বৃহস্পতিবার   ২৪ অক্টোবর ২০১৯ ||  কার্তিক ৮ ১৪২৬ ||  ২৪ সফর ১৪৪১

কৃষিপণ্য রপ্তানির সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারছে না বাংলাদেশ

বিশেষ প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১২:০৭, ২৪ অক্টোবর ২০১৮

উৎপাদনে নীরব বিপ্লব ঘটলেও রপ্তানির সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারছে না বাংলাদেশ। ব্যবসায়ী ও রপ্তানিকারকদের অভিযোগ অবকাঠামোগত সুবিধার অভাব এবং সরকারের সঠিক সিদ্ধান্ত না পারাটা এর অন্যতম কারণ।

গত মার্চে কৃষি মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির কাছে পেশ করা কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ২০১৩-১৪ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে আলু রপ্তানির পরিমাণ ছিল ১ লাখ ২ হাজার ৯৮৩ টন। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে রপ্তানি কমে যায় অর্ধেকের বেশি: সে বছর মাত্র ৪০ হাজার ২২৯ টন আলু রপ্তানি হয়। শাকসবজির ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা: ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৪০ হাজার ৮৭৮ টন শাকসবজি রপ্তানি হয়েছিল। কিন্তু পরের বছর তা কমে গিয়ে হয় ২৫ হাজার ৪৭০ টন। রপ্তানির এই নিম্নমুখী প্রবণতা বছর বছর বাড়ছে উদ্বেগজনক হারে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের ওই প্রতিবেদনই বলছে, কৃষিপণ্য ও শাকসবজি রপ্তানির পরিমাণ ক্রমাগতভাবে কমে যাওয়ার কারণ এসব পণ্যের রপ্তানিকারকদের নন-কমপ্লায়েন্স, অর্থাৎ তাঁরা তাঁদের পণ্যের গুণগত মান রক্ষাসহ আমদানিকারকদের বেঁধে দেওয়া মানদণ্ডগুলো অনুসরণ করছেন না। যেমন ২০১৪ সালে রাশিয়ায় রপ্তানি করা আলুতে ব্রাউন রুট ব্যাকটেরিয়া শনাক্ত করা হয়। তারপর রাশিয়া বাংলাদেশ থেকে আলু রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। অথচ আমাদের আলু রপ্তানির জন্য রাশিয়া ও পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে বাজার সম্ভাবনা অনেক।

কৃষিপণ্য ও ফলমূল রপ্তানির ক্ষেত্রে নন-কমপ্লায়েন্সের অভিযোগ কিন্তু সাম্প্রতিক বিষয় নয়। কৃষি মন্ত্রণালয়ের ওই প্রতিবেদনেই দেখা যাচ্ছে ২০১১ সালে নন-কমপ্লায়েন্সের কারণে রপ্তানিকৃত শাকসবজির ১১৫টি চালান বাতিল হয়েছে। তারপর থেকে প্রতিবছরই চালান বাতিলের হিসাব ওই প্রতিবেদনে আছে। দেখা যাচ্ছে, ২০১১ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত সাত বছরে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাতিল করেছে শাকসবজির ৯০৮টি চালান।

কৃষিপণ্য রফতানির জন্য ওয়্যারহাউজ থাকলেও সেগুলো সঠিক স্থানে স্থাপন করা হয়নি বলে অভিযোগ ব্যবসায়ীদের। পচনশীল পণ্য  পরিবহণ ও যোগাযোগ ব্যবস্থার দুর্বলতাও ভোগাচ্ছে তাদের। আকাশপথে পণ্য পরিবহনে প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় এখানে ভাড়া কয়েক গুণ বেশি।   রয়েছে প্রশিক্ষিত জনবলের অভাব। প্রযুক্তিগত ও আর্থিক সুবিধাও নেই। আর সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে সমন্বয়হীনতা ও পরিকল্পনার অভাবও স্পষ্ট বলে মনে করেন রপ্তানিকারকরা।

বর্তমানে বিশ্বের ১৪০টি দেশে এখন কৃষি ও কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য রপ্তানি করছে বাংলাদেশ এবং যা থেকে আয় হচ্ছে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা। বাজার তৈরি হয়েছে প্রতিবেশী দেশগুলোতেও। গত অর্থবছরে প্রায় ৩ হাজার ৬৬৮ কোটি ডলারের পণ্য রফতানি করে বাংলাদেশ। এর মধ্যে সিংহভাগই হলো তৈরি পোশাক খাতের। আর কৃষি খাতের অবদান মাত্র ২৯০ কোটি ডলার। পণ্যের মান উন্নয়ন ও নতুন কৃষিপণ্য যুক্ত করার মাধ্যমে সামনের দিনগুলোয় এ আয় আরো বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে বলে মনে করেন ব্যবসায়ীরা।

প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য রফতানি করছে বাংলাদেশ এগ্রো প্রসেসরস অ্যাসোসিয়েশনের (বাপা) আওতাভুক্ত প্রায় ৫০০টি প্রতিষ্ঠান। রফতানি এখন কিছুটা বাড়তির দিকে থাকলেও অবকাঠামোর দুর্বলতা ও উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ার কারণে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা হারাচ্ছে বাংলাদেশের প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য।

আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ খাত থেকে রফতানি প্রবৃদ্ধি ঘটাতে স্বল্প সুদে ঋণ, কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্র কারখানায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্যাস-সংযোগ প্রদান ও সহজ কিস্তিতে শিল্প প্লটের মূল্য পরিশোধের সুযোগ দেয়া যেতে পারে, বলছেন বিশেষজ্ঞরা। 

কৃষিভিত্তিক পণ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্পে মূল্য সংযোজনের সুযোগ অনেক বেশি। ভারতসহ প্রতিবেশী দেশগুলো এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করছে। অথচ বাংলাদেশে কৃষিভিত্তিক শিল্প খাত থেকে রপ্তানি বাড়ানোর সম্ভাবনা থাকলেও তা এখনো পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি। এ খাতের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতায় খাদ্য ও খাদ্যপণ্যের জন্য একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ বিভাগ চালু করা উচিত বলে মনে করেন ব্যবসায়ীরা। 

তাঁদের মতে, দক্ষ উদ্যোক্তা সৃষ্টির লক্ষ্যে বাস্তবসম্মত প্রশিক্ষণ চালুর পাশাপাশি পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় উদ্যোক্তা সৃষ্টিধর্মী কোর্স চালু করা যেতে পারে। তাছাড়া বিশ্বায়নের যুগে নতুন নতুন প্রযুক্তির ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ যেন পিছিয়ে না যায়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ খাতকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে যেতে বিভিন্ন ধরনের মেলার আয়োজন করা যায়। দেশী প্রতিষ্ঠানগুলোকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বাণিজ্য ও গবেষণার সঙ্গে আরো বেশি করে সম্পৃক্ত করার ক্ষেত্র তৈরি করে দিতে হবে।