শুক্রবার   ০৭ আগস্ট ২০২০ ||  শ্রাবণ ২২ ১৪২৭ ||  ১৭ জ্বিলহজ্জ ১৪৪১

ACI Agri Business

আত্মকথন- তৃতীয় পর্ব

ডাক পিয়ন ও প্রথম বিমান ভ্রমণ

প্রফেসর ড. এ এস মাহফুজুল বারী

প্রকাশিত: ০০:৫৫, ২৮ জুন ২০২০

পরের বছর অর্থাৎ ১৯৮৫ সালে ইংল্যান্ডের লিভারপুল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য যোগাযোগ শুরু করলাম। ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ে পূর্ব থেকেই আমার শিক্ষাগুরু প্রফেসর ড: গোলাম শাহী আলম স্যার (মাননীয় সাবেক ভাইস চ্যান্সেলর সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়) তখন পিএইচডির শেষ পর্যায়ে। সুইডেনের উপসালা বিশ্ববিদ্যালয় হতে মাস্টার্স শেষ করে ইংল্যান্ডের লিভারপুলে পি এইচ ডি করেছিলেন।স্যারের তখন শেষ বর্ষ, পিএইচডি থিসিস লেখা এবং জমা দেওয়ার জন্য ব্যস্ত। 

গোলাম শাহী আলম স্যার আমাদের ডিভিএম শেষ বর্ষে মেডিসিনের মেটাবলিক ডিজিজ পড়াতেন । স্যার কে নিয়ে একটা গল্প মনে পরে গেল, না বলে থাকতে পারছি না। একদিন আন্ডারগ্রাজুয়েট ক্লাসে স্যারকে আমি একটা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করেছিলাম, স্যার সেই প্রশ্নের উত্তর সরাসরি না দিয়ে উল্টো আমাকেই আরেকটা কঠিন প্রশ্ন ধরে হঠাৎ করে রেগে গেলেন। বুঝতে পারলাম আসলে আমার প্রশ্নের উত্তরটা তখন স্যারের মনে ছিল না , অথবা উনি পারতেছেন সেটাকে ওভারকাম করার জন্য আমার সাথে রাগারাগি করে স্যার আমাকে অন্য আরেকটা কঠিন প্রশ্ন ধরে আমাকে নাজেহাল করে দিয়েছিলেন। আমার আসলে স্যারকে ওইভাবে ওই প্রশ্নটা করা উচিত ছিল না। ওটা ছিল আমার অনেকটা বোকামির মত একটা অগ্রহণযোগ্য কাজ।

যাহোক পরবর্তীতে এই স্যার ই আমার একজন আদর্শ মেন্টর হয়ে উঠেন এবং স্যারের কাছে আমি সারা জীবনের জন্য কৃতজ্ঞ।আমি এখনও কৃতজ্ঞ চিত্তে গর্ব করে বলি এই শাহী আলম স্যারই আমার পিএইচডি ভর্তির ব্যাপারে ইংল্যান্ডের এর লিভারপুল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্মল অ্যানিমেল এর প্রফেসর গ্যাসস্কেল এর সাথে যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছিলেন। আমি সে সময় আমার টাইপরাইটারে সিভি তৈরি করে স্যারকে পাঠিয়েছিলাম, সেই সিভি স্যার ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে উনি আবার নতুন করে নিজের টাইপরাইটারে টাইপ করে প্রফেসর গ্যাসস্কেলের এর কাছে উপস্থাপন করেছিলেন। প্রফেসর আমার সিভিটি গ্রহণ করে ডক্টর স্টুয়ার্ট কার্টারের কাছে উপস্থাপনা করেন এবং সিভি পর্যালোচনা করে আমাকে পিএইচডি ছাত্র হিসেবে গ্রহণ করেন। 

স্টুয়ার্ট কার্টার মূলত ইমিউনোলজিষ্ট, সে সুবাদে আমিও ইমিউনোপ্যাথলজিলজি তে উচ্চশিক্ষার জন্য এনরোল্ড হয়েছিলাম। পরবর্তীতে আমার পিএইচডি এডমিশন এর সম্মতিপত্রটি ঐ বছরই কমনওয়েলথ কমিশন গ্রহণ করে এবং আমার পিএইচডি ফেলোশিপ লিভারপুল ইউনিভার্সিটিতে কনফার্ম হয়ে যায়।

আমার বন্ধু প্রফেসর ড. রফিকুল ইসলাম  ও কমনওয়েলথ ফেলো হিসেবে লিভারপুল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যাথলজি ডিপার্টমেন্টের পিএইচডি ছাত্র ছিলেন। এ ছারা প্যারাসাইটোলজি বিভাগের প্রাক্তন প্রফেসর বর্তমানে আমেরিকায় বসবাস করছেন, শ্রদ্ধেয় অগ্রজ জহির ভাই ব্রিটিশ কাউন্সিলের স্কলারশিপ নিয়ে পিএইচডি করছেন। আমার আরেক বন্ধু ফার্মাকোলজি বিভাগের মরহম প্রফেসর ডঃ মাহবুব মোস্তফা ও কমনওয়েলথ ফেলো হিসেবে ইউনিভার্সিটি অফ গ্লাসগোতে আগের বছর পিএইচডিতে এনরোল্ড হয়েছিলেন। রফিক আর মাহবুব দুজনেরই যখন শেষের পথে আমার তখন কেবল শুরু।

মনে পরে কমনওয়েলথ কমিশনের স্কলারশিপের ঐ চিঠিটা পাওয়ার আশায় প্রতিদিনই একবার করে বিশ্ববিদ্যালয়ের পোস্ট অফিসে খোঁজ নিতাম। যারা অ্যাপ্লিকেশন করতেন তারা প্রায় সবাই খোঁজ নিতেন। সেই সময় "রফিক" নামে একজন পোস্ট অফিসের পিয়ন চিঠিপত্র বিতরণ করতেন। এই রফিক ভাইয়ের স্মৃতিশক্তিটা যে কি রকম প্রখর ছিল যে প্রতিটি হলের প্রতিটি ছাত্রের নাম তার মুখস্থ ছিল, মানি অর্ডার পেলেই দূর থেকে নাম ধরে ডেকে বলতেন স্যার আপনার মানি অর্ডার এসেছে। মানি অর্ডার টা প্রাপকের হাতে পৌঁছে দিলেই দশ টাকা বকশিশ। আমি একবার হিসাব করে দেখেছি রফিক ভাই মানি অর্ডার ডেলিভারির করে যে টাকা বকশিশ পেতেন তা তার বেতনের তিনগুণ। লেখাপড়া তেমন একটা জানতেন না, তবে রফিক ভাই চিনতে পারতেন কোনটি কমনওয়েলথের এ্যাওয়ার্ড লেটার! কোন শিক্ষকের এ্যাওয়ার্ড লেটার এলেই দূর থেকে দেখেই চিল্লাইতে থাকতেন "স্যার" আপনার খুশির সংবাদ আছে।
 
১৯৮৬ সাসের মে মাসের প্রথম সপ্তাহে তখন রমজান মাস, সেদিন পোস্ট অফিসের পিয়ন "রফিক ভাই" টিএসসির সামনে অন্যদের চিঠিপত্র বিতরনের সময় আমার সাথে দেখা হলেই চিৎকার করে উঠল বারি স্যার আপনার খুশির সংবাদ এখন আমার হাতের মুঠোয়। হঠাৎ করে আমার বুকের মাঝে ধপ ধপ করে উঠলো। সত্যি কি তাই? আমি কি কমনওয়েলথ স্কলারশিপ পেয়ে গেছি? ব্রিটিশ এয়ার মেইলের ইনভেলাপ টা দেখে চিঠি খোলার আগেই বুকটার ভিতরে ধক ধক করছিল। এবারও কি রিগ্রেট লেটার? না, আলহামদুলিল্লাহ এবার পেয়ে গেছি। রফিক ভাইকে খুশিতে আত্মহারা হয়ে ১০ টাকার পরিবর্তে আমি ১০০ টাকা দিয়েছিলাম। রফিক ভাই আমার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে বলেছিলেন স্যার আমার কাছে তো ভাংতি নাই। আমি বলেছিলাম আপনাকে আর ফেরত দিতে হবে না। দোয়া রাখবেন রফিক ভাই। তখনতো সর্বসাকুল্যে বেতন উত্তোলন করতাম ১৭০০/১৮০০ টাকা, টিএসসির রুম ভাড়া দিতাম ৪৫০ টাকা, বাকি টাকা দিয়ে টোনাটুনির সংসার। 

যেদিন কমনওয়েলথের এ্যাওয়ার্ড লেটারটি হাতে পেলাম ঠিক সেদিনই আমাদের আরেকট খুশির দিন ছিল, সেদিনই দুপুরে রিপোর্ট নিয়ে এলাম ফরিদা ইয়াসমিন মা হতে যাচ্ছেন আলহামদুলিল্লাহ এই দুই খুশির সংবাদে আমরা কৃতজ্ঞচিত্তে পরম করুণাময় আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিলাম।

১৯৮৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসের ২৬ তারিখে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের এক বিশাল আকারের জাম্বোজেটের মাধ্যমে ঢাকা থেকে লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরে যাত্রা। আমরা টাঙ্গাইল থেকে ঢাকা কুর্মিটোলা বিমানবন্দরে ট্যাক্সিতে যাই। সেদিন প্রচন্ড বৃষ্টি হয়েছিল। 

ঢাকা হতে রাত্রি আটটায় ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের ফ্লাইট ছিল। মাঝপথে ওমানের মাসকাটে বিমানের তেল নেওয়ার জন্য কিছু সময় বিরতি ছিল। কিন্তু কোন প্যাসেঞ্জারকে নামতে দেয়া হয়নি। আমি ও আমার সহধর্মিনী ফরিদা ইয়াসমিনের ওটাই ছিল প্রথম বিমান ভ্রমণের অভিজ্ঞতা। এরপর খুব সম্ভবত ২০০৯ সাল হতে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ ব্যবসায় ক্ষতি এবং সিকিউরিটির কারণে বাংলাদেশ থেকে তাদের সকল সার্ভিস বন্ধ করে দেয় যা আর চালু হয়নি।

আমাদের সঙ্গে আমার আরেক ক্লাসমেট, ইকনোমিকস ফ্যাকাল্টির রেখাও ছিল ঐ ফ্লাইটে। ড. রেখা ছিল একেবারেই হালকা-পাতলা একটা মেয়ে, বাকসুর নির্বাচিত সদস্য হয়েছিল। রেখা তখন সিলেট শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর। রেখা ও কমনওয়েলথ স্কলারশিপ এ ওই বছর গিয়েছিল।

এদিকে, আমার বন্ধু মরহুম প্রফেসর ড. মাহবুব মোস্তফার স্ত্রী এবং তার এক বছরের কন্যা মৈত্রীও আমাদের একই ফ্লাইটে যাত্রী ছিল।
আমাদের সবারই ওটাই ছিল জীবনে প্রথম বিমান ভ্রমণের অভিজ্ঞতা। প্রায় সারাটি রাস্তায় মৈত্রীর কান্নাকাটিতে বিমানবালারা অস্থির হয়ে গিয়েছিল, কোনক্রমেই ওকে শান্ত করা যাচ্ছিল না, একসময় টায়ার্ড হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল।

রেখার বড় ভাই ছিলেন ভেটেরিনারি অনুষদের ছাত্র ডাক্তার শহিদুল ইসলাম। শহীদ ভাই পরবর্তীতে প্রাণিসম্পদের ডিজিও হয়েছিলেন। শহীদ ভাই প্রফেসর ড. প্রিয় মোহন দাসের ( প্রিয় দা) বন্ধু ছিলেন, উনারা বাকৃবিতে প্যারালেলী ভর্তি হয়েছিলেন। প্রিয় দা ছিলেন এইচএসসি ব্যাচের আর শহীদ ভাই ছিলেন লাস্ট এসএসসি ব্যাচের ভর্তিকৃত ছাত্র। এছাড়া বর্তমানে কানাডায় ইমিগ্রেশন নিয়ে বসতি স্থাপন করেছেন আমাদের বড় ভাই ফার্মাকোলজি বিভাগের প্রাক্তন প্রফেসর ড. আব্দুল আউয়াল ভাই ছিলেন শহীদ ভাই এর ক্লাস ফ্রেন্ড।

ফ্লাইটে ওঠার আগের দিন শহীদ ভাই তার বোনের জন্য একটা ব্যাগ গুছিয়ে দিয়েছিলেন যার ভিতর কদবেল থেকে শুরু করে যত ধরনের ফল আর খাবার আছে সবই দিলেন, সবকিছু মিলিয়ে প্রচন্ড এক ভারী ব্যাগ। অথচ রেখা এত হালকা পাতলা একটা মেয়ে যে নিজেই চলতে পারে না আর ওই ব্যগ আমাকেই টানতে হয়েছিল। এদিকে, আমার সহধর্মিনীকেও দেখতে হচ্ছে কারণ এডভান্স স্টেজে, জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে ওর এক্সপেক্টেড ডেট অব ডেলিভারি।

ব্রিটিশ কাউন্সিল এর প্রোগ্রাম অফিসার বৈদ্যনাথ বাবু একবার বললেন এই এডভান্স স্টেজে আসলে যেতে পারবেন কি না, আরেকবার উনি বলেই ফেললেন যে অসুবিধা নাই চলে যান। অ্যাডভান্স স্টেজের একটা অসুবিধা হলো যদি কোনভাবে বিমানেই বাচ্চা হয়ে যায় তাহলে সেই বাচ্চা যে কোন দেশের নাগরিক। যে কোন দেশে ঐ বিমানে ফ্লাই করতে পারে। এবং তার জন্য ফ্রি এয়ারলাইন্সের টিকেট। এজন্যই অনেক এয়ারলাইন্স এটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিতে চায় না। যাই হোক আল্লাহর রহমতে আমাদেরকে অনুমতি দিয়েছিল। আর সবকিছু মিলিয়ে আমার জন্য বিমানের ওই প্রথম জার্নিটা ছিল একটা স্ট্রেসের। এরপর অগনিত বার বিমানের জার্নি হয়েছে কিন্তু প্রথম ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের জার্নিটা আমার জীবনে একটা স্মরণীয় দিন।

......( চলবে) 

   
লেখক: অধ্যাপক, প্যাথলজি বিভাগ ও ডিরেক্টর, ইন্টার ডিসিপ্লিনারি ইনস্টিটিউট ফর ফুড সিকিউরিটি, বাকৃবি এবং প্রাক্তন ভাইস-চ্যান্সেলর, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও এনিমেল সাইন্স বিশ্ববিদ্যালয়।
 

Advertisement
Advertisement