শুক্রবার   ০৭ আগস্ট ২০২০ ||  শ্রাবণ ২২ ১৪২৭ ||  ১৭ জ্বিলহজ্জ ১৪৪১

ACI Agri Business

ক্যাডার সমন্বয়হীনতা: টেকনিক্যাল গ্রাজুয়েটরা সাধারণ ক্যাডারে

মুহাম্মদ মকবুল হোসেন

প্রকাশিত: ১০:২৮, ৮ জুলাই ২০২০

অতি সম্প্রতি ৩৮ তম বিবিএস এর নিয়োগের জন্য বিভিন্ন ক্যাডারের সুপারিশ করা হয়েছে। বিভিন্ন মাধ্যমে বহুল আলোচিত হচ্ছে এরকম একটি খবর “পররাষ্ট্র ক্যাডারের ২৫ জনের মধ্যে প্রকৌশলী ১০ জন, ডাক্তার ০৮ জন এবং কৃষিবিদ ০২ জন”। বিষয়টি সবার জন্য ভাববার বিষয়। কেন টেকনিক্যাল গ্রাজুয়েট এত কষ্ট করে, এত এত টেকনিক্যাল বিষয় পড়াশুনা করে তাদের স্বপ্নের স্থান ছেড়ে অন্য ক্যাডারে যাচ্ছে। অদৌও আমাদের দেশে টেকনিক্যাল গ্রাজুয়েটবৃন্দ যথাযথ মার্যাদা পাচ্ছে ? বর্তমান করোনা কালীন সময়ে সবার কাজের গুরুত্ব বিবেচনা করার পুনরায় ভাবার সময় এসেছে। বিষয়টি নিয়ে সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষকে ভাবতে হবে। মাননীয় কৃষিমন্ত্রী সন্মুখে থেকে যেভাবে কৃষিবিদ ও কৃষকদের পরিচালনা করছেন অন্য কোন মন্ত্রীকে আমরা এত তৎপর হতে দেখিনি। কোন কোন মন্ত্রীতো বাসা হতেই বের হননি। আর কেউ কেউ চিকিৎসার জন্য বিদেশ গমন করেছেন।

কোস স্ট্যাডি-১: জনাব মোঃ আজহার হোসেন, পিতাঃ মোঃ আলতাফ হোসেন, থানা-রানীশনকৈল, জিলাঃ ঠাকুরগাঁও, থানার মধ্যে সবচেয়ে মেধাবী বলে পরিচিত ছিল। এলাকার সবার কাছে তার স্কুলের প্রধান শিক্ষক বলত আজাহার ইনশাল্লাহ ডাক্তার হবে। এলাকাবাসীর সেবা করবে এবং এলাকার মুখ উজ্জ¦ল করবে। আহজার ডাক্তার হয়েছিল ঠিকই কিন্তু তাকে আজীবন কাজ করতে হয়েছে তুলনামূলক কম মেধাবীদের নিয়ন্ত্রনে থেকে।

কোস স্ট্যাডি-২: জনাব মোঃ আপেল মাহমুদ, পিতাঃ মোঃ জামাল মাহমুদ  থানাঃ রানী শনকৈল  জিলাঃ ঠাকুরগাঁও এর মোটামুটি মেধাবী হিসাবে পরিচিত ছিল। নিয়মিত স্কুল ফাঁকি দিত। এইচ এসসি পরীক্ষার পর খুব মনোযোগ দিয়ে পড়া লেখা করে এ দেশের সবচেয়ে বড় একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শনে ভর্তি হন। পরবর্তীতে আজহারের সাথে বিসিএস পরীক্ষায় অংশ গ্রহন করে প্রশাসন ক্যাডার উত্তীর্ন হন। 
    
মোঃ আজহার হোসেন এবং মোঃ আপেল মাহমুদ একই বিসিএস পরীক্ষার উত্তীর্ন হয়ে কাজে যোগদান করেন কিন্তু ১৭ বছর চাকুরী জীবন অতিবাহিত করার পর দেখা গেল প্রভাব প্রতিপত্তি ও সামাজিক মর্যাদায় ডাক্তার মহোদয়ের চেয়ে প্রশাসনের কর্মকর্তা অনেক এগিয়ে। এলাকায় গেলে ডাক্তাার সাহেবের কেউ খোঁজ না নিলিও সচিব সাহেবের খোঁজ সবাই রাখে।
   
কেস ষ্ট্যাডি -৩ : মোঃ রাকিব হাসান, পিতা- মোঃ জায়েদুল হাসান অত্যন্ত মেধাবী বলে হতদরিদ্র ঘরের ছেলেটি স্কুলে সামর্থ্যরে বাইরেও বিজ্ঞান পরে। ক্রমে ক্রমে ফানিত মেধার ফলস্বরুপ বাংলাদেশের সবচেয়ে ভাল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) সিভিল বিভাগে ভর্তি হয় এবং শিক্ষা জীবন শেষ করে  বিসিএস পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করে একজন প্রকৌশলী হিসেবে যোগদান করে।

কেস ষ্ট্যাডি- ৪: মোঃ সাইফুল ইসলাম, পিতা- মোঃ আমিনুল ইসলাম অত্যন্ত মেধাবী। বুয়েটে ভর্তি পরীক্ষায় চান্স পায়নি। ডাক্তার হবার আগ্রহ না থাকায় বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি হয়। লেখাপড়া শেষ করে বিসিএস পরীক্ষায় অংশ গ্রহন করে কিন্তু প্রথম পছন্দ প্রশাসন থাকলে কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা হিসেবে সুপারিশ প্রাপ্ত হয়ে কাজে যোগদান করে।

দুইজন বিশেষায়িত ডিগ্রিধারী বিশেষায়িত পদে চাকুরী করে সামাজিক, পদাধিকার ও অন্যান্য সুবিধা পাওয়ার কথা তার থেকে কম পাচ্ছে। পদোন্নতি যেভাবে হবার কথা সেভাবে হচ্ছে না। পদোন্নতির জন্য ফাইল প্রসেস করলে বলে পদ খালি নাই কিন্তু বিশেষ বিশেষ পদের ক্ষেত্রে পদ না থাকলেও পদোন্নতি প্রদান করা হয়। তাই বিশেষায়িত ডিগ্রিধারী শিক্ষার্থীরা চাকুরীর ক্ষেত্রে বর্তমানে বিশেষায়িত পদে চাকুরী করতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। তবে যথাযথ মেধার যদি মুল্যায়ন হত তবে বিশেষায়িত ডিগ্রিধারীরা বিশেষায়িত পদে চাকুরী করত এবং উক্ত স্থানে চাকুরী করে স্বাচ্ছন্দ বোধ করত এবং মেধার মূল্যায়ন হত। আমাদের দেশে প্রকাশিত যারা মেধাবী তারা প্রকৌশলী, ডাক্তারী ও কৃষিবিদ হিসেবে লেখাপড়া করে থাকে কিন্তু চাকুরী জীবনে যথাযথ মেধার মূল্যায়ন না পেয়ে তারা সাধারন ক্যাডারের দিকে ধাবিত হচ্ছে।

বিষয়টি সরল সাধারন দৃষ্টিতে দেখলে একটি সাধারন উত্তর পাওয়া যাবে। আমাদের দেশের অভিভাবক, শিক্ষক শিক্ষিকাবৃন্দ সবচেয়ে মেধাবী প্রমানীত সন্তানকে ছোটবেলা হতে নির্বাচন করে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার অথবা কৃষিবিদ বানাবে। কিছু ব্যতিক্রম থাকতে পারে। পেশা বেছে নেয়ার অধিকার সবার আছে। আপন পেশা ছেড়ে কেউ যদি অন্য পেশায় তার মেধাকে বিকশিত করতে পারে সময়ের দাবীতে আমরা এখানে দোষের কিছু দেখি না। মেধাবীরা তাদের মেধা দিয়ে সর্বোচ্চ সুবিধা ও সম্মানিত জায়গায় যাবে এটাই স্বাভাবিক। বর্তমানে কোটাবিহীন বিসিএস এ ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার ও কৃষিবিদদেও জন্য মেধা বিকাশের আরো একটি সুবর্ণ সুযোগ। 

মাওলানা জালাল উদ্দীন রুমীর বাঁশের বাশির ঘটনা সবার অবগতির জন্য লিখছি--বাঁশ ঝাড় হতে বাঁশ কেটে বাঁশি বানানো হয় এতে বাঁশের ঝাড় ছাড়ার কষ্ট থাকে কিন্তু তার হতে যখন সুর বের হয় তাও বাঁশির জন্য একটি স্বান্তনা। ডাক্তার, প্রকৌশলী ও কৃষিবিদরা যখন তাদের পেশা ছেড়ে মেধার জোড়ে, সময়ের চাহিদা ও সম্মানের জন্য অন্য পেশায় যায় এতে তাদের কষ্ট হয় কিন্তু নিজের ভালোর জন্য দৃশ্যমান পরিস্থিত বিবেচনায় যেতে বাধ্য হয় এতে বিশেষায়িত ডিগ্রিধারীদের জন্য ব্যয়িত অর্থ অন্যদিকে চলে যায়। হয় এটি বন্ধ করতে হবে অথবা সর্ব জায়গায় সমান মর্যাদা প্রদান করতে হবে।

লেখক: কৃষিবিদ ও পর্যটক ।

Advertisement
Advertisement