শনিবার   ২২ জানুয়ারি ২০২২ ||  মাঘ ৯ ১৪২৮ ||  ১৮ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

ACI Agri Business

চিড়িয়াখানায় বাঘশাবকের মৃত্যু ও আমাদের গণমাধ্যম

ড. পূর্বা ইসলাম

প্রকাশিত: ২২:২৬, ২৯ নভেম্বর ২০২১

সাম্প্রতিক সময়ে মিরপুর চিড়িয়াখানায় দুটি বাঘ শাবকের মৃত্যু নিয়ে একটি টেলিভিশন প্রতিবেদন আমার দৃষ্টিগোচর হয়েছে। একজন প্রাণি চিকিৎসক বা ভেটেরিনারিয়ান হিসেবে বেশ কিছু বিষয়ে আমার বক্তব্য রয়েছে। 

প্রথমতঃ যে টেলিভিশনে প্রতিবেদনটি করা হয়েছে তাতে ময়নাতদন্তের ফলাফলে Trypanosomiasis এর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। Trypanosoma এক প্রকারের প্রোটোজোয়া যা আসলে মাছিবাহিত। যে Tsetse fly-এর উল্লেখ টিভি রিপোর্টে করা হয়েছে মূলতঃ সেটি পশ্চিম ও দক্ষিণ আফ্রিকাতে পাওয়া যায়। বাংলাদেশে এর অস্তিত্ব নেই। আফ্রিকাতে Trypanosomiasis এর আরেক নাম হলো Nagana বা sleeping sickness। তবে কি Trypanosomiasis নেই বাংলাদেশ কিংবা উপমাহদেশীয় দেশে? আছে, আমাদের দেশে মূলতঃ এর বাহক হলো Tabanus (Horse fly) ও Stomoxys (Stable fly) প্রজাতির দু’ধরনের মাছি। তবে বাহক (Vector) ভেদে Trypanosoma এর প্রজাতিরও (Species) ভিন্নতা রয়েছে আর সেই সাথে রয়েছে পোষক (Host) এরও ভিন্নতা। এদেশের প্রেক্ষাপটে Trypanosoma এর পোষক হলো গবাদি পশু, ঘোড়া, কুকুর, বাঘ, সিংহ, শূকর, হাতি, বানর, হরিণ, নেকড়ে, লেপার্ড প্রভৃতি প্রাণিকূল। এই প্রাণিকূলের নাম দেখে সহজেই অনুমেয় যে এদের মাঝে অনেকেরই বাস রয়েছে মিরপুর চিড়িয়াখানায়। আর এই রোগ শুধু শাবকদের জন্য হুমকি তা কিন্তু নয়, একটি প্রাপ্তবয়স্ক প্রাণিও সমান ঝুঁকিতেই থাকে। তাই একই খাঁচাতে অবস্থানের পরও দুটি শাবক আক্রান্ত হলেও মা বাঘ সুস্থ রয়ে গিয়েছে যার একটি বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা হতে পারে যে মা বাঘের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো (যদিও টিভি রিপোর্টে বলা হয়েছে যে শুধু শাবকদের এই রোগ হয়, যা সঠিক নয়)। সেক্ষেত্রে অনেকেই প্রশ্ন তুলবেন চিড়িয়াখানার অব্যবস্থাপনা ও চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে। মূলতঃ এই প্রশ্নই তুলেছেন। তাদের উদ্দেশ্যেই বলছি-
চিড়িয়াখানার মাছি নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাপনা হলো জৈবনিরাপত্তা (Biosecurity) বলয় এর অন্তর্গত। উল্লেখ্য যে, Biosecurity-তে ঘাটতি থাকলে উপরে উল্লেখিত সব প্রজাতিই এই রোগের হুমকিতে এসে যায়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে শুধুমাত্র এই দুটি শাবক ছাড়া চিড়িয়াখানায় আর কোনো প্রাণি মৃত্যুর কোনো তথ্য প্রমাণ নেই। এমনকি অন্য কোনো প্রাণি কাছাকাছি সময়ে Trypanosomiasis-এ আক্রান্ত হয়েছে বলেও কোনো রিপোর্ট নেই। তাই চিড়িয়াখানা নিয়ে অনেকের অনেক অভিযোগ থাকলেও এ ঘটনায় অব্যবস্থাপনার কথা প্রাণি চিকিৎসক হিসেবে আমার বোধগম্য হয় না।

তাহলে বাকি থাকলো চিকিৎসাতে ঘাটতির প্রসঙ্গ। আমি সঠিক জানি না কি চিকিৎসা দেয়া হয়েছিল। তবে চিকিৎসা প্রসঙ্গে যাবার আগে যে বিষয়টি সবার জানা প্রয়োজন তা হলো রোগের লক্ষণ প্রকাশের পর আসলে আরোগ্য লাভের (Prognosis) সম্ভাবনা খুব ক্ষীণ। এই অনুজীব প্রাণির শরীরে প্রবেশের ৪ দিন থেকে ৮ সপ্তাহের মাঝে সাধারণতঃ রোগের লক্ষণ প্রকাশ পায়। এই অনুজীব নিজের জীবনচক্র সম্পূর্ণ করতে পোষকের দেহের লোহিত রক্তকণিকা (RBC) ভেঙ্গে ফেলে; আর এর কারণেই মূলত পোষকের মৃত্যু ঘটে। এই রোগে আক্রান্ত মানুষের ক্ষেত্রে রক্তদানের মাধ্যমে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়; কিন্তু প্রাণির ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়া বেশ জটিল এবং আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে দুরূহও বটে। টেলিভিশন রিপোর্টে চিকিৎসকের যে গাফিলতির কথা বলা হয়েছে তা কিসের ভিত্তিতে! প্রমাণের দাবী রাখে বৈকি। কেননা পুরো রিপোর্টটিতে কোনো ভেটেরিনারিয়ানের মতামত গ্রহণ করতে দেখলাম না। একজন চিকিৎসক কিংবা ভেটেরিনারিয়ানের মতামত না নিয়ে কিসের ভিত্তিতে এত বড় অভিযোগ আনা হলো তা অস্পষ্টই রয়ে গেছে যা কিনা রিপোর্টটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

শুধু তাই নয়, বিশেষজ্ঞ মতামত হিসেবে যাদের মতামত নেয়া হয়েছে তাঁদের কারোরই কি রোগের pathogenesis, চিকিৎসা কিংবা prognosis সম্পর্কে ধারণা আছে? কেননা বিশেষজ্ঞ হিসেবে যে দুজনের বক্তব্য নেয়া হয়েছে তাঁদের একজন প্রাণিবিদ্যায় পিএইচডি এবং অন্যজন পাখিবিদ্যায় পিএইচডি। বন্যপ্রাণি নিয়ে গবেষণা আর চিকিৎসা সম্পূর্ণ দুই ধারা। পৃথিবীর কোথাও বন্যপ্রাণি কিংবা গৃহপালিত প্রাণির চিকিৎসা ভেটেরিনারিয়ান ছাড়া আর অন্য কোন পেশার কাকে দিয়ে করাতে হবে তা যদি সম্মানিত শিক্ষক মহোদয় জানাতেন বাধিত হতাম। ওনার গবেষণার আগ্রহ নিয়ে লিখেছেন প্রাণির আচরণ/ব্যবহার, বন্যপ্রাণি সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা এবং বন্যপ্রাণি জীববিদ্যা। কোথাও গিয়ে প্রাণিচিকিৎসার সাথে কোনো প্রকারের সংশ্লিষ্টতা পেলাম না। একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক উপরন্তু গবেষক, ভেটেরিনারিয়ান সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান রাখেন বলেই আমার বিশ্বাস। শুধু তাই নয়, অন্য একটি পেশার প্রতি শ্রদ্ধাও পোষন করবেন এটা আশা করাও খুব বেশি চাওয়া হবে না। কিন্তু  দুঃখের সাথে লক্ষ্য করলাম যে, উনি শুধু একটা পেশা সম্পর্কে তাচ্ছিল্য প্রদর্শনই করলেন না, নিজের হীনমন্যতাও জানান দিলেন সগর্বে; সেই সাথে অজ্ঞতাও। ড. নূরজাহান সরকার ম্যাডাম, আপনি নিজেকে যেভাবে ইচ্ছে সেভাবে অন্যের সামনে উপস্থাপন করতেই পারেন, তাতে কিচ্ছু যায় আসে না আমাদের। কিন্তু আপনি একটি পেশা নিয়ে বলতে পারেন না যে “গরু-ছাগলের ডাক্তারগুলো (!!!)”। আপনি না বাংলা জানেন, না বন্যপ্রাণির চিকিৎসা জানেন, না ভব্যতা জানেন!!!!  মানুষ কখনো “গুলো” হয় না, যেকোনো চিকিৎসা কারা করে একটু আগেই লিখেছি আর আপনার অভিব্যক্তি আর ভাষাই বলে দেয় আপনার ভব্যতা। অনুগ্রহ করে আপনার বক্তব্য প্রত্যাহার করুন। 

এবার আসি রিপোর্টের সবচেয়ে গুরুতর এবং স্পর্শকাতর অংশে, ডাঃ নাজমুল হুদার বিষয়ে অভিযোগ উত্থাপন প্রসঙ্গে। সরকারি চাকুরিতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ব্যতীত কথা বলা যে আইন বিরুদ্ধ এটা কি রিপোর্টার মহোদয় জানেন না নাকি জেনেও খবরকে আরো মুচমুচে করার জন্য একজন সুপ্রতিষ্ঠিত ভেটেরিনারিয়ানকে বিতর্কিত করার চেষ্টা? যেখানে চিড়িয়াখানার প্রধান নিজে বক্তব্য দিয়েছেন সেখানে ডাঃ নাজমুলকে কল দিয়ে ধরছেন না এমন ভিডিও কিংবা অভিযোগ প্রমাণিত হবার আগেই তাঁর ছবি কর্তব্যে অবহেলার খবর এভাবে প্রকাশের এখতিয়ার রিপোর্টার মহোদয় রাখেন তো? 

ডাঃ নাজমুল হুদা, যিনি দীর্ঘদিন ধরে চিড়িয়াখানাতে কর্মরত আছেন চিকিৎসক হিসেবে। শুধু তাই নয় বাংলাদেশের প্রতিটি ভেটেরিনারি বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা কলেজের ছাত্ররা তাদের শিক্ষাজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে তাঁর তত্ত্বাবধানে চিড়িয়াখানাতে প্রশিক্ষণ নিয়ে থাকেন। এমনকি একটা দীর্ঘ সময় ইন্টার্নশিপও করে থাকেন দেশের প্রতিটি ভেটেরিনারি ছাত্র। এই করোনাকালীন সময়েও ডাঃ নাজমুল হুদা একজন সরকারি কর্মকর্তা হওয়া সত্ত্বেও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুরোধে অফিস টাইমের বাইরেও (এমনকি সন্ধ্যাতেও- পারিবারিক অনুষ্ঠান বিসর্জন দিয়ে) ছাত্রদের পাঠদান করাতেন। Zoo animal heath এর উপর তাঁর গবেষণা প্রবন্ধ রয়েছে ও মাস্টার্সের ছাত্র সুপারভাইজ করেছেন। আরো কিছু গবেষণার কাজ অর্থপ্রাপ্তির জন্য জমা দেয়ার পথে। বর্তমানে তিনি কাজ করছিলেন চিড়িয়াখানার আধুনিকায়নের উপর। তিনি আন্তর্জাতিক Wild Life ও Zoo animal এর বিভিন্ন সংস্থার সদস্যও বটে। একজন ডাঃ নাজমুল হুদা তৈরি হতে সময়, শ্রম আর নিষ্ঠার প্রয়োজন হয়। প্রয়োজন হয় পেশার প্রতি ভালোবাসার। সাধারণভাবে প্রাণির চিকিৎসা কিংবা বন্যপ্রাণির চিকিৎসার সাথে Zoo animal এর চিকিৎসার পার্থক্য বিস্তর। কেননা বন্দী জীবনে চিকিৎসা আর মুক্ত জীবনে চিকিৎসা বা ব্যবস্থাপনা এক নয়। চিড়িয়াখানার প্রতিটি প্রাণির স্বভাব চরিত্র থেকে শুরু করে তাদের জীবন বৃত্তান্ত বলে দিতে পারেন এই ডাঃ হুদা। এহেন ব্যক্তিকে নিয়ে প্রশ্ন তোলার আগে সবাইকে বলবো, আপনি নিজের কাজটা সঠিকভাবে জানেন তো? বলতে পারবেন তো কি করছেন? ডাঃ হুদা জানেন উনি কি করছেন। আমি জানি ডাঃ হুদাকে, কেননা তিনি ছাত্রজীবনে বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার অগ্রজ ছিলেন এবং যুক্তরাজ্য থেকে ফেরার পর চিড়িয়াখানা এবং বন্যপ্রাণি নিয়ে গবেষণায় আমার আগ্রহের জন্য বহুবার তার সাথে আমার যোগাযোগ হয়েছে। প্রতিবারই দেখেছি তাঁর একাগ্রতা এবং চিড়িয়াখানা নিয়ে আরো কিছু করার আগ্রহ। তাই আমার কাছে ডাঃ হুদার কর্তব্যে গাফিলতি নিয়ে কেউ কিছু বললে সত্যিই মানতে বেশ কষ্ট হবে। আর এই ব্যাপারে তো নয়ই যখন আমি নিজে জানি এই রোগের আদ্যপান্ত। 

হলুদ সাংবাদিকতাও সাংবাদিকতা - আমাদের ভাষায় হেপাটাইটিস জার্নালিজম। চাইলেই একটি পেশা কিংবা একজন ব্যক্তিকে বিতর্কিত করে দেয়া যায়। একজন ডাঃ নাজমুল হুদা যেমন সহসাই তৈরি করা যায় না; তেমনি একটি পেশাকেও অসম্মান করে এভাবে কোনো রিপোর্ট প্রকাশ করা যায় না। জানি না কিসের এত দ্বেষ এই পেশার প্রতি?! ...... তবে এই অসঙ্গতিপূর্ণ রিপোর্ট এর বিরুদ্ধে অচিরেই ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। তা নাহলে একের পর এক খেলা চলতেই থাকবে।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, ফার্মাকোলজি বিভাগ, ভেটেরিনারি অনুষদ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ।

Advertisement
Advertisement