সোমবার   ০১ জুন ২০২০ ||  জ্যৈষ্ঠ ১৭ ১৪২৭ ||  ০৯ শাওয়াল ১৪৪১

কৃষি শিক্ষায় ও ফলাফলে বাকৃবিতে এগিয়ে যাচ্ছেন কৃষি কন্যারা

আবুল বাশার মিরাজ, বাকৃবি

প্রকাশিত: ০০:১১, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮

শিক্ষা, গবেষণা, উদ্ভাবন আর সময়োপযোগী প্রযুক্তির আবিষ্কারে ছেলেদের সঙ্গে সমান তালে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) মেয়ে শিক্ষার্থীরা। ফসলের মাঠ বা কর্ম ক্ষেত্রে কোথাও তারা এখন পিছিয়ে নেই। কৃষির নতুন জাত উদ্ভাবন, উৎপাদন বৃদ্ধি, পশু প্রজনন, ফসল ও মাছের জাত উন্নয়নে তারা সফলতার সঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছে। উপমহাদেশের কৃষি শিক্ষার শ্রেষ্ঠ এবং পৃথিবীর অন্যতম সেরা বিদ্যাপীঠ বাকৃবিতে ছাত্রদের অনুপাতে ও সাফল্যের মুকুট পরে ছাত্রীদের দাপিয়ে বেড়ানোই প্রমাণ করেছে কৃষি শিক্ষায় এখন কৃষি কন্যাদের রাজত্ব কায়েম হতে চলেছে।

এখানকার প্রতিটি ছাত্রীই কৃষি শিক্ষায় তাদের মেধার স্বাক্ষর রাখছে। পশুপালন, পশু চিকিৎসা, কৃষি প্রকৌশল, মৎস্যবিজ্ঞান ও কৃষি অর্থনীতিসহ মোট ছয়টি অনুষদের ৪৩টি বিভাগের প্রতিটিতেই তারা কাজ করছে। প্রতিটি অনুষদেই ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা এখন প্রায় সমানে সমান। শ্রেণি পরীক্ষার (সেমিষ্টার ফাইনাল পরীক্ষা) ফলাফলের দিকে তাকালে দেখা যায় মেধাতালিকার অর্ধেকের বেশিই দখল করে আছে ছাত্রীরা। অনুষদের সেরা পাঁচের ফলাফলের দিক দিয়ে মেয়েরাই এগিয়ে। এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষিকার সংখ্যাও বাড়ছে উল্লেখযোগ্য হারে। ভেটেরিনারি, কৃষি, ফিশারিজ, পশুপালন, কৃষি অর্থনীতি ও গ্রামীণ সমাজ বিজ্ঞান, কৃষি কৃকৌশল ও কারিগরী অনুষদ এবং ফুড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে আনুপাতিক হারে বেড়েছে ছাত্রী সংখ্যা।

ভাল ফলাফল করা জন্য মেয়েরা রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী পদক থেকে শুরু করে সর্বক্ষেত্রে সফল হচ্ছেন তারা। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা পেশা থেকে শুরু করে বিসিএস, বিএডিসি, বিআরআরআই, বিএআরআই, এসআরডিআইসহ বিভিন্ন সরকারি কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, সরকারি বেসরকারি ব্যাংক, এনজিও, কোম্পানি, চা-বাগান, আখ, পাট গবেষণা প্রতিষ্ঠানে সাফল্যের সাথে কাজ করছে।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণ পদক-২০১৭ পেয়েছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) ছয় অনুষদের মোট ছয় শিক্ষার্থী। স্বর্ণ পদক পাওয়া ৬ জনই ছিলেন ছাত্রী। 

বাকৃবির কৃষি প্রকৌশল ও কারিগরি অনুষদের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী চিত্রা রাণী পাল বলেন- ‘কৃষি শিক্ষায় মেয়েদের অনেক বাধ্যবাধকতা আছে। কিন্তু তা স্বত্বেও আমরা যথেষ্ট পারদর্শিতার সঙ্গে শিক্ষা অর্জন করে যাচ্ছি। শুধু তাই নয়; বর্তমানে মেয়েরা কৃষি ক্ষেত্রে দেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সফলতার সঙ্গে কাজ করছে।’ উন্নত দেশের মত আমাদের দেশেও মেয়েরা এনজিও থেকে শুরু করে মার্কেটিং পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরে সফলভাবে কাজ করে যাচ্ছে, বলেন চিত্রা রাণী। 

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. সচ্চিদানন্দ দাস চেীধুরী বলেন, ‘কৃষি শিক্ষার পাশাপাশি কৃষিকন্যারা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন পর্যায়ের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, খেলাধুলা, স্কাউটিং, বিএনসিসি, বাঁধনে স্বেচ্ছাসেবক ও অন্যান্য কর্মকাণ্ডে ব্যাপক অবদান রাখছে।’ আন্ত:বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিযোগিতায় এ বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েরা বিভিন্ন খেলায় বেশ কয়েকবার বিশেষ কৃতিত্ব অর্জন করেছে। স্কাউটিংয়ে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েদের যথেষ্ট সুনাম রয়েছে। কৃষি বিষয়ে স্কলারশিপ নিয়ে বিদেশে পড়াশোনার ক্ষেত্রেও রয়েছে তাঁদের সাফল্য।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আলী আকবর বলেন, কিন্তু একটা সময় ছিল যখন লোকে মনে করতো, কৃষি শিক্ষা পড়বে ছেলেরা, মেয়েরা পড়বে গার্হস্থ্য বিজ্ঞান। বর্তমানে এ ধারণার পরিবর্তন এসেছে। কৃষি ক্ষেত্রে এবং কৃষি শিক্ষার ক্ষেত্রে এখন ছাত্রীদের জয়জয়কার। তিনি আরো বলেন, “কৃষির সূচনা মেয়েরাই করেছিল। গবেষণা ও নতুন নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবনে কৃষিকন্যাদের অংশগ্রহণ তারই প্রতিফলন। তাঁদের মাধ্যমে দেশের কৃষির সাফল্য আরো ত্বরান্বিত হবে।”

বাকৃবি সূত্রে জানা গেছে, ১৯৬১ সালে প্রতিষ্ঠার পর দেশের একমাত্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) পথচলা শুরু। কিন্তু ১৯৭৩ সালের আগে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে মেয়েরা উচ্চ কৃষি শিক্ষার সুযোগ পায়নি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রী ভর্তি শুরু হয়। কিন্তু কথার মতো সহজ ছিল না ছাত্রী ভর্তি। এ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছে। এক পর্যায়ে ছাত্র নেতৃবৃন্দকে আন্দোলনে নামতে হয়েছিল। 

বাকৃবির তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম আমিরুল ইসলাম ছাত্রী ভর্তির প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন। ১৯৭২ সালে তত্কালীন উপাচার্য অধ্যাপক ড. মছলেহ উদ্দিনের সময়কালে ১৯৭১-১৯৭২ শিক্ষাবর্ষে ছাত্রদের পাশাপাশি ছাত্রীদের ভর্তি শুরু হয়। সে সময় ছাত্রী সংখ্যা ছিল হাতে গোনা কয়েকজন মাত্র। ১৯৭৩-৭৪ সালে বাকৃবিতে মাত্র ১৭ জন মেয়ে শিক্ষার্থী থাকলেও সময় পরিক্রমায় আজ তা বেড়ে প্রায় ৩ সহস্রাধিক। আগে মেয়েদের জন্য মাত্র একটি হল থাকলেও বর্তমানে ৪ টি পূর্ণাঙ্গ হল রয়েছে। তবে চাহিদার তুলনায় মেয়েদের হলের সংখ্যা এখনও অপ্রতুল। 

অনুষদের ডিনদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, সুদূর বগুড়া, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, রংপুর, খুলনা, পিরোজপুর, নোয়াখালী, বরিশাল, চট্রগাম, কুমিল্লা­, পাবনা, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, সিলেট, রাজশাহী, ভোলাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আগত কৃষিকন্যাদের পদচারণায় মুখরিত এ ক্যাম্পাস। এছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকেও মেয়েরা এ বিশ্ববিদ্যালয়ে আসে। 

সংস্কৃতি জগতেও পিছিয়ে নেই কৃষিতে পড়ুয়া মেয়েরা। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র, পদচিহ্ন, উদীচী, অঙ্কুর, ত্রিভুজ, নাট্য সংঘ, কম্পাস নাট্য সম্প্রদায়, চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, খেলাধুলা, স্কাউটিং সবখানেই তাঁদের উপস্থিতি ও অংশগ্রহণ প্রশংসার যোগ্য। 

মেয়েদের এগিয়ে যাওয়ার এ চিত্রটি শুধু বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়েই নয়, দেশের অনান্য বিশ্ববিদ্যালয় যেমন- শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যামিমেল সায়েন্স বিশ্ববিদ্যালয়সহ কৃষির উচ্চ প্রতিষ্ঠানগুলো কৃষিবিদ তৈরি করার গুরু দায়িত্ব পালন করছে। এসব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতি বছর বের হয়ে আসছে হাজার হাজার নারী কৃষিবিদ।

বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) ২০১৭ সালের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট ৬ হাজার ৭শত ৬০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ২ হাজার ৮শত ১৯ জন ছাত্রী অথ্যাৎ (শতকরা প্রায় ৪২ভাগ ছাত্রী), নারী শিক্ষক ১ শত ১৭ জন (শতকরা প্রায় ২০ভাগ)। শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট ৩হাজার ৩শত ১০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ১হাজার ৪শত ৫৯ জন ছাত্রী অথ্যাৎ (শতকরা প্রায় ৪৪ভাগ ছাত্রী), নারী শিক্ষক ৬৭ জন (শতকরা প্রায় ৩০ভাগ)। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট ১হাজার ৩শত ৬১ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৭ শত ১ জন ছাত্রী অথ্যাৎ (শতকরা প্রায় ৫২ভাগ ছাত্রী), নারী শিক্ষক ৪৬ জন  (শতকরা প্রায় ২৪ভাগ)। 

এ পরিসংখ্যান থেকেই বুঝা যাচ্ছে-কৃষি শিক্ষায় নারীদের অংশ গ্রহণ বেড়েই চলছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নারী শিক্ষক নিয়োগে অনিহার কথা শোনা গেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ বিষয়ে তারা বলেন, কর্তৃপক্ষের অনীহার কারণে অনেক সময়ই তারা বাদ পড়ে যাচ্ছেন। এ বিষয়ে তারা প্রধানমন্ত্রীর সুদৃষ্টি কামনা করেছেন তারা।