মঙ্গলবার   ১৯ জানুয়ারি ২০২১ ||  মাঘ ৫ ১৪২৭ ||  ০৫ জমাদিউস সানি ১৪৪২

ACI Agri Business

খাদ্য ঘাটতি নেই, উদ্বৃত্ত থাকবে ৩০ লাখ টন চাল

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২২:৩৬, ২২ ডিসেম্বর ২০২০

এ বছর দেশে অতিবৃষ্টিতে পাঁচ-ছয় দফা বন্যায় ৩৫টি জেলার আমন ধান ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সারা বছরের উৎপাদন ও চাহিদা বিবেচনা করলে দেশে খাদ্য ঘাটতির আপাতত কোন আশঙ্কা নেই বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট সেইসাথে আগামী জুন পর্যন্ত দেশের অভ্যন্তরীণ খাদ্য চাহিদা পূরণ করেও কমপক্ষে ৩০ লক্ষ টন চাল উদ্বৃত্ত থাকবে বলেও জানায় সংস্থাটি।  

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) গত একমাস ধরে দেশের ১৪টি কৃষি অঞ্চলে জরিপ করে তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণের মাধ্যমে সত্যতা পেয়েছে। সুতরাং সারা দেশে চালের উৎপাদন কম এবং খাদ্য ঘাটতি হওয়ার আশঙ্কার কথা যেভাবে ফলাও করে প্রচার করা হচ্ছে তা আদৌ ঠিক নয় বলে জানায় তারা।  
 
১৯৭২-২০২০ সালের বন্যার তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, প্রতি বছরই কম বেশি বন্যা হচ্ছে, কিন্তু গত ৪৮ বছরে মধ্যে ১৯৭৪, ১৯৮৭, ১৯৮৮, ১৯৯৮,২০০৪, ২০০৭, ২০১৫, ২০১৬, ২০১৭, ২০১৮, ২০১৯ এবং ২০২০ এই বছরগুলোতে বন্যায় প্লাবিত এলাকা ২২ শতাংশেরও বেশি ছিল। 

গবেষণার ফলাফল থেকে দেখা যায় যে, যখন কোন একটি বছর দেশের বন্যায় আক্রান্ত এলাকা ২২ শতাংশের উপরে যায় তখন ধানের উৎপাদন প্রতি বর্গ কিলোমিটারে ৭০ টন হারে কমে যায়। অপরদিকে যদি বন্যা আক্রান্ত এলাকা ২২% এর কম থাকে তবে পরবর্তী মওসুমে উৎপাদন প্রতি বর্গ কিলোমিটারে ৪৯০ টন হারে বৃদ্ধি পায়। 
এছাড়াও গবেষণায় দেখা গেছে, যে বছরগুলোতে বন্যা আক্রান্ত হয়েছিল তার পরবর্তী বছরে ধানের উৎপাদন বিভিন্ন হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এ বৃদ্ধির পেছনে বন্যা পরবর্তী বছরে সরকারের বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ এবং ধানের বাড়তি দাম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

ব্রির গবেষণায় দেখা গেছে, গত বছরের তুলনায় ১৪টি কৃষি অঞ্চলের মধ্যে এ বছর আমনের ফলন দিনাজপুরে ১১.১ শতাংশ, খুলনায় ৭.১ শতাংশ, চট্রগ্রামে ১.৩ শতাংশ, এবং যশোরে ৩.৫ শতাংশ ফলন বৃদ্ধি পেয়েছে। অপরদিকে বাকি ১০টি কৃষি অঞ্চলে আমন ধানের ফলন বিভিন্ন হারে কমেছে। 

গবেষণায় জানা যায়, এবছর প্রতিটি কৃষি অঞ্চলে আমন আবাদ এলাকা গত বছরের তুলনায় কম ছিল। স্যাটালাইট চিত্র বিশ্লেষণের মাধ্যমে দেখা গেছে, এ বছর বন্যার ক্ষয়ক্ষতি বাদে আমন ধানের অর্জিত এলাকা ছিল ৫৭.৮৫ লক্ষ হেক্টর। উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণের মাধ্যমে আরো দেখা গেছে যে, বিভিন্ন ধরনের বন্যাপ্রবণ এলাকায় আমন ধানের আবাদ হয়েছিল যথাক্রমে বন্যা অনাক্রান্ত এলাকার ২১.৫ লক্ষ হেক্টর, অল্প বন্যা আক্রান্ত এলাকার ১৬.০ লক্ষ হেক্টর, মধ্যম মানের বন্যা আক্রান্ত এলাকার ১৪.৩ লক্ষ হেক্টর এবং অতি বন্যা আক্রান্ত এলাকার ৬.০ লক্ষ হেক্টর। এ বছর ৫ থেকে ৬ ধাপে মোট ৩৫ জেলায় বন্যায় কবলিত হয়েছিল।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য মতে বন্যায় আমন আবাদের মোট ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে ১,০৫,০০০ হেক্টর। বন্যা আক্রান্তের মাত্রা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যে এলাকার বন্যা আক্রান্ত হয়নি সেখানে ধানের ফলন প্রায় ৪.৪ শতাশ বৃদ্ধি পেয়েছে। কম, মাঝারি ও অতি বন্যাপ্রবণ এলাকায় যথাক্রমে ধানের ফলন ০.৬, ১৩.৪ ও ২৪.১ শতাংশ কম হয়েছে। চালের হিসাবে এ বছর আমনের গড় ফলন হবে ২.৩০ টন/হেক্টর।

বিভিন্ন বন্যাপ্রবণ এলাকাভেদে হিসাব করলে দেখা যায়, যে এলাকায় বন্যা আক্রান্ত হয়নি সেখানে গড় ফলন হয়েছে ২.৬৯ টন/হেক্টর, কম বন্যা আক্রান্ত এলাকায় ২.৪২ টন/হেক্টর, মাঝারি বন্যা আক্রান্ত এলাকায় ২.১৮ টন/হেক্টর এবং প্রবল বন্যা আক্রান্ত এলাকায় ১.৯৪ টন/হেক্টর ফলন হয়েছে।

উপগ্রহ চিত্রের মাধ্যমে প্রাপ্ত আবাদকৃত এলাকা এবং উপরোক্ত ফলন বিবেচনায় নিয়ে আমন ধান উৎপাদন প্রাক্কলন করলে দেখা যায় যে, এ বছর চালের উৎপাদন গত বছরের তুলনায় প্রায় ১০.০৬ শতাংশ কম হয়েছে। বন্যার পাশাপাশি এবছর ধান উৎপাদনে বিভিন্ন ধরনের প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়েছিল যার মধ্যে কোভিড-১৯, আম্ফান, অতি বৃষ্টি এবং বিভিন্ন রোগবালাই উল্লেখযোগ্য। চালের হিসাবে এ বছর আউশ, আমন ও বোরো মিলিয়ে মোট চাল উৎপাদন হবে ৩৭.৪২ মিলিয়ন টন।

চাহিদা ও যোগানের অবস্থা বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, ডিসেম্বর ২০২০ হতে জুন ২০২১ পর্যন্ত আভ্যন্তরীণ চালের চাহিদা মিটিয়ে ব্রির হিসাবে কমপক্ষে ৩০ লক্ষ টন চাল উদ্ধৃত্ত থাকবে। এক্ষেত্রে মাথাপিছু দৈনিক ৪০৫ গ্রাম চাল ধরে সর্বমোট ১৬৭ মিলিয়ন জনসংখ্যার জন্য এই হিসাব করা হয়েছে। এছাড়াও মোট ধান উৎপাদনের শতকরা ২৬ ভাগ নন-হিউম্যান কনসাম্পশনের বাৎসরিক চাহিদা বিবেচনায় নেয়া হয়েছে।

ব্রির গবেষণার প্রাপ্ত ফলাফল অনুযায়ী আগামী বোরো আবাদ নির্বিঘ্ন করতে উল্লিখিত বন্যা আক্রান্ত এলাকাগুলোতে প্রয়োজনীয় বীজ, চারা ও সারসহ সকল উপকরণ যথাসময়ে সরবরাহ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে ব্রি-বিএডিডিসি-ডিএইকে সুষ্ঠুভাবে সমন্বয় করে কাজ করতে হবে।

চালের বাজার স্থিতিশীল রাখতে কৃষকদের জন্য ধান ও চালের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে। সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান কিনতে হবে। চাল আমদানির সিদ্ধান্ত যৌক্তিকতা বিবেচনা করে নিতে হবে। বছর বছর বন্যা থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে বন্যাপ্রবণ এলাকাগুলোর খাল ও নালা খনন ও পুনখনন কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। পারিপার্শ্বিক পরিবেশ বিবেচনায় নিয়ে যৌক্তিকভাবে ধানের আবাদ এলাকা নির্ধারণ করার পরামর্শ দিয়েছে ব্রি।  

গবেষণা অনুযায়ী, বোরো আবাদে বীজ, সার ও যান্ত্রিকীকরণে প্রণোদনা প্রদান অব্যাহত রাখতে হবে। সারা বছর ধানের আবাদ এলাকায় সেচ ব্যবস্থা নির্বিঘ্ন রাখতে হবে। এক্ষেত্রে সেচ প্রকল্পগুলো সঠিক সময়ে চালু করা এবং মওসুমব্যাপী কার্যকরের ব্যবস্থা করতে হবে। 

ধানের কর্তন ও কর্তনোত্তর সহায়তা অব্যাহত রেখে কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি আমন ধান ক্রয় বাড়াতে হবে। ধান ও চাল সংগ্রহ কার্যক্রমকে আরো গতিশীল ও কৃষকবান্ধব করতে হবে। দেশে আভ্যন্তরিণ চালের চাহিদা, যোগান ও মজুদ পরিস্থিতির সামগ্রিক তথ্য সকলের জন্য উন্মুক্ত এবং সহজপ্রাপ্য করতে হবে। এছাড়াও ধান কর্তনের পরবর্তী দু’মাস কোন ধরনের চাল আমদানির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যাবে না, এক্ষেত্রে বাজার পঞ্জিকা অনুসরণ করা প্রয়োজন বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি)। 

গবেষণায় বাংলাদেশের ১৪টি কৃষি অঞ্চল হতে সর্বমোট ১৮০০ জন কৃষকের নিকট হতে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। পাশাপাশি ৫৬ জন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ও ১১২ জন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার নিকট হতে ধানের আবাদ ও বন্যায় ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহ করা হয়। উক্ত গবেষণা কাজে সরাসরি এবং টেলিফোন সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এই কাজে এই প্রথম উৎপাদন নির্ণয়ের জন্য স্যাটেলাইট ইমেজ ব্যবহার করে আমন ধানের আবাদকৃত এলাকার তথ্য বের করা হয়েছে। 

Advertisement
Advertisement