পারে একটি অন্যতম সমাধান। কেননা, সবুজ জোনে থাকা প্রোটিনগুলোর মধ্যে মাছ ব্যতীত প্রায় সবগুলোই উদ্ভিজ উৎসের প্রোটিন। আর প্রোটিনের গুণগত মান, স্বাদ ও অন্যান্য পুষ্টিগুণের বিবেচনায় উদ্ভিজ প্রোটিনের চেয়ে মাছ অনেক উত্তম। সেক্ষেত্রে খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের এই ধারায় মানুষের প্রথম পছন্দ হতে পারে মাছ। সেটা অর্জন করতে হলে আমাদের উৎপাদন পরিকল্পনায় আনতে হবে আমূল পরিবর্তন। সবুজ জোনের ওপর ভোক্তার ক্রমবর্ধমান চাপ মেটাতে নিতে হবে দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা। সেখানে অগ্রাধিকার তালিকার শীর্ষে থাকার দাবি রাখে দেশের মৎস্য খাত। 

তথসূত্র: 
(১)  GlobAgri-WRR model developed by CIRAD, Princeton University, INRA, and WRI (GHG data); USDA and BLS (2016) (US retail price data). 
 

লেখক: বিসিএস (মৎস্য), সহকারী পরিচালক, মৎস্য অধিদপ্তর, ঢাকা।