শুক্রবার   ০৭ আগস্ট ২০২০ ||  শ্রাবণ ২২ ১৪২৭ ||  ১৭ জ্বিলহজ্জ ১৪৪১

ACI Agri Business

চলতি মৌসুমে আমের বহুবিধ সমস্যা ও সম্ভাব্য কারণসমুহ

ড. মো.শরফ উদ্দিন

প্রকাশিত: ০১:৩৯, ৮ জুলাই ২০২০

ফলের রাজা আম। স্বাদে, গন্ধে ও বৈচিত্রময় ব্যবহারের কারণেই আমকে ফলের রাজা বলা হয়। সকল মৌসুমি ফলের মধ্যে এ দেশের সবচেয়ে বেশি মানুষের পছন্দনীয় ফল আম। ছোট-বড় সকলেই পছন্দ করেন এই ফল, থাকেন মধুমাসের অপেক্ষায়। করোনার কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য, জীবন-যাপন, রাজনীতি, অর্থনীতি সবকিছুতেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। কিন্তু এই আমের বাজারে নূন্যতম প্রভাবও ফেলতে পারেনি। 

আমের মৌসুম শুরুর পর থেকে এই পর্যন্ত বাজারে আসা প্রত্যেকটি আমে ভাল দাম পেয়েছেন চাষীরা। আম্ফানের কারণে যে পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি হয়েছিল তার অনেকটিই কাটিয়ে উঠেছেন আমচাষীরা। 

তবে ভোক্তা পর্যায়ে আমের স্বাদ ও গুণগতমান নিয়ে নানা প্রশ্ন এসেছে এই মৌসুমে। প্রথমত: আম ভালভাবে পাকছে না। বোটা পচে যাচ্ছে সংগ্রহের ২/৩ দিন পর থেকেই। আবার কোন কোন জাতে এ্যানথ্রাকনোজ রোগ দেখা গেছে তুলনামুলক বেশি। দ্বিতীয়ত: আমের স্বাদ কম। 

আমের গুণগতমান ভাল রাখতে মাটি ও বিরাজমান আবহাওয়া গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখে। আমের ফুল ফোটা থেকে আম সংগ্রহ করা পর্যন্ত প্রত্যেকটি ধাপে আবহাওয়া আমের গুণগতমানকে প্রভাবিত করে। মুকুল ফোটা থেকে শুরু করে আম সংগ্রহ করা পর্যন্ত আবহাওয়া শুষ্ক হওয়া ভাল। আমের মুকুল ফোটার সময় ঘন ঘন বৃষ্টি হলে আমের ফল ধারণ কমে যায় এবং আমে রোগ ও পোকার আক্রমণ দেখা যায়। তবে ফল ধারণ সম্পন্ন হলে হালকা বৃষ্টি আমের বৃদ্ধিতে সহায়ক ভুমিকা পালন করে। আবার ফল পরিপক্ক হবার এক থেকে দেড় মাস পূর্বের আবহাওয়া শুস্ক হলে আমের স্বাদ বেড়ে যায়। 

এই মৌসুমে গোপালভোগ, খিরসাপাত/হিমসাগার এবং ল্যাংড়া আম সংগ্রহের পূর্বের পুরো সময় বৃষ্টি হয়েছে। ফলে আমগুলো পর্যাপ্ত রৌদ্রউজ্জ্বল আবহাওয়া পায়নি। আম সংগ্রহের পূর্বে বাগান ব্যবস্থাপনায়ও ঘাটতি ছিল যথেষ্ট। এছাড়াও ২/৩ দিন বৃষ্টির পর যে দিন বৃষ্টি হয়নি বা দিনের প্রথমভাগ বৃষ্টিমুক্ত ছিল তখন আম পাড়া শুরু করেছেন। আবার কেউ কেউ আম সংগ্রহ করতে করতেই বৃষ্টির সম্মুখীন হয়েছেন। ফলে আম পাড়ার পর ভালভাবে শুকানোও সম্ভব হয়নি। এরপর আমগুলোকে প্যাকেটবন্দী করে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে অথবা অন্য পরিবহনের মাধ্যমে দূরদূরান্তে পৌঁছানো হয়েছে। পরিবহনের সময় কাভার্ড ভ্যান বেশি ব্যবহার করা হয় এবং ট্রাকে পরিবহনের ক্ষেত্রে ত্রিপল ব্যবহার করা হয়। ফলে ভিতরে তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা দুইই বেড়ে যায়। এর ফলে আমের রোগ যেমন বোটা পচা ও এ্যানথ্রাকনোজ হওয়ার প্রবণতা বেড়ে যায়। এবং বাড়িতে রাখার পর দ্রুত পঁচে যায়। 

আম সংগ্রহ করার পর সংগ্রহকাল যত বেশি হবে আমের মিষ্টতা তত বাড়বে। এই মৌসুমে আম পচে যাওয়ার কারণে বেশি দিন ঘরে রাখা সম্ভব হয়নি। কোন কোন ক্ষেত্রে দেখা গেছে, বৃষ্টিমুক্ত দিন খুজে পাওয়া কষ্ঠকর। ফলে যেদিন আকাশ একটু ভাল মনে হয়েছে সেই দিনই চাষী গাছের কাচা-পরিপক্ক আম এক সাথে সংগ্রহ করেছেন। পরিপক্ক ও অপরিপক্ক আম একসাথে তাড়াহুড়ো করে সংগ্রহ করার ফলে কিছু  আমে টক-মিষ্টিভাব লক্ষ্য করা গেছে।

তবে বর্তমানে বৃষ্টির পরিমাণ একটু কম এবং রৌদ্রউজ্জ্বল আবহাওয়া ফিরে এসেছে, ফলে ধারণা করা হচ্ছে আগামী দিনগুলোতে বাজারে আসা ফজলি, আম্রপালিসহ অন্যান্য জাতগুলো সুস্বাদু হবে।

করণীয়:

১. গরম পানিতে আম শোধন করে ভালভাবে শুকিয়ে বাজারজাত করলে বোটা পঁচা ও এ্যানথ্রাকনোজ রোগের প্রার্দুভাব কমে আসবে এবং সংরক্ষণকাল বাড়বে। তবে গরম পানিতে আম শোধনের ব্যবস্থা না থাকলে ২/৩ দিন পর্যাপ্ত রোদ পাওয়ার পর আম সংগ্রহ করতে হবে।
২. সঠিকভাবে পরিপক্ক আম রৌদ্রউজ্জ্বল আবহাওয়ায় সংগ্রহ করতে হবে।
৩. বৃষ্টির দিনে কোনভাবেই আম সংগ্রহ করা যাবে না।
৪. আম পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত কাভার্ড ভ্যান, ট্রেনের বগিতে পর্যাপ্ত ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা থাকতে হবে।
৫. বৃষ্টিবহুল এ দেশে বাণিজ্যিকভাবে আম উৎপাদনে ব্যাগিং প্রযুক্তিটির ব্যবহার করলে আমের গুনগতমান ভাল হবে।
 

লেখক: উর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, জয়দেবপুর, গাজীপুর।

Advertisement
Advertisement