বৃহস্পতিবার   ২৬ মে ২০২২ ||  জ্যৈষ্ঠ ১২ ১৪২৯ ||  ২৪ শাওয়াল ১৪৪৩

ACI Agri Business

পদ্মা পাড়ে প্রান্তজনের অর্থনীতি

ড. এম এ সাত্তার মণ্ডল

প্রকাশিত: ১৭:২৯, ১০ এপ্রিল ২০২২

দীঘির শোভা ফটিক জলে
নদীর যৌবন ঘোলা জলে।

এক মাস আগের শীর্ণা পদ্মা এখন ভরা যৌবনা। জোয়ারের পানিতে ফুলে উঠছে। ঘোলা পানিতে ঢেউ এর খেলা। শাহ পরান ঢাউস ফেরিটি পাটুরিয়া থেকে আধা ঘন্টায় সরাসরি দৌলদিয়া ঘাটে এসে লাগলো। একে তো রোজার সময়, তারপর সাত সকাল। ভ্রাম্যমান ফেরিওয়ালাদের দেখা পেলাম না। 

ফেরি থেকে দেখছিলাম ঘাটের পাশে গাদাগাদি খড়ের পালা। কৌতুহল বশে গাড়ি থেকে নেমে হাঁটা দিলাম ওদিকে। বিশাল কর্মযজ্ঞ চলছে নদীর পাড়ে ছেলেমেয়ে মহিলাদের। চর থেকে বোরো ধান কেটে নৌকায় করে ঘাটে এনে ফেলেছে। আটি খুলে লাল কালো দেশী জাতের ধান বিছিয়ে দেয়া হচ্ছে অস্থায়ী চাতালে। তারপর পাওয়ার টিলার ঘুরে ঘুরে ছড়ানো ধানের আলগা আটিগুলো  মাড়াই করে দিচ্ছে। যাকে বলে মলন দেয়া। এ পর্যন্ত পুরুষদের কাজ। এরপর থেকে মেয়েদের পালা শুরু। তারা মাড়ানো খড়গুলোকে সরিয়ে নিচে জমা  ধানগুলোকে আলাদা করে জমা করছে।  এরপর পুরুষরা যার যার প্রাপ্য জমির পরিমাণ অনুযায়ী হারাহারি ভাগ করে নিচ্ছে। মেয়েরা  যার যার মত ধান বাড়ি নিচ্ছে, কেউ ওখানেই শুকাচ্ছে। 

ধান শুকানো, কুলা দিয়ে  ঝাড়া মোছা এসবের জন্য পরিস্কার শক্ত মাটির দরকার। তাই মাটি সমান করে তার  ওপর  গোবরের প্রলেপ দিতে হয়। একাজটি মেয়েদের। কী মজার ডিভিশন অব লেবার।

চরের জমিতে বোরো ধান আবাদে তেমন কোন খরচ নাই। পৌষ মাঘ মাসে নদীর পানি নেমে যাবার সময় আধা হাটু পানিতে দেশী বোরো ধানের চারা লাগিয়ে দেয়াটাই বড় কাজ। ব্যাস, এরপর সেচ দেয়া লাগেনা, পলি পড়ে বলে সার দিতে হয়না, নিড়ানি লাগেনা বললেই চলে। চৈত্র মাসেই ধান কাটা যায়। কোন কোন বছর অবশ্য আগাম জোয়ার এসে গেলে নিচু জমির ধান পুরোপুরি পাকার আগেই ডুবেও যায়। রিস্ক তো থাকেই। বলতে গেলে, এই বোরো ধানটা মোটামুটি বিনা খরচে পাওয়া যায়। তবে ফলন কম। কিন্তু চালটা পুষ্টিকর ও সুস্বাদু। অনেকেই খিচুড়ি খাওয়ার জন্যে এ চালটা গৃহস্তের বাড়ি থেকে কিনে নেয়। 

দেশী বোরো ধানের সুবিধা হলো এর শিকড় খুব লম্বা এবং মাটির গভীর থেকে খাবার নিতে পারে। তাই বাড়তি  সেচ বা সার দিতে হয়না। ইরি ধান লাগালে ফলন বেশী হয়, কিন্তু সেচ সার কীটণাশক ইত্যাদিও বেশী দিতে হয়। তাদের ভাষায় অড়ে গড়ে সমান। কৃষক লাভ ক্ষতিটা ভালোই বুঝে। তাছাড়া, দেশী চালটা তারা নিজেদের খাওয়ার জন্য রাখে। বাজারে খুব আসেনা। 

এখানেও বর্গা সিস্টেম আছে। যারা নিজেরা আবাদ করেনা, তারা অন্যকে বর্গা দেয়। ফসলের একভাগ মালিক পায়, তিন ভাগ পায় বর্গাচাষী। জমির উচ্চতা ও মাটি ভেদে অবশ্য এই ভাগাভাগির হার কমবেশী হয়।

আরেক দিক হচ্ছে বোরো ধানের খড়ের অর্থনীতি। যাদের গরু বাছুর আছে তারা খড় বাড়ি নিয়ে যায়। যাদের বেশী খড় তারা নদীর পাড় থেকেই  বিক্রি করে দেয়। প্রতি মাথার বোঝা দুই শ আড়াইশ টাকা। ভ্যান প্রতি পাঁচ ছয়শত টাকা। প্রতি ঘোড়ার গাড়ি তিন সাড়ে তিন হাজার টাকা। একেকটা খড়ের গাদা বিক্রি হচ্ছে এক দেড় হাজার টাকা। 

পদ্মায় নতুন পানি আসায় কেউ কেউ নৌকা নিয়ে মাছ ধরতে যাচ্ছে। ইলিশ পাওয়া যায়না। তবে ছোট মাছ পাওয়া যায়। কিছু চিংড়িও ধরা পড়ে।  এদের প্রায় সবাই নদী ভাংগনের শিকার। জমি জমা যা ছিলো তা নদীগর্ভে। কিছু জাগছে, আবার ভাংছে। ভাংগা গড়া পদ্মার খেলা। সব জায়গায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। এক দল দেখলাম নদীর পাড় থেকে বেকু মেশিন দিয়ে ট্রাক ভর্তি বালু সংগ্রহ করে বিক্রি করছে।  এরা এলাকার প্রভাবশালী। অফিস আদালতে যোগাযোগ আছে। বর্ষায় আবার বালু আসবে ভেসে ভেসে। এটাও তো কম সম্পদ নয়।

চলে আসার সময় বাবুলের সংগে দেখা। সে দর্জির কাজ করে ঢাকায়। ধান কাটার মৌসুমে বাড়ি এসেছে বাড়তি শ্রমের যোগান দিতে। তার বাবা গেছে চরে ধান কাটতে। হাতে এন্ড্রয়েড স্মার্টফোন। ফেরার পথে কিছু দেশী বোরো চাল আমার জন্য যোগাড় করে রাখবে বলে আশ্বস্ত করলো। কবে ফিরছি এটা জানালেই সে ব্যবস্থা করে রাখবে। মিশ্রিদানা হাসির সাথে তার মোবাইল নম্বরটা দিয়ে  মায়ের সাথে চাতালের দিকে পা বাড়ালো। তার মায়ের হাতে গামছায় বাধা বাবার জন্য খাবার। কী চমৎকার সাপ্লাই চেইন।

লেখক: সাবেক উপাচার্য, প্রাক্তন এমিরেটাস অধ্যাপক, কৃষি অর্থনীতি ও গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞান অনুষদ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।

Advertisement
Advertisement