বৃহস্পতিবার   ২৪ অক্টোবর ২০১৯ ||  কার্তিক ৮ ১৪২৬ ||  ২৪ সফর ১৪৪১

দুধে এন্টিবায়োটিকের উপস্থিতি: এপিঠ-ওপিঠ

মো: মইনউদ্দিন খন্দকার

প্রকাশিত: ১৯:৪৫, ১৬ জুলাই ২০১৯

ফাইল ফটো

ফাইল ফটো

দুধে এন্টিবায়োটিক ও ডিটারজেন্টের উপস্থিতি নিয়ে ব্যাপক হৈ-চৈ হচ্ছে। ফেসবুক থেকে শুরু করে গবেষক, অধিদপ্তর, মন্ত্রণালয়, বিএসটিআই, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন ভাগে ভাগ হয়ে, বিভিন্ন পক্ষ হয়ে লেখালেখি করছেন। অনেকের লেখায় কোন কোন পক্ষকে ভিলেন, অথর্ব হিসেবে প্রমান করার পেরেশানি দেখা গিয়েছে। অথচ ভেটেরিনারি ফার্মাকোলজি এন্ড টক্সিকোলজির একজন ছাত্র হিসেবে বিষয়টি একটি সাধারণ বিষয় মনে হয়েছে, শুধুমাত্র দু'পক্ষের একশন-রিয়েকশনের স্টাইলকে অযাচিত মনে হয়েছে। এই অযাচিত স্টাইলের কারণেই একজন স্বনামধন্য গবেষক মামলার হুমকি পান এবং বিপন্ন বোধ করেন, দেশের ডেইরি শিল্পের সাথে সম্পর্কিত জনবল কিংবা মালিকপক্ষ আশঙ্কা বোধ করেছিলেন। অথচ দুপক্ষ যদি জুডিশিয়াস মাইন্ড ব্যবহার করতেন, তাহলে আমরা একে অপরের কাঁধে হাত রেখে ডেইরি শিল্পকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারতাম এবং জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষা দিতে পারতাম। এই অযাচিত এন্টিবায়োটিক রেসিডিউ থেকে পরিত্রাণ পেতে পারতাম।

প্রথমেই আসি গবেষকদের বিষয়ে। শুরুতেই বলে নিচ্ছি আমি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হলেও ফার্মেসি অনুষদের ঔষধ প্রযুক্তি বিভাগের প্রফেসর আ.ব.ম ফারুক স্যারকে এক যুগেরও আগে থেকে জানি ও চিনি। জনস্বাস্থ্য নিয়ে স্যারের আগ্রহ এবং এ বিষয়ে পত্রিকায় বিভিন্ন লেখালেখির কারণে স্যারকে চিনতাম। তাছাড়া জাতীয় ঔষধ নীতি ২০১৬ এর খসড়া প্রণয়ণের জন্য ২০১১ সালে যে কমিটি হয়েছিলো সে কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন আ.ব.ম ফারুক স্যার। সে হিসেবেও স্যারকে জানি। স্যারের অবদান বা ডেডিকেশন নিয়ে আমার বলার সুযোগ নেই, তবে কেন জানি মনে হয়েছে এরকম হাল্কা (হাল্কা এজন্য বলছি যে এরকম কাজ এদেশেও এর আগে হয়েছে, বিভিন্ন দেশেও হয়েছে এবং নিয়মিতই হয়ে থাকে) একটি কাজের নেতৃত্ব হয়তো স্যার দিয়েছিলেন (সুপারভাইজার/গাইড হিসেবে), তবে কাজের সাথে সম্ভবত স্যারের মাস্টার্স লেবেলের ছাত্ররা মূল ভূমিকায় ছিলেন। উঠতি ছেলেদের মতো উঠতি গবেষকদেরও একটি ওভারএক্টিভিটি থাকে। আর একারণে এরকম একটি টেস্টকে গবেষণা নাম দিয়ে মিডিয়ায় প্রচার করে লাইম লাইটে আসার একটি আকাঙ্ক্ষা হয়তো ছিলো সংশ্লিষ্টদের। গাইড হিসেবে নেতৃত্বের কারণে ফারুক স্যার হয়তো দায়ে পড়ে গিয়েছেন এবং সে দায় থেকে নিজেও জড়িয়েছেন।

এ অবস্থায় আমার মনে কিছু জিজ্ঞাসা ছিলো- কেবলমাত্র ৭টি র‍্যানডম স্যাম্পল নিয়ে করা একটি টেস্টের মাধ্যমে যে রেজাল্ট পাওয়া গেলো তা দিয়ে কি দেশের পুরো দুগ্ধশিল্পের বিষয়ে কথা বলা যায়?

বুঝলাম রেজাল্টে না হয় কিছু এন্টিবায়োটিকের রেসিডিউ পাওয়া গেলো। তাহলে গবেষক হিসেবে তাঁদের কি দরকার ছিলো না সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরকে অবহিত করা কিংবা সংশ্লিষ্ট এক্সপার্টদের সাথে সভা-সেমিনার করে তাঁদেরকে অবহিত করা। সেটা যদি না হয়ে থাকে, তবে টেস্টে যতো মাত্রার রেসিডিউই পাওয়া যাক না কেন সংশ্লিষ্ট দপ্তর বা শিল্পমালিকরা কিন্তু উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ আছে এবং করেছেও। প্রাণিসম্পদের অনেকেই বলেছেন দেশিয় দুগ্ধশিল্পে পেনিক সৃষ্টি করার জন্যই টেস্ট করে সংশ্লিষ্টদের সাথে শেয়ার না করে সরাসরি মিডিয়ায় ব্রিফ করা হয়েছে। যদিও আমি মনে করছি না ফারুক স্যারের নেতৃত্বে এ উদ্দেশ্যে কোন কাজ হবে। কিন্তু যাঁরা ফারুক স্যারকে জানেন না তাঁরা এটা মানতে চাইবেন কেন?

গবেষণার ব্যপ্তি অনেক বড়। সেখানে বৃহৎ স্যাম্পল নিয়ে কাজ হয়, রেজাল্টের সাথে ডিসকাশনও থাকে; কেন, কিভাবে হচ্ছে তার বিবরণ থাকে; কিভাবে পরিত্রাণ পাওয়া যেতে পারে সেটার সম্ভাব্য সমাধান বিধৃত থাকে। তারপরেও দেখা যায় সেই গবেষণার ফলাফল নিয়ে একটি সেমিনার দেয়া হয় যেখানে মাল্টিডিসিপ্লিনারি গবেষকগণ থাকেন, পলিসিমেকারগণ থাকেন, একাডেমিশিয়ানরা থাকেন, স্টেকহোল্ডারগণ থাকেন, অনেক ক্ষেত্রে বিশেষ ধরণের সাংবাদিকগণও থাকেন। সেখানে প্রশ্নোত্তর হয়, ফাইন্ডিংসগুলি নিয়ে খুঁটিনাটি বিশ্লেষণ হয়। ফলে রেজাল্ট নিয়ে হলিস্টিক একটি ধারণা তৈরি হয়। এখানেতো কোন গবেষণাই হয় নি, শুধুমাত্র একটি টেস্ট দিয়ে হুট করে মিডিয়ায় ফলাও করে প্রচার করা আর যাই হোক তাকে প্রফেশনালিজম বলা যায় না। আর তা যদি দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্পের সাথে সম্পর্কিত হয় তাহলে বোধ করি গবেষকগণ সমাজে সঠিক উপায়ে ম্যাসেজ দিতে পারেন নি। উলটো পত্রিকা পড়ে মানুষ ভীত সন্ত্রস্ত হয়েছে।

আমাদের দেশের ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর মানুষ ও প্রাণীতে কোন ড্রাগ ব্যবহার করা যাবে তার অনুমোদন দিতে পারলেও দুধ কিংবা প্রাণিজাত দ্রব্যে ড্রাগ রেসিডিউ বা এন্টিবায়োটিক রেসিডিউ এর এমআরএল (ম্যাক্সিমাম রেসিডিউয়াল লিমিট-ইইউ) বা টলারেন্স লেভেল (ইউএসএ) কি হবে তা ঠিক করে দেয়ার মতো সক্ষমতা এখনো হয় নি। সে হিসেবে উপর্যুক্ত টেস্টে দুধে এন্টিবায়োটিকগুলি এমআরএল বা টলারেন্স লেভেল অতিক্রম করেছিলো তা জানারও সুযোগ নেই, নিউজ কিন্তু রাষ্ট্র হয়ে গেলো সব্বনাশ দুধে এন্টিবায়োটিক পাওয়া গিয়েছে। অথচ এপ্রুভড ড্রাগে (ঔপ্রঅ কর্তৃক প্রাণি চিকিৎসায় টেট্রাসাইক্লিন, সিপ্রোফ্লক্সাসিন, এনরোফ্লক্সাসিন এপ্রুভড) এমআরএল বা টলারেন্স লেভেলে বা তার নিচের লেভেলে রেসিডিউ থাকতেই পারে। উল্লেখ্য শুধুমাত্র প্রাণি চিকিৎসায় অঅনুমোদিত বা নিষিদ্ধ ঘোষিত ঔষধের ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স বা কোন লেভেলই এদের উপিস্থিতি গ্রহণযোগ্য নয়।

দ্বিতীয় ধাপে যে ৪ টি এন্টিবায়োটিক রেসিডিউর অস্তিত্ব ধরা পড়লো বলে জানা গেলো এদের মধ্যে প্রাণি চিকিৎসার ক্ষেত্রে টেট্রাসাইক্লিন, সিপ্রোফ্লক্সাসিন, এনরোফ্লক্সাসিন ঔষধ প্রশাসন কর্তৃক অনুমোদিত হলেও প্রাণীতে লেভোফ্লক্সাসিন ঔষধ প্রশাসন কর্তক অনুমোদন করা হয়েছে এমন তথ্য পাওয়া যায় নি (পোল্ট্রিতে অনুমোদিত এবং ব্যবহার করা হয়), ব্যবহার করার বিষয়তো অকল্পনীয়। যদিও অন্য কোন উৎস্য থেকে কনটামিনেটেড হওয়ার সুযোগ থাকলেও থাকতে পারে। যদি ধরেই নিই অন্য সোর্স থেকে আসতে পারে, তবে মিডিয়ায় প্রচার করা আদৌ সুবিবেচনা প্রসুত নয় বলেই মনে করি।

আরেকটি বিষয় উল্লেখযোগ্য তা হলো যদিও উচ্চতর গবেষণায় ফিল্ড মূখ্য নয়, তারপরেও বিষয়ের গভীরে যেতে হলে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সংশ্লিষ্ট গবেষকগণেরই নেতৃত্ব দেয়া উচিত বা করা উচিত। অন্তত টিমের মধ্যে একজন হলেও সংশ্লিষ্ট বিষয়ের গবেষক বা এক্সপার্ট থাকা উচিত। নতুবা মিসলিড করতে পারে। উপরে বর্ণিত অন্য উৎস্য কিংবা প্রাণি চিকিৎসায় কোন কোন ঔষধ ব্যবহৃত হয় সেটা জানার জন্য ভেটেরিনারিয়ান থাকা আবশ্যক। তাহলে আরো যৌক্তিক উপসংহারে পৌঁছা যেতো।

এবার আসি দ্বিতীয় বিবেচ্য বিষয়ে। ফারুক স্যার ও তাঁর দল টেস্ট করে খেয়াল করে হোক আর বেখেয়ালে হোক তা মিডিয়ায় ব্রিফ দিয়েছেন। হতে পারে তা দেশের বৃহত্তর স্বার্থের জন্য আতঙ্কজনক, তাই বলে একজন স্বনামধন্য অধ্যাপক যিনি ঔষধ শিল্পের সাথে ওতোপ্রোতভাবে জড়িত, ঔষধ নীতির আহ্বায়ক হিসেবে দেশের জন্য অনেক পরিশ্রম করেছেন, জনস্বাস্থ্য নিয়ে প্রতিনিয়ত ভাবেন তাঁকে মামলা-হামলার হুমকি দিতে হবে? প্রয়োজনে স্যারকে নিয়ে বসা যেতো, স্যারের কাছ থেকে জানা যেতো তিনি কী করেছেন? কী কী উপায়ে করেছেন? এতে করে একটি স্পেস তৈরি হতো, ভুল বুঝার অবকাশ সৃষ্টি হতো না। প্রয়োজনে দুপক্ষ মিলে মিডিয়াকে পুনরায় ব্রিফ করা যেতো। কিন্তু যা হলো তা ভুলকে পুনরায় ভুল পথে পরিচালনা করা হলো। উভয় পক্ষের হিতাকাঙ্ক্ষীরা বিপক্ষকে দেশি-বিদেশি কোম্পানির দালাল বলে আখ্যায়িত করছেন। দুপক্ষই ইগো নিয়ে বসে আছেন যার যার অবস্থানে আর কিছু তৃতীয় পক্ষ দুপক্ষকে তাতিয়ে দিয়ে ইস্যুটাকে জিইয়ে রাখার অপচেষ্টা করছেন।

জনস্বাস্থ্য রক্ষায় বিশেষ করে এনিম্যাল অরিজিন খাদ্যের ভেজাল কিংবা ক্ষতিকারক রাসায়নিক বা ড্রাগ রেসিডিউ রোধে সরকারের উচিত The Europian Medicines Agency's (EMA), Committee for Medicinal Products for Veterinary Use (CVMP) অথবা US Food and Drug Administration (USFDA) এর আওতাধীন Center for Veterinary Medicine (CVM) এর মতো প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার চেষ্টা করা। অন্তত শুরু যদি করা যায়, তাহলে আশা করি আগামি ২০-৩০ বছরের মধ্যে আমরা একটি উন্নতমানের ভেটেরিনারি ড্রাগ এপ্রুভাল অথরিটি পেতে পারি। সকলের শুভবুদ্ধির উদয় হোক এ আশাই করছি।

পুনশ্চ: এমআরএল (ম্যাক্সিমাম রেসিডিউয়াল লিমিট-ইইউ) বা টলারেন্স লেভেল (ইউএসএ) অনুমোদিত ড্রাগ প্রাণি দেহে এডমিনিস্ট্রেশিনের পরে যে সর্বোচ্চ পরিমাণ ড্রাগ প্রাণিজ দ্রব্যে (মাংসে, দুধে ইত্যাদি) রেসিডিউ বা অবিশিষ্ট হিসেবে থাকলে সে প্রাণিজ দব্যাদি মানুষ ভক্ষণ করলে তা মানবদেহের জন্য নিরাপদ বলে বিবেচিত হবে।

MRL: কানাডিয়ান সরকারের মতে গরুর দুধে Maximum Residue Limits (MRLs) ফর অক্সিটেট্রাসাইক্লিন ০.১ পিপিএম, এজিথ্রোমাইসিন (এরিথ্রোমাইছিন) ০.৫ পিপিএম, এনরোফ্লক্সাসিন/সিপ্রোফ্লক্সাসিন ০.০৫ পিপিএম, অথচ তিনি সর্বোচ্চ এজিথ্রোমাইসিন পেয়েছেন ০.০০৬ পিপিএম, আর সর্বোচ্চ অক্সিটেট্রাসাইক্লিন পেয়েছেন ০.০০৭ পিপিএম (টেস্টের ফলাফলের সূত্র: সংগ্রহ, যেহেতু আমার সংগ্রহে নেই )।

লেখক: সাবেক বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, বিএলআরআই।