রোববার   ২৬ জুন ২০২২ ||  আষাঢ় ১১ ১৪২৯ ||  ২৬ জ্বিলকদ ১৪৪৩

ACI Agri Business

জাপানিজ মোচি ও সংস্কৃতি

তাজকিরুজ্জামান সৈকত

প্রকাশিত: ১৩:১৯, ২৬ ডিসেম্বর ২০২১

আমি পেটুক না হলেও, খাবার পছন্দ করি। খাবারের স্বাদ, গন্ধ, বর্ণ আমাকে আকৃষ্ট করে। আর এতেই বাড়ির লোকেদের ধারণা ভাল-মন্দ খাওয়াই আমার প্রধান কাজ। রান্না পারিনা, জিরো ফিগারের জন্য খাইনা, সিদ্ধ হেলদি ফুডের এমন সময়ে আমার ভবিষ্যত চিন্তা কিভাবে মজার একটা রেস্টুরেন্ট দেয়া যায়। লোকজন সেখানে খাবার খেয়ে হুমায়ুন আহমেদের গল্পের নায়কের মতো বলবে- ভাই বাবুর্চিকে ডাকেন, ওরে দেইখ্যা বকশিস দিয়া যায়। আঙ্গুল চাইট্যা খাইছি। খাবারের দেশ বাংলাদেশ। কিন্তু উপস্থাপনার বড়ই অভাব। আমরা যা দেখাই বা আমাদের বলে দাবী করি, তাদের বেশিরভাগ নিয়েই ভারত, পাকিস্থান, নেপাল এমন কি আফগানস্থানের পর্যন্ত দাবী আছে। বিরিয়ানি, পোলাও, কোরমা ইত্যাদি এমনই সব খাবার। আর জাপানে নেপালি রেস্টুরেন্টে ওই অঞ্চলের খাবার বলে সব কিছুতেই দুধ মিশিয়ে এক হযবরল অবস্থা তৈরী করেছে। পিঠা তো আমরা খাই কিন্তু বানানোর উৎসব, তাতে সবাইকে সম্পৃক্ত করার অভ্যাস দিন দিন উঠেই যাচ্ছে।

জাপানের মোচির সার্থকতা সেখানেই। আদি থেকে বর্তমান, আছেই। পিঠা হিসেবে এটাকে তারা শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। করেছে সংস্কৃতির অংশ। মেশিনে তৈরীর পাশাপাশি হাতে তৈরি করে ধরে রেখেছে এর ঐতিহ্য। গত লেখায় অনেকের আগ্রহ ছিল মোচি নিয়ে, এর স্বাদ নিয়ে। আসলে প্রকৃত মোচি স্বাদ, গন্ধহীন। চালের রঙে সাদা হয়। কিন্তু আজ জানাই স্বাদ আর বিভিন্ন রঙের মোচির বর্ণনা আর তাদের কার্যকারন।   
আগেই বলেছি মোচি শতাব্দী প্রাচীন এক ধরনের জাপানিজ চালের পিঠা। শুরুর দিকে এই পিঠা প্রথমে ঈশ্বরের প্রতি উৎসর্গ করা হত, পরে তা টুকরো টুকরো করে সৌভাগ্যের জন্য খাওয়া হত। পরে, হেইয়ান সময়কালে নববর্ষের শুরুতে মোচি খাবার প্রচলন শুরু হয়। প্রথাগতভাবে মোচি তৈরীর পদ্ধতিকে “মোচিৎসুকি” বলা হয়। এতে মোচি তৈরীর বিশেষ আঠালো চাল কে কাঠের তৈরী পাত্র উসো তে রেখে বিশাল কাঠের হাতুরি (যা কিনে নামে পরিচিত) দিয়ে পিটিয়ে মোচি বানানো হয়। জাপানে বছর শেষে এই উৎসব সারা দেশে পালিত হয় প্রধানত নতুন বছর কে স্বাগত জানানোর জন্য। এই মোচি কাগামি মোচি নামে পরিচিত। বর্তমানে নানা উৎসবে বিশেষ ধরনের মোচির ব্যবহার দেখা যায়। সময়ের পরিবর্তনে মোচি এখন চাল ছাড়াও অন্য উপাদান দিয়েও তৈরী হয়। 

দাইফুকু মোচিঃ গোলাকৃতির এই মোচির ভেতরে নরম মিষ্টি বিনের পেষ্ট দেয়া থাকে। এই মোচি তৈরীতে চালকে প্রায় গলিয়ে ফেলা হয় যতক্ষণ না এটা খুবই আঠালো হয়ে যায়। এই সময় এর মধ্যে আনকো (লাল বিনের পেষ্ট) ও শিরোআন (সাদা বিনের পেষ্ট) ভেতরে দিয়ে ইচ্ছামত আকৃতি দেয়া হয়। জাপানিজ দাইফুকু এর মানে বিশাল সৌভাগ্য। তাই সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে এই মোচি খাওয়া হয়ে থাকে। সাধারণত এই মোচি সাদা, গোলাপি অথবা কিছুটা হালকা সবুজ রঙয়ের হয়ে থাকে। হালকা গরম করলে এই মোচি নরম আর আঠালো অবস্থায় খাওয়া যায়।
শাকুরামোচিঃ হালকা গোলাপি রঙয়ের এই মোচি শাকুরামোচি নামে পরিচিত। জাপানের বিখ্যাত চেরি ফুলের রঙ সাদৃশ্য এই মোচির রঙ। ভেতরে থাকে সাদা অথবা লাল মিষ্টি বিনের হালুয়া। দাইফুকু মোচির সাথে এর পার্থক্য হলো এর বাইরের আবরণ টা কিছুটা অমসৃণ। মোচি তৈরীর সময় কিছুটা চাল কে অর্ধভাঙ্গা করে রাখা হয়। মোচির উপরে একটা লবনাক্ত শাকুরা গাছের পাতা দিয়ে মুড়ে দেয়া হয়। এই মোচি মূলত হিনামাৎসুরি (মেয়ে দিবস) তে খাওয়া হয়। তবে সারা বসন্তকালেই এই মোচি পাওয়া যায়।  

ওয়ারাবিমোচিঃ এই মোচি সারা জাপানে ডেজার্ট হিসেবে খুবই পরিচিত। নরম, জেলি সদৃশ গঠনের এই মোচি কানসাই অঞ্চলে খুবই পরিচিত। এই মোচি চালের পরিবর্তে ওয়ারাবি গাছের শর্করা থেকে তৈরী করা হয়। এই মোচিতে হালকা একটা নিজস্ব গন্ধ আছে। গরমকালে এই মোচি টোস্টেড কিনাকো (সয়াবিনের আটা) অথবা কুরোমিৎসু (আখের রস) এর সাথে খাওয়া বিষয়টি খুবই জনপ্রিয়।

বোটামোচি/ অহাগিঃ এই ধরনের মোচি এই দুই নামেই পরিচিত। আঠালো মোচির উপরে মসৃণ আর আধভাঙ্গা লালা বিনের প্রলেপ দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়। এই মোচি খাওয়া হয় প্রধানত বৌদ্ধ পূর্ণিমার সময়। বৌদ্ধ রীতিতে মৃত আত্মীয় স্বজনদের স্মরণে শরৎ এবং বসন্তকালে খাওয়া হয়ে থাকে। বোটামোচি নামটা এসেছে পিওনি (বোটানি) ফুল থেকে আর অহাগি নামটা এসেছে জাপানিজ ফুল হাগি (বুশ ক্লোভার) থেকে। বোটামোচি কিনাকো পাউডার, অয়োনোরি সামুদ্রিক পাউডার কিংবা মাচা পাউডার অথবা তিলের গুড়ো মিশিয়েও খাওয়া হয়ে থাকে। 

কুজুমোচিঃ এই মোচি জাপানিজ কুজো গাছ (জাপানিজ এরারোট- শর্করা) থেকে। ওয়ারাবি মোচির মতোই এই মোচিও গরমকালে খুবই জনপ্রিয়। কেউ কেউ কিনাকো পাউডার কিংবা কুরোমিৎসু সিরাপ দিয়ে খেয়ে থাকে। অনেক সময় মিষ্টি লালা বীনের পেষ্ট দিয়ে মুড়েও খাওয়া হয়ে থাকে। কুজুমোচি মোটেও আঠাল নয়।

কুসামোচিঃ এই মোচি আঠালো চাল আর ইয়োমোগি (জাপানিজ মুগোওয়ার্ট গাছ) দিয়ে তৈরী করা হয়। হালকা সবুজ রঙের এই মোচিতে সবুজ রঙ আনতে ইয়োমোগি পাউডার ও এই গাছের পাতার গুড়ো ব্যবহার করা হয়। এই গাছ জাপানের অনেক মিষ্টি তৈরীতে ব্যবহৃত হয়। এতেও ভেতরের হালুয়া হিসেবে মিষ্টি লাল বিন ব্যবহার করা হয়।

হিসিমোচিঃ এই মোচি ডায়মণ্ড আকৃতির চালের পিঠা। এতে তিনটা লেয়ার থাকে- গোলাপি, সাদা আর সবুজ। হিনামাৎসুরির উৎসবের সময় হিনা পুতুল এর সাথে এই মোচি উপহার হিসেবে দেয়া হয়। প্রধানত মেয়ে দিবসে এই মোচি খাওয়া হয়। তিন লেয়ারেরও বিশেষত্ব আছে। গোলাপী পাম ফুলের সাদৃশ্য প্রথম লেয়ারের মানে সুস্বাস্থ্য; সাদা লেয়ারের মানে শীতকাল- দীর্ঘ জীবন আর উর্বরতা এবং সবুজ রঙয়ের লেয়ারের অর্থ হল বসন্তকাল আর নতুন জীবন।

হানাবিরা মোচিঃ এই মোচি ফুলের মোচি নামেই পরিচিত। মূলত কিয়োটো অঞ্চলের কিছু কনফেকশনারি নববর্ষের সময় এই মোচি তৈরী করে থাকে। এই মোচির অনুষঙ্গ অনেক। গোবো বুরডোক শিকড়ের একটা ডাল, মিষ্টি সাদাবিনের সাথে মিসো এবং খুব নরম সাদা মোচি বিভিন্ন উপাদান দিয়ে ভাজ করে পরিবেশন করা হয়ে থাকে। এই মোচি অন্যদের থেকে আলাদা কারন এটা ফ্ল্যাট আকৃতির হয় আর পরিবেশনের ধরণও আলাদা। এই মোচির ভেতরের উপাদানগুলো ভেতরে দিয়ে সিল করে দেয়া হয় না। কিন্তু পাতলা নরম আবরনের জন্য ভেতরের উপাদানের গুলো বাইরে থেকে এই মোচিকে হালকা লালচে রঙে পরিণত করে। 

কিরিমোচি/ মারুমোচিঃ কিরিমোচি আর মারুমোচি দুই টা বিশেষ ধরনের মোচি যা সাধারণত শক্ত কাভারে প্যাকেটে প্যাকেট করে বাজারজাত করা হয়। আর প্রচলিত মোচির মত মিষ্টিও হয় না। কিরিমোচি ব্লক আকৃতি করে কেটে বাতাসবিহীন অবস্থায় প্যাক করা হয়। অন্যদিকে মারুমোভি গোলাকৃতির হয়। এই মোচিগুলো সহজেই মাইক্রোওভেনে গরম করে নরম করে খাওয়া যায়। অনেক সময় টোষ্ট করেও খাওয়া হয়। এই দুই মোচি খাবার সময় (বিশেষ করে নববর্ষের সময়) স্যাভোয়রি অজোনি স্যুপ অথবা উপরে মিষ্টি কন্ডিমেন্টস দিয়ে পরিবেশন করা হয়।
আমাদের দেশের পিঠার ও ব্র্যান্ডিং করা সম্ভব। ট্যুরিজম এর কথা মাথায় রেখে এর বানানোর প্রক্রিয়াগুলোকে সুন্দর করে উপস্থাপন করা গেলে অনেককেই আকৃষ্ট করা যাবে। তুলে ধরা যাবে আমাদের ইতিহাস আর ঐতিহ্যকে। বাংলাদেশ যে সুন্দর একটা দেশের পাশাপাশি নানা খাবারেও সমৃদ্ধ তাও জানানো যাবে।

লেখক: পিএইচডি গবেষক, জাপান।

Advertisement
Advertisement