শুক্রবার   ০৭ আগস্ট ২০২০ ||  শ্রাবণ ২২ ১৪২৭ ||  ১৭ জ্বিলহজ্জ ১৪৪১

ACI Agri Business

নিরাপদ খাদ্য: কোভিড -১৯ ও কিছু উপলদ্ধি

ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম ও তামান্না মাসতুরা

প্রকাশিত: ১৪:২১, ১৯ জুলাই ২০২০

পুুরো বিশ্ব এক অস্বস্তিকর সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এখানে এখন ইচ্ছে করলেই বুক ভরে নিশ্বাস নেয়া যাচ্ছে না, চাইলেই কাউকে ছোয়াঁ যাচ্ছে না, কারো পাশে বসে মন খুলে আলাপচারিতায় মেতে উঠা যাচ্ছে না। মুখগুলো সব ঢেকে গেছে মাস্কের আড়ালে আর হাতগুলো বন্দি হয়েছে গ্লাভসের আবরণে। মানুষের জীবন-জীবিকা চরম হুমকির মুখে পড়ে গেছে, মানসিক বিপর্যয় বাড়ছে, বিশ্ব অর্থনীতি ভঙ্গুর হয়ে যেতে বসেছে, উন্নয়নশীল দেশগুলো আবারো পিছিয়ে পড়ছে। তবুও কোনভাবেই থামছে না এই অনু ভাইরাসের তান্ডব, যেন সবাইকে আক্রমন করে তবেই ক্ষান্ত হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই মহামারিকে ‘সন্ত্রাসবাদী আক্রমণের চেয়েও বেশী শক্তিশালী’ বলে আখ্যায়িত করেছে। নিজেকে প্রতিনিয়ত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছে এই কোভিড-১৯ রোগ সৃষ্টিকারী করোনাভাইরাস।

গবেষকদের মতে করোনাভাইরাস বাদুর থেকে মানুষের মধ্যে প্রাকৃতিক বিবর্তনের ফলে উদ্ভুত হয়েছে। যদিও বেশ কিছু সামুদ্রিক প্রাণী করোনাভাইরাস বহন করতে পারে (যেমন বেলুগা, তিমি)। এই ধরনের ভাইরাসজনিত রোগ যা বিভিন্ন প্রাণী, পাখি, মাছের মাধ্যমে ছড়ায় তা জুনোটিক রোগ হিসেবে পরিচিত। এই ভাইরাসটির উহানের হুয়ানান সামুদ্রিক খাবারের পাইকারী বাজারকে সংক্রমণের সম্ভাব্য স্থান বলে মনে করা হচ্ছে। কারন ৪১ জন ভাইরাল নিউমোনিয়ার রোগীর মধ্যে ২৭ জনের ক্ষেত্রে এই বাজারের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ততা ছিল, যাদের মধ্যে কিছু ছিল ক্রেতা। উহানের ওই বাজারটিতে বিভিন্ন ধরনের জীবন্ত ও সামুদ্রিক প্রাণী পাওয়া যেত, যেমন মাছ, মুরগি, বাদুর, খরগোশ, সাপ ইত্যাদি। 

সম্প্রতি চীনা বিশেষজ্ঞরা আরো একটি ইনফ্লুয়েন্জা গোত্রীয় ভাইরাসের সন্ধান পেয়েছে যা শূকরের মাধ্যমে মানবদেহে ছড়াতে পারে এবং মহামারির সৃষ্টি করার ক্ষমতা রাখে। জীবন ধারনের জন্য যে খাদ্যের উপর আমরা নির্ভরশীল সেই খাদ্য উৎস থেকে রোগ-ব্যাধির সংক্রমন ঘটতে পারে যদি তা যথোপযুক্ত উপায়ে উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরন, বিপণন ও ভক্ষনযোগ্য হিসেবে তৈরী করা না হয়। আর মানব ইতিহাসে জুনোটিক রোগ সৃষ্টির মুল উৎস হল ওয়েট মার্কেট বা খোলা বাজার। 

করোনাভাইরাসের এই অভিজ্ঞতা আমাদের ভুলে যাওয়া শিক্ষা পুনরায় মনে করিয়ে দিচ্ছে, একইসাথে জানান দিচ্ছে সামগ্রিক সচেতনামুলক পদক্ষেপ গ্রহনের জন্য এখনি উপযুক্ত সময়। যেহেতু এই রোগের প্রতিকার হিসেবে এখনো কোন প্রতিষেধক আবিস্কৃত হয়নি তাই প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই শ্রেয়। সচেতনামুলক অভ্যাস অনুশীলন খুবই গুরুত্বপূর্ন। করনীয় হল আমাদের ইমিউন সিস্টেমকে বুস্ট আপ করা তথা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করা। কারন, শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দূর্বল হলে এই রোগে আক্রান্ত হওয়া সহজ। তাই শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি ও স্বাস্থ্যকর জীবন ব্যবস্থার মাধ্যমে এই রোগের বিরুদ্ধে নিজেদের তৈরি করে তোলা গুরুত্বপূর্ণ করনীয়। পাশাপাশি ওয়েট মার্কেট বা খোলা বাজারের স্বাস্থ্যকর পরিবেশ উন্নত করা সরকারী ও বেসরকারী পর্যায়ে পদক্ষেপ গ্রহণ।

সুস্থতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুষ্টিকর ও নিরাপদ খাদ্য গ্রহণের কোন বিকল্প নেই। সাধারণত নিরাপদ খাদ্য বলতে বুঝি, যে খাদ্যের গুনগত মান ঠিক রয়েছে এবং যে খাদ্য খেলে শরীরে কোন রোগ-ব্যাধি সৃষ্টি হয় না কিংবা শরীরের জন্য উপকারী। যে খাদ্য উৎপাদন ক্ষেত্র থেকে শুরু করে ভোক্তার কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত কোনোভাবেই দুষিত হয় না এবং স্বাস্থ্যের জন্য হুমকির কারন হয় না তাকে নিরাপদ খাদ্য বলা যায়। অনিরাপদ খাদ্যগ্রহণ করলে খাদ্যবাহিত রোগ দেখা দেয়। খাদ্যবাহিত রোগ হচ্ছে বিভিন্ন রোগ উৎপাদক জীবাণু, সাধারণত ব্যাকটেরিয়া ও অন্যান্য অণুজীব এবং সেগুলি থেকে নিঃসৃত বিষদ্রব্য দ্বারা দূষিত খাদ্যগ্রহনের ফলে সৃষ্ট রোগ। 

দীর্ঘদিন থেকেই আমাদের অন্যতম চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে সকল নিরাপদ খাদ্য ভোক্তার পৌঁছে দেয়া। নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য, বিশেষত কৃষিজাত পণ্য গুনগত মান ঠিক রেখে সকল শ্রেণীর ভোক্তার কাছে সুলভ মূল্যে জোগান দেয়ার মাধ্যমেই মানবদেহে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা শক্তিশালী করে তোলা এবং সুস্থ ও কর্মক্ষম জাতি গঠন করা সম্ভব। বাংলাদেশে কৃষি উৎপাদন বাড়লেও খাদ্যের গুনগত মান রক্ষা ও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা যায়নি। খাদ্য উৎপাদনে সঠিক জ্ঞানের অভাব, বাজারজাতকরন ও বিপণনে দক্ষ ব্যবস্থাপনার অভাব এবং সরবরাহ চেইনে কুশীলবদের অসাধুতার কারন বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য যোগানে বড় অন্তরায়। কৃষি পন্যের সরবরাহ চেইন যেমন উৎপাদন থেকে শুরু করে প্রক্রিয়াজাতকরন, পরিবহন, বিপণন ও খাদ্য গ্রহন করা পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরে সচেতনভাবে কিংবা কখনো কখনো অসচেতনতার কারনে রাসায়নিক দ্রব্যাদি ও জীবাণু দ্বারা খাদ্য পণ্য বিষাক্ত বা দুষিত হতে পারে। সাধারণত নিরাপদ খাদ্যে দুই ধরনের তৈরী হয়: জীবাণু সংক্রান্ত দূষন (যথা বিভিন্ন ধরনের জীবাণু, ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক ইত্যাদি)। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এ কারনে দূষিত খাদ্য মানবদেহে বিভিন্ন বিরুপ উপসর্গের সৃষ্টি করে। রাসায়নিক দ্র্যব্যাদি দ্বারা দূষণ যার মধ্যে রয়েছে অনিয়ন্ত্রিত মাত্রায় সার ও কীটনাশক ব্যবহার, ফরমালিনসহ বিভিন্ন প্রিজারভেটিভ ব্যবহার, পশুর ঔষধের অবশিষ্টাংশ যা কারো অগোচরে খাদ্যে অনুপ্রবেশ করে ইত্যাদি।

তাই খাদ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে ভোক্তার টেবিল পর্যন্ত খাদ্যের গুনগত মান নিশ্চিত রাখা সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের একটি বড় দায়িত্ব। আমাদের দেশে ২০০৯ সালে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষন আইন প্রনীত হয় এবং ২০১৩ সালে নিরাপদ খাদ্য আইন প্রনীত হয়। কিন্তু এই সকল আইনের প্রয়োগ এখনো সীমিত। কৃষিজাত পন্যের ক্ষেত্রে গুনগত মান রক্ষা ও দূষন রোধে আইনের প্রয়োগের সাথে সাথে প্রয়োজন কৃষিপণ্য উৎপাদক ও ব্যবসায়ীদের মাঝে তাদের নিজ নিজ দায়িত্ব ও অনুশীলন সর্ম্পকে সঠিক জ্ঞান থাকা। এক্ষেত্রে ২০১৩ সালে নিরাপদ খাদ্য আইন বিষয়ে তাদের অবগত করার পাশাপাশি তাদের জন্য বিভিন্ন প্রকার প্রশিক্ষণ প্রদানের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তর, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ কর্তৃক সচেতনতা বৃদ্ধি কার্যক্রমও অত্যন্ত ফলপ্রসু ভ‚মিকা রাখবে। এছাড়া দেশে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে আধুনিক পদ্ধতিতে সঠিক গবেষনা পরিচালনার জাতীয় পর্যায়ে ফুড সেফটি ল্যাব বিভিন্ন বিভাগীয় শহর ও উৎপাদন এলাকায় সম্প্রসারন করাসহ কার্য্যক্রম জোরদার করার পাশাপাশি সমন্বিত গবেষনা পরিচালনার ক্ষেত্র তৈরী করা প্রয়োজন। 

গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি পদক্ষেপ হচ্ছে আমাদের কৃষিপন্যের মান আর্ন্তজাতিক মানের পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে যেন আমরা আমাদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত কৃষিপণ্য বিদেশে রপ্তানি করার ক্ষেত্রে আর্ন্তজাতিক মান রক্ষা করতে পারি আর তার জন্য লেবেলিং ও ট্রেসিবিলিটি ব্যবস্থা চালুসহ জোরদারকরণ জরুরি। আর এ সংক্রান্ত ব্যবস্থাপনার জন্য করণীয় হল (১) উত্তম কৃষি-সংক্রান্ত পদ্ধতি অনুশীলন বা গ্যাপ -কৃষিপণ্য উৎপাদনের সময় গুনগত মান অক্ষুন্ন রাখতে সঠিক পদ্ধতি অনুসরন; (২) উত্তম প্রক্রিয়াজাতকরণের পদ্ধতি অনুশীলন বা জিএমপি - কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের ক্ষেত্রে মান নিয়ন্ত্রণ ও সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ; এবং (৩) প্রক্রিয়াজাতজনিত সংকট চিহ্নিতকরণ ও ধাপসমূহের নিয়ন্ত্রণ (হ্যাজার্ড অ্যানালাইসিস অ্যান্ড ক্রিটিক্যাল কন্টোল পয়েন্ট বা হেছাপ)-  খাদ্যের মান ও নিরাপত্তা রক্ষায় প্রক্রিয়াজাতকরনের প্রতিটি পর্যায়ে সম্ভাব্য সমস্যা চিহ্নিত করা ও তা নিয়ন্ত্রন করার সক্রিয় কারিগরী পদ্ধতি অনুসরন। এছাড়াও ভোক্তা পর্যায়ে সঠিক পদ্ধতি অনুসরন করে খাদ্য সংরক্ষন ও তৈরী করার জন্য সচেতনতা বৃদ্ধি কার্যক্রম হিসেবে গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার প্রচারণার প্রয়োজন রয়েছে। আর তার মাধ্যমে সম্ভব হবে খাদ্য সরবরাহ চেইনের উৎপাদন থেকে শুরু করে ভোক্তা পর্যায় পর্যন্ত খাবারের গুনগত মান বজায় রাখা, আর তা করা গেলে সম্ভব হবে ওয়েট মার্কেটে সৃষ্ট সম্ভাব্য জুনেটিক রোগ নিয়ন্ত্রন ও ভবিষ্যত মহামারির ঝুকিঁকে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নিয়ে আসা।

নিরাপদ খাদ্য যেমন সবার জন্য প্রয়োজন তেমনি নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে সবাইকে সচেতনার সঙ্গে নিজ দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট হতে হবে। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার জন্য পন্য উৎপাদন, সংরক্ষণ, সরবরাহ, বিপণন ও খাদ্য প্রস্ততকরণ প্রতিটি পর্যায়ে সচেতনতা প্রয়োজন। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা সম্ভব। সরকার ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিনত করতে বদ্ধপরিকর। এ জন্য স্বাস্থ্যবান ও কর্মক্ষম জনশক্তির বিকল্প নেই। আর কর্মক্ষম জনশক্তির জন্য পুষ্টিসমৃদ্ধ নিরাপদ খাবারের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। 

করোনা ভাইরাস মহামারির আমাদের জন্য শুধু বিপর্যয়ই ডেকে আনেনি, মূলত আমাদেরকে আত্ম-উপলদ্ধির এক সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে। আমাদেরকে এখন ভবিষ্যতের সম্ভাব্য সকল প্রকার বিপর্যয় ও তার প্রতিরোধ সম্পর্কিত দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই পরিকল্পনা নিয়ে ভাবতে হবে, আমাদের ভুলগুলো চিহ্নিত করে সমাধান খুঁজে বের করতে ও বাস্তবায়নে উদ্যোগী হতে হবে এবং সর্বাত্মক সচেতনতা বৃদ্ধি করতে জোরালো পদক্ষেপ নিতে হবে। স্থবিরতার এই সময়েও মাননীয় কৃষি মন্ত্রী ড. মো: আবদুর রাজ্জাকের আহব্বান ‘সবার জন্য পুষ্টিকর ও নিরাপদ খাদ্য: মুজিববর্ষে অঙ্গীকার’ ভুলে গেলে চলবে না বরং এই সংকটের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সবাই মিলে এই অঙ্গীকার পূরণে সচেষ্ট ভুমিকা পালন অব্যাহত রাখতে হবে। 

লেখকদ্বয়ঃ 
১. প্রফেসর ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম, কৃষিব্যবসা ও বিপণন বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ। ই-মেইলঃ alambau2003@yahoo.com
২. তামান্না মাসতুরা, ‘পুষ্টি উন্নয়নের জন্য বাজার হস্তক্ষেপ’ প্রকল্প ইনটার্ন ও এমএস গবেষক, কৃষিব্যবসা ও বিপণন বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ।

Advertisement
Advertisement