সোমবার   ২৫ অক্টোবর ২০২১ ||  কার্তিক ১০ ১৪২৮ ||  ১৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

ACI Agri Business

কৃষিপণ্যের বাজার অব্যবস্থাপনা ও সিন্ডিকেটের প্রভাব

ড. মোহাম্মদ ইসমাইল হোসেন

প্রকাশিত: ০১:১৯, ২৭ ডিসেম্বর ২০২০

বিগত কয়েক মাস ধরে প্রায় সকল কৃষিপণ্যের বাজারে দামের উর্ধ¦মূখী প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এসকল কৃষিপন্যের মধ্যে চাল, ডাল, সবজি, আলু ও পেঁয়াজের বাজারে দামের ক্রমাগত বৃদ্ধি ও উঠানামা এবং বাজারে অস্থিরতা বিরাজমান। এর ফলে সকল শ্রেণীর মানুষ (উৎপাদক, মধ্যসত্ত¡ভোগী, ভোক্তা) আর্থিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচেছ। এর মূল কারণ কৃষিপণ্যের চাহিদা ও যোগানের ভারসাম্যহীনতা। কৃষিপণ্যের যোগান/সরবরাহ আসে মূলত: দেশীয় উৎপাদন থেকে। আবার কিছু কিছু পণ্যের সরবরাহ আমদানির উপরও নির্ভরশীল (যেমন: পেঁয়াজ, ডাল)। কিন্তু পণ্যের সরবরাহ কী বাজার অর্থনীতি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচেছ ? অবস্থাদৃষ্টে মনে হচেছ কৃষিপণ্যের বাজার মাঝে মাঝে অদৃশ্য শক্তি দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে। যদিও এতে মতবিরোধ রয়েছে। মোদ্দা কথায় বলা যায়, কৃষিপণ্যের বাজারে এমন কিছু মধ্যসত্ত¡ভোগী রয়েছে যারা অতি মুনাফার লোভে স্বল্পকালীন সমেয়ে যোগানে/সরবরাহে সংকট বা ঘাটতি সৃষ্টি করে। 

তবে এ বছর কিছুটা ভিন্ন অবস্থা বিরাজমান। কারন আবহাওয়ার ভিন্নতা। হাওড়ে বণ্যার প্রভাব, দেশের উত্তর পূর্বাঞ্চলে বণ্যা, অতিবৃষ্টি, অসময়ে বৃষ্টি ইত্যাদির কারণে অনেক ফসল/সবজি খেত নষ্ট হয়ে গেছে। এমনকি অসময়ে বণ্যার কারনে বীজতলা তৈরী এবং একই জমিতে বার বার বীজ বপন করা সত্তে¡ও আশানুরুপ ফলন হয়নি। যদি পৃথক ভাবে বলতে হয়, তাহলে  বলা যায় চালের বাজারের দামের উর্ধ্বগতি মূলত: কৃষকের আপদকালীন মজুদ ও মিলমালিকদের কারসাজির কারণে হচ্ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর মতে দেশে এবছর চালের মোট উৎপাদন ৩.৬ কোটি টন। চলতি অর্থবছরে ১০ নভেম্বর পর্যন্ত সরকারিভাবে কোন চাল আমদানি করা হয়নি। একই সময়ে বেসরকারিভাবে মাএ ৬০ টন চাল আমদানি করা হয়েছে। দেশে চাল মজুদের পরিমান একই সময়ে ৭ লাখ ২৫ হাজার টন যা পূর্বের অর্থবছরের চেয়ে কম। আর দেশে চালের চাহিদা ৩.৫ কোটি টন। যার অর্থ হলো বাজারে চালের সরবরাহে ঘাটতি নেই। তবে বাজারে নিরবচিছন্ন চালের সরবরাহ আছে কি-না তা প্রশ্নাতীত। 

তাহলে চালের বাজারে এই সময়ের দামের উর্ধ্বমুখী প্রবণতা কেন? অবশ্যই এখানে বাজার ব্যবস্থাপনা দায়ি। আমরা অনেকে বলে থাকি মুক্ত বাজার অর্থনীনিতে বাজার তার চাহিদা ও যোগান দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে। কিন্তু বাস্তবে কী আমরা মুক্ত বাজার অর্থনীনিতে আছি? শুধুমাত্র দামের উর্দ্ধগতির ক্ষেত্রে আমরা মুক্ত বাজার অর্থনীীতর কথা বলে থাকি। কিন্তু পণ্যের দাম যখন নি¤œমুখী হওয়ার কথা অর্থাৎ যোগান/উৎপাদন বেশী থাকে তাহলেও দাম কমে না কেন? এর উত্তর কী মুক্তবাজার অর্থনীতি দিতে পারবে?

চালের যখন ভরা মৌসুম তখনও দাম না কমার অর্থ হলো দাম কারো দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে। যদিও অধিকাংশ কৃষিপণ্য প্রতিযোগিতামূলক বাজার কাঠামোতে উৎপাদিত হচ্ছে তারপরেও বাজারে এমন কিছু নিয়ামক রয়েছে যা পণ্যের বাজারকে উর্ধ্বমুখী  করে তুলে। বাজারে এরা কারা তা অবশ্যই খোঁজে বের করতে হবে। যেমন চালের ক্ষেত্রে দোষারোপ করা হয়ে থাকে মিলমালিকদের। মিলমালিকরা সিন্ডিকেট করে চালের বাজার নিয়ন্ত্রন করছে। আবার প্রতিটি বাজারে কিছু বড় বড় পাইকারী ব্যবসায়ী আছেন যাদের প্রভাব অস্বীকার করা যায় না। আর ছোট ছোট খুচরা ব্যবসায়িরা এ পাইকারদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। যদিও খুচরা ব্যবসায়ীরা পণ্যের বাজারে প্রভাব বিস্তার করতে পারে না। কিন্তু তারা উচ্চ দামে কিনলে বিক্রির ক্ষেত্রেও উচ্চদামে বিক্রি করতে হয়।

আমাদের দেশে কৃষি ও বাণিজ্য মন্ত্রনালয় মাঝে মাঝে কিছু কৃষিপণ্যের দাম ঠিক করে দেয়। কিন্তু কখনো সেই দামে পাইকার বা খুচরা কারবারিরা বিক্রি করে না। এর কারণ মূলত বাজার তদারকি ও আইনের শাসনের অভাব। দেশে পণ্য মজুদের আইন আছে কিন্তু তার প্রয়োগ নেই। কারন আইন যাদের জন্য প্রয়োগ করা হবে তাদের অধিকাংশ রাজনৈতিক বলয়ের ভিতর দিয়ে চলে। শুধুমাত্র রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী এবং মন্ত্রণালয় দ্বারা গঠিত মনিটরিং কমিটি যদি বাজার পর্যবেক্ষনে যায় তাহলে বাজার অবশ্যই নিয়ন্ত্রনে থাকবে। সবচেয়ে বড় কথা হলো বাজার প্রতিনিয়তই পর্যবেক্ষন/মনিটরিং করতে হবে এবং পূর্বেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।

সবজি বাজারে দামে উর্ধ্বগতির মূল কারন হলো বণ্যা ও অতি বৃষ্টি যার কারণে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়। এ বছর আগাম বন্যা, দেরীতে বন্যা ও অতিবৃষ্টি কারণে অধিকাংশ সবজি বাগান নষ্ট হয়ে গেছে। কৃষকও সময়মত বীজ লাগাতে পারেনি। এ জন্য বাজারে স্বল্প সময়ে যোগানের সংকট সৃষ্টি হয়েছে। যেহেতু চাহিদার কোন পরিবর্তন হয়নি বা কোন কোন ক্ষেএে চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে (করোনার প্রভাবে), উৎপাদন স্বল্পতার কারণে যোগানের/সরবরাহে স্বল্পতা সৃষ্টি হয়েছে। এজন্য অধিকাংশ সবজির দাম ও বৃদ্ধি পেয়েছে।

কিন্তু আলুর  বাজারের দামের উর্ধ্বগতি ভিন্ন। আমরা যদি আলুর উৎপাদন ও চাহিদার দিকে নজর দেই তাহলে দেখতে পাই আলুর উৎপাদন বিগত কয়েক বছর ধরেই হ্রাস পেয়েছে। এর মূল কারণ কৃষকরা আলুর দাম তুলনামূলকভাবে বিগত বছরেগুলোতে কম পেয়েছিল এবং অনেকাংশে ক্ষেত্রেই উৎপাদন খরচও তুলতে পারতো না। যেহেতু আলুর উৎপাদন খরচ অন্যান্য সবজি উৎপাদন খরচের চেয়ে বেশী, তাই কৃষকরাও ভাল দাম আশা করে। আবার দেখা যায় আলুর প্রতিযোগী শস্য যেমন ভ’ট্টা, বাজারে দাম মোটামুটি ভাল, এ কারণেও কৃষক আলু উৎপাদনের পরিবর্তে অন্যান্য শস্য উৎপাদনে ধাবিত হচেছ। এ বছর (২০১৯-২০২০) দেশে মোট উৎপাদিত আলুর পরিমান ছিল ১.০৯ কোটি টন। বিদেশে রফতানি হয়েছে ১৭.৭৬ হাজার টন। বীজ হিসেবে রাখা আছে প্রায় ৮ লাখ টন এবং আলুর চাহিদা প্রায় ৮০ লাখ টন। এছাড়াও আলুর  ভিন্নমুখী ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে, যেমন আলু থেকে চীপস, ফ্রেন্স ফ্রাই, আলু পরোটা ইত্যাদির ব্যবহার বাড়ার কারনে আলুর চাহিদা ও বৃদ্ধি পেয়েছে। তাছাড়া, বণ্যার সময় অনেকে এাণসামগ্রি হিসেবে আলু দান এবং রোহিক্সগা ক্যাম্পে আলু সরবরাহের কারণে বাজারে আলুর স্বল্পতা সৃষ্টি হয়েছে। আবার বণ্যা ও করোনার কারণে অন্যান্য সবজির উৎপাদন ও সরবরাহ কম থাকায় সবজি হিসেবে আলুর ব্যবহার বেড়েছে।   এখানে অবশ্যই আমাদের মনে রাখতে হবে কোল্ডস্টোরেজ যে পরিমান আলু রাখা আছে তা শুধু মাত্র খাওয়ার জন্যই নয় এর একটা বড় অংশ বীজ হিসেবেও ব্যবহার করা হয়। যদি আলু কোল্ডস্টোরেজে অধিক পরিমানে মজুদ থাকতো তাহলে অবশ্যই তা বাজারে চলে আসতো। কারণ আর কয়েকদিন পরেই নতুন আলু আসবে। তখন দাম কমে যাবে। তাই কোন কৃষক/ব্যবসায়ী রিস্ক নিবে না। এক্ষেত্রে অবশ্যই বলতে হবে যোগানের ঘাটতির কারণেই দামের এ উর্ধ্বমুখী। 

কৃষি পণ্যের দামের এ উর্ধ্বমুখী প্রবণতা রোধে আমাদের অবশ্যই উৎপাদন বাড়াতে হবে। তার পূর্বে দেখতে হবে দেশে কী পরিমান চাহিদা রয়েছে। আমরা পরিসংখ্যান ব্যুরো থেকে যে তথ্য পাই তা বাস্তবিক অথের্ই মিলছে না। তাই অবশ্যই কোন নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জরিপ চালিয়ে চাহিদার পরিমান নির্ণয় করতে হবে। যদি আমরা চাহিদার পরিমান জানতে পারি তাহলে আমরা কতটুকু অতিরিক্ত জমিকে নির্দিষ্ট ফসলের আওতায় আনবো তা ঠিক করতে পারবো। বাজারে কৃষি পণ্যের চাহিদা ও যোগানের/সরবরাহের  সঠিক তথ্য প্রবাহ থাকলে কৃষক ও ভোক্তা উভয়েই উপকৃত হবে বলে আশা করি। 

লেখক: প্রফেসর কৃষিব্যবসা ও বিপণন বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ^বিদ্যালয়, ময়মনসিংহ।

Advertisement
Advertisement