সোমবার   ০১ জুন ২০২০ ||  জ্যৈষ্ঠ ১৭ ১৪২৭ ||  ০৯ শাওয়াল ১৪৪১

টেকনাফের কফি ঘাসফড়িং ও পঙ্গপালের বাস্তবতা

প্রফেসর ড. মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ

প্রকাশিত: ১৮:২২, ১ মে ২০২০

টেকনাফে পাওয়া পোকার চিত্র

টেকনাফে পাওয়া পোকার চিত্র

আফ্রিকা থেকে পাকিস্তান হয়ে ভারতের দিকে ধেয়ে আসছে পঙ্গপাল। এমন আশংকার খবর গণমাধ্যমে এসেছে, এমন কী ভারতের সীমানা পেরিয়ে বাংলাদেশেও ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটাতে পারে এই পঙ্গপাল। এই বাস্তবতার মধ্যেই টেকনাফে পঙ্গপাল বিচরণের চিত্র দিয়ে সংবাদ পরিবেশন করা হয় গণমাধ্যমে। তাহলে কী পঙ্গপাল এসেই গেলো বাংলাদেশে? কীটতত্ত্ববিদ হিসেবে এই পঙ্গপালের গতিবিধি দীর্ঘদিন ধরেই পর্যবেক্ষণ করে আসছি। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই ঘটনার সত্যতা ও বাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা। 

পঙ্গপাল কী? 
পঙ্গপাল এবং ঘাসফড়িংয়ের মধ্যে কোন পার্থক্যগত শ্রেণী ভাগ নেই। বিশেষ অবস্থায় তাদের প্রজাতিরা একত্র হওয়ার যে প্রবণতা দেখায় সেটাই মূল পার্থক্য।সাধারণত পোকার ঘনত্ব যখন কম থাকে তখন পঙ্গপাল এবং ঘাসফড়িং বা গ্রাসহপার একই ধরনের ইকোসিস্টেমে থাকে। যখনই উপযুক্ত পরিবেশ পায় তখন প্রজননের মাধ্যমে তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি করে, একটি নির্দিষ্ট এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে এবং ফসলের ক্ষতি করে  থাকে যা সকলের কাছে পঙ্গপাল নামে পরিচিত। সাধারণত ৬৮০০ প্রজাতির আক্রিডিড ঘাসফড়িং বা গ্রাসহপার আছে তার মধ্যে এখন পর্যন্ত ১৯ টি প্রজাতি কে লোকাস্ট বা পঙ্গপাল হিসেবে সনাক্ত করা হয়েছে।

টেকনাফের পোকা কী পঙ্গপাল?
এই প্রজাতিটি নজরে আসার সাথে সাথে আমরা বাক্তিগত উদ্যোগে স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তার সহযোগিতায় কিছু পোকার চিত্র সংগ্রহ করি। পরে তা নিজেরা বিশ্লেষণ করি এবং আন্তর্জাতিকভাবে যারা এই ধরনের পোকা নিয়ে কাজ করেন তাদের সাথে আমরা যোগাযোগ করি। এছাড়া জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা তাদের যে ইউনিট, যারা পঙ্গপাল নিয়ে বিশ্বব্যাপী কাজ করেন তাদের কাছেও এই ছবিগুলি প্রেরণ করেন। পরবর্তীতে তথ্য উপাত্ত যাচাই করে এটাকে কফির এক ধরনের ঘাসফড়িং বা গ্রাসহপার(spotted coffee grasshopper, Aularches miliaris) হিসেবে প্রাথমিকভাবে সনাক্ত করা হয়। যে চিত্রগুলি আমারা পত্রিকায় দেখছি তা অপিরনত বা নিম্ফালস্টেজ। সচরাচর আমরা যে পঙ্গপাল বলে থাকি যা আফ্রিকা, আরব পেনিনসুলা, ইরান, পাকিস্তান ও ভারতের সীমান্ত এলাকায় পাওয়া যায় এটা সেই ধরনের না। 

প্রজাতির বিবরণ:
এই প্রজাতির অনেক গুলি উপপ্রজাতি বা সাব-স্পিসিস দক্ষিণ এশিয়ায় বিদ্যমান যা স্থানীয় আবহাওয়ার সাথে সমন্বয়ের মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। এই পোকাটি বাংলাদেশে নতুন নয়। এটি ইন্ডিয়া, বাংলাদেশ, কম্বোডিয়া, মালয় পেনিনসুলা, থাইল্যান্ড, মায়ানমার, জাভা, পাকিস্তানের কিছু অংশ, তিব্ব্ত, নেপাল এবং চীনে বিদ্যমান। 

এই পোকা বিস্তৃত আবহাওয়া বা পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়াতে পারে এবং এরা এভারগ্রিন ফরেস্ট বা ক্রান্তীয় চির সবুজ বন, জলাভূমি, পাহাড়িবন এবং উঁচু বন এ পাওয়া যায় বেশি। এটি সাধারণত সর্বভুক, তবে একটি ফসলের মারাত্মক ক্ষতিকর পোকা নয়। রাসায়নিক কীটনাশক এবং যান্ত্রিক পদ্দতিতে ডিম নষ্ট করে এদের দমন করা সম্ভব। 

একটি পুর্নাঙ্গ পোকা একটি ডিম এর পড বা আবরনে এক সাথে ৮০ টা ডিম মাটিতে পারতে পারে। সাধারনত ডিমগুলি সারি করে একটর উপরে আরেকটা সজ্জিত থাকে। একেকটা ডিম পড ৫ থেকে ৭ সেন্টিমিটার সাইজ এর হয়ে থাকে। 

অপরিণত বা নিম্ফাল স্টেজ এর পোকা এবং পুর্নাঙ্গ পোকা গুচ্ছাকারে থাকতে সাচ্ছন্দ্বোধ করে। একেকটা অপরিণত পোকা বা নিম্ফাল স্টেজ এর গুচ্ছে ৩ লাখ পর্যন্ত পোকা একসাথে থাকতে পারে যা পরবর্তীতে পুর্নাঙ্গ পোকা হিসেবে বিভিন্ন জায়গায় উড়ে যেতে পারে।এক মিটার জায়গায় ২০০০ অপরিণত বা নিম্ফাল স্টেজ এর পোকা এক সাথে থাকতে পারে। 

পুর্নাঙ্গ পোকা সাধারনত বড় আকৃতির এবং উজ্জল রঙ এর হয়ে থাকে। একটি পুরুষ পোকা ৩৭-৫৫ মিমি এবং স্ত্রী পোকা ৪৭-৬৯ মিমি লম্বা হয়ে থাকে। পুনা´ঙ্গ পোকার মাথা কালচে, বক্ষ হলুদাভ, সামনের বা উপরের পাখা সবুজ ও উপরে হলুদ দাগ থাকে। এছাড়াও এর উদরে কাল ও লাল এর ডোরাকাটা দাগ থাকে। এর  উজ্জল রঙ অন্যান্য পোকা থেকে নিজেকে রক্ষার জন্য কাজে লাগায়। 

কোন কোন ফসলের ক্ষতি করে থাকে?
এরা সর্বভুক, বিশেষ করে অপরিণত বা নিম্ফাল স্টেজ এর পোকা, যা যে কোনো চাষকৃত বা বন্য গাছকে আক্রমণ করে থাকে। এটি কফি, কলা, নারিকেল, সেগুন কাঠ, আম, এলাচ, কাসাভা, কাস্টর, দুরিয়ান, পেয়ারা, ভুট্টা, মাল্ভেরি, ধান, কোকোয়া, আখ, মরিচ, তুলা, পাত, রাবার, কাঁঠাল,  অড়হর, তিল, সরগাম, এবং পাইন গাছের একটি গৌণ পোকা। 

হুমকি প্রজাতি হিসেব স্বীকৃতি:
International Union for Conservation of Nature and Natural Resources (IUCN) এইপোকাকে Lower Risk Near-Threatened taxon for south India বা নিম্ন ঝুঁকিপূর্ণ কাছাকাছি-হুমকি সম্পন্ন শ্রেণীর পোকা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এছাড়া এই পোকাকে সতর্কতার সাথে নজরদারি করার জন্য সুপারিশ করা হয়েছে।

ব্যাবস্থাপনা:
নিবিড় পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে যাতে প্রথমেই এই পোকা সনাক্ত করে তা দমন করা যায়, বিশেষ করে যখন অপরিণত বা নিম্ফালস্টেজ এর পোকা গুচ্ছাকারে থাকে। সাবান পানি দিয়ে অপরিণত বা নিম্ফালস্টেজ এর পোকার আক্রমণ থেকে বিরত রাখ যায়। যেহেতু ডিম মাটিতে থাকে একসাথে তাই ডিম এর পড বা আবরণকে ভূমিকর্ষণ বা আবাদ এর মাধ্যমে যান্ত্রিক উপায়ে দমন করা যায়। সংখ্যা কম হলে পুর্নাঙ্গ পোকা সংগ্রহ করে তা মেরে ফেলতে হবে।সবশেষে এই কীটপতঙ্গের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাগুলির মধ্যে কীটনাশক স্প্রে এবং ডাস্ট ব্যবহার অন্যতম। 

এখানে উল্লেখ্য যে বান্দরবনে যে পোকা দেখা গিয়েছে তা দমনের জন্য সাইপারমেথ্রিন ও ক্লোরোপাইরিফস এর মিশ্রণ ব্যবহার করে অনেকটাই দমন করা হয়েছে। তবে সঠিক নজরদারির মাধ্যমে এই পোকাকে দমনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। এই পোকার প্রজনন ক্ষেত্র গুলি দ্রুত সনাক্ত করে তা ধ্বংস করতে হবে। এক্ষেত্রে কৃষি মন্ত্রনালয় এবং কৃষি সম্প্রসারন অধদপ্তর খুবই দ্রুততার সাথে কার্যকর পদক্ষেপ  গ্রহন করেছে। এছাড়াও জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এই বিষয়ে বিশেষ নজরদারি অব্যহত রেখেছে।  আতংকিত না হয়ে সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই ধরনের অনিষ্টকারী পোকামাকড় থেকে আমাদের কৃষিকে রক্ষায় কাজ করতে হবে।

লেখক: প্রফেসর ড মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ, ল্যাবরেটরি অব অ্যাপ্লাইড এন্টোমলজি এন্ড একারোলজি, কীটতত্ত্ব বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ই-মেলঃ ullahipm@bau.edu.bd