সোমবার   ০১ জুন ২০২০ ||  জ্যৈষ্ঠ ১৭ ১৪২৭ ||  ০৯ শাওয়াল ১৪৪১

করোনা সংকটে চক্রাকার অর্থনীতি নয় কৃষিতেই সমাধান!

কৃষিবিদ মশিউর রহমান

প্রকাশিত: ২৩:২০, ২৬ এপ্রিল ২০২০

করোনা মহামারীর প্রভাবে বৈশ্বিক অর্থনীতির চিরচেনা ধারায় যে ব্যাপক পরিবর্তন আসবে – সেটা এতদিনে মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে গেছে সবাই। বিশ্ব নেতারা যখন উদ্বিগ্ন এই ভেবে যে, ভঙ্গুর অর্থনীতির পাশাপাশি আমাদের বসবাসযোগ্য একমাত্র পৃথিবী আর কোন কোন ক্ষেত্রে করুণ পরিণতি বরণ করতে যাচ্ছে? তবে এটা ঠিক যে, করোনা মহামারী আমাদেরকে পরিবর্তিত নতুন এক বিশ্ব ব্যবস্থার দিকে ঠেলে দিচ্ছে যেখানে বদলে যাবে চিরচেনা অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। কিন্তু কেমন হবে সেই পরিবর্তিত অর্থনীতির রুপ? সেটা কি চক্রাকার অর্থনীতি? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, “If ever there was a time to duouble down on the journey from a linear to a circular economy, it is now.” অর্থাৎ যদি কখনো আমরা অর্থনীতির রৈখিক গতি থেকে সড়ে গিয়ে চক্রাকার অর্থনীতি বরণ করতে বাধ্য হয়ে থাকি, তবে তা এখন।

চক্রাকার অর্থনীতি আসলে কি? সাদামাটা ভাবে বলতে গেলে, চক্রাকার অর্থনীতি হলো সেটা যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহারের মধ্যকার প্রচলিত সংযোগ ভেঙ্গে দিয়ে উৎপাদন প্রক্রিয়া থেকে অপচয়ের (waste) পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে দেয়। পণ্যের পুনঃব্যবহারের মাধ্যমে সর্বোচ্চ উপযোগীতা লাভ করাই এর মূল উদ্দেশ্য। উদাহরণ দিলে বিষয়টি আরো পরিষ্কার হবে। বৃটেনের ফ্যাশন রিটেইল হাউজ ‘নেক্সট’’ এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সিমন উলফসন তিন বছর আগে বলেছিলেন যে, ‍“আমাদের বিক্রির পরিমাণ কমে যাচ্ছে কারণ মানুষ তাদের বেশী কেনার প্রবণতা থেকে সরে আসছে।” অন্যদিকে বিশ্বের মূল ধারার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, যেমন IKEA, ও  H&M ২০১৯ সালের শেষের দিকে তাদের প্রচলিত ধারার বাইরে নতুন এক ব্যবসায়িক মডেল খুঁজতে থাকে যাতে করে তারা পুরাতন জিনিস মেরামত, পুনঃবিক্রয়, ও সেবা সরবরাহের মাধ্যমে প্রোফিট সৃষ্টি করতে পারে। আবার বর্তমানে কোভিড-১৯ সংক্রমণ ঠেকানোর কৌশল হিসেবে ঘরে থাকার কারণে মানুষ এক ধরণের প্রেরণা (motivation) লাভ করতে শুরু করেছে যে, তারা যা ক্রয় করে তা প্রকৃত স্বাচ্ছন্দ এনে দিতে পারেনা, তাদের দরকার সেবা ও বিপর্যয় মোকাবেলা করার মতো অভিজ্ঞতা।বিশ্ববিখ্যাত এইচএন্ডএম ব্র্যান্ডের শোরুম

এটা তো গেলো নন-ফুড ইন্ডাস্ট্রির কথা। কিন্তু খাদ্য পণ্য ছাড়া তো মানুষ চলতে পারেনা। সেখানেও পরেছে করোনার ভয়াল থাবা। আর তাতেই পৃথিবীর মোট খাদ্য উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাবার আশংকা করছেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে পৃথিবী ব্যাপি খাদ্য নিরাপত্তা বড় ধরণের হুমকির মুখে পড়ার আশংকা রয়েছে। সেখানে আমাদের মতো কৃষি প্রধান দেশ সুবিধাজনক অবস্থানে আছে বলেই আপাতঃদৃষ্টিতে মনে হতে পারে।  কিন্তু এই মুহুর্তে করোনার বহুমাত্রিক প্রভাব থেকে দেশের সার্বিক কৃষি খাতকে মুক্ত রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ। ইতোমধ্যে এর বিরুপ প্রভাব দেশের কৃষি, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি খাতে উৎপাদিত পণ্য ও মানুষের দৈনন্দিন খাদ্য তালিকা থাকা ভোগ্যপণ্যের বাজারে। সীমিত আকারে কাঁচা বাজার, গ্রসারি সপ, সুপার সপ খোলা থাকলেও ক্রেতা কমে গেছে উল্লেখযোগ্য হারে। ফলে এর ঢেউ গিয়ে লেগেছে কৃষকের ক্ষেতে, মাছের খামারে, পোল্ট্রি ও ডেইরি শেডে। কৃষক তার উৎপাদিত পণ্য কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। কিংবা অবিক্রিত থেকে পঁচে নষ্ট হচ্ছে মহামূল্যবান খাদ্য পণ্য। 

অন্যদিকে, বাণিজ্যিক কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খামারে এবং খাদ্য ও পুষ্টি সামগ্রী প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণের সাথে সংশ্লিষ্ট শিল্প ও প্রতিষ্ঠানসমূহ আরো কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। তাদের ওয়্যারহাউজে টাল হয়ে পড়ে থাকা কাঁচামাল ও অবিক্রিত ফিনিশড পণ্য নিয়ে তারা যেমন দুঃশ্চিন্তায় রয়েছে, তেমনি রয়েছে বাজার হারানোর ভীতি। দীর্ঘ মেয়াদে করোনা ভাইরাসের কারণে মানুষ গৃহবন্দী থাকলে, এবং বিক্রির নিম্নমুখী প্রবণতা বজায় থাকলে এ খাতের বহু শিল্প অস্তিত্ব সংকটে পড়ার আশংকা করছেন উদ্যোক্তরা।  পোল্ট্রি প্রসেসিং। ছবি: সংগৃহীত

এমন বাস্তবতায় চক্রাকার অর্থনীতির মাঝেই সমস্যা থেকে উত্তরণের পথ খুঁজে নিতে পরামর্শ দিচ্ছেন গবেষকরা। যেখানে উৎপাদিত পণ্যের উপযোগীতা বাড়ানের কৌশলকেই তারা অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি হিসেবে দেখছেন। তারা বলছেন এর মাধ্যমেই হতে পারে উদ্ভূত সমস্যা সমাধানে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন, এবং সর্বোপরি কার্বন নিঃসরণ কমানোর পথ হিসেবে। এর মাধ্যমে আগামী দিনের কাঙ্খিত গ্রীণ ইন্ডাস্ট্রি আরো উৎসাহিত বলেই তারা আশা করছেন । কিন্তু আসলেই কি তাই? চক্রাকার অর্থনীতির প্রকৃত স্বরুপ বুঝতে হলে একে নিম্নোক্ত তিনটি মাপকাঠিতে মাপা যেতে পারে, যথা-  
(১) কর্মসংস্থানের ওপর প্রভাব মূল্যায়ণ করা
চক্রাকার অর্থনীতি চাকুরির পুরো ল্যান্ডস্কেপ পরিবর্তন করে দেবে। চক্রাকার অর্থনীতি নতুন ধরণের চাকুরির সুযোগ সৃষ্টি করবে। তবে সেই নতুন চাকুরি কি অধিক গ্রহণযোগ্য চাকরি হবে? তাই যদি হয়, তবে কারা হবে সেই চাকরির সম্ভাব্য গ্রহীতা? গবেষকদের মতে, চক্রাকার অর্থনীতির অন্যতম অনুসংগ হিসেবে রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রি ইতোমধ্যে এককভাবে বিশ্বব্যাপী প্রায় দেড় মিলিয়ন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। WRAP and the Green Alliance ধারণা করছে যে, যুক্তরাজ্যের প্রায় নিষ্প্রভ চাকুরির বাজারে চক্রাকার অর্থনীতি এককভাবে ৫ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে। ক্যামব্রিজ ভিত্তিক একদল গবেষক তাদের এক গবেষণাপত্রের অনুসিদ্ধান্তে বলছেন, নতুন সম্পদ নিষ্কাশনের নীতি থেকে সরে এসে পুনরুদ্ধার নীতি গ্রহণ করলে মধ্য ও পূর্ব ইউরোপে আরো প্রায় ৭  লাখ চাকুরির সুযোগ যোগ হবে। 

তবে সংখ্যা যাই হোক না কেন, তা হবে অন্য কোন সুযোগের বদলী হিসেবে। যেমন, আমরা যদি নতুন খনিজ আহরণের নীতি থেকে সরে আসি তাহলে তা খনি শ্রমিকের চাকুরির সুযোগ উল্লেখযোগহারে কমিয়ে দেবে। তবে আশার কথা, জাতিসংঘের শ্রম বিষয়ক সংস্থা, ILO তার ২০১৮ সালের এক প্রতিবেদনে বলছে যে, যেখানে ২০৩০ সালের মধ্যে পরিবেশ বান্ধব বিনিয়োগ থেকে ১৮মিলিয়ন নতুন চাকুরি প্রত্যাশা করা হচ্ছে সেখানে পেট্রোলিয়াম আহরণ ও পরিশোধনাগার খাতে মাত্র এক মিলিয়ন চাকুরীর সুযোগ কমে যাবে। প্লাস্টিক কাপে কফি। ছবি: সংগৃহীত

(২) রিসাইক্লিং এর বিপরীতে শিল্পের বর্জ কমানোর তুলনামুলক দিক
“শূণ্য বর্জ এবং পণ্যের শতভাগ পুনঃব্যবহার” – চক্রাকার অর্থনীতিতে এটি খুবই জনপ্রিয় একটি লক্ষ্য। কিন্তু এটা বাস্তবে অর্জনযোগ্য নয়। প্রকারান্তরে এই নীতি বাস্তবায়ন পর্যায়ে এসে আশ্চর্যজনকভাবে অধিক সম্পদের ব্যবহারকেই উৎসাহিত করতে পারে। আর তা গোটা ইন্ডাস্ট্রির স্থায়িত্বশীলতাকেই কমিয়ে দিতে পারে। উদাহরণস্বরুপ বলা যায়, যৌগিক বস্তু (composite-material) দ্বারা প্রস্তুতকৃত মোড়কে প্যাকেটজাত কফি অপেক্ষা প্লাস্টিক বা স্টিলের ক্যানে প্যাকেটজাত কফি আপাতঃদৃষ্টিতে অধিক পরিবেশ বান্ধব মনে হতে পারে। কেননা, প্লাস্টিক ও স্টিলের ক্যান সহজেই রিসাইকেল করা যায় – এই যুক্তিতে।   কিন্তু ১১.৫ আউন্স প্লাস্টিক ক্যান তৈরীতে ৫ মেগাজুলের বেশী শক্তি খরচ হয়, স্টিল ক্যানের ক্ষেত্রে তা ৪ মেগাজুলের বেশী, অপরদিকে কম্পোজিট ব্যাগের ক্ষেত্রে তা দাঁড়ায় মাত্র ১ মেগাজুলের সামান্য বেশী। কাজেই কোন পণ্যের অব্যবহৃত অংশ বা মোড়ক রিসাইকেল যোগ্য কি-না কেবল সে বিবেচনায় পণ্য কেনার সিদ্ধান্ত আমাদেরকে একটি ভুল পথে নির্দেশিত করতে পারে। প্রকৃতপক্ষে, শূণ্য বর্জ্য উৎপাদন আমাদের সমাজের আল্টিমেট উদ্দেশ্য নয়। 

(৩) পণ্যেরই উপযোগীতার মাত্রা ও আমাদের প্রত্যাশা 
চক্রাকার অর্থনীতি পণ্যের পুনঃব্যবহারকে উৎসাহিত করার মাধ্যমে অপচয়ের পরিমাণ কমিয়ে আনতে কাজ করে। কিন্তু এটি একেবারে বিশুদ্ধ ধাতু দ্বারা তৈরী ও ফ্যাক্টরি থেকে অবমুক্ত নতুন পণ্যের (brand new product) ব্যবহারকে উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে দিতে ব্যর্থ। যদিও কোম্পানীগুলোর অধিক আগ্রহের জায়গা হলো কিভাবে তাদের ফ্যাক্টরি থেকে অবমুক্ত পণ্যের বিক্রয়ে সীমাহীন প্রবৃদ্ধি অর্জন করা যায়। পরিবেশ বান্ধব পণ্যের বিজ্ঞাপন। ছবি:: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের একটি নামকরা ফ্যাশন হাউজের দিকে তাকালে দু’টি শক্তিশালী স্লোগান চোখে পড়বে। একটি আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেবে – “Rewear, reuse and recycle” অর্থাৎ বারবার পরিধান করো, পুনরায় ব্যবহার করো, এবং রিসাইকেল করো। খুবই চমৎকার। কিন্তু এর পাশেই আরো একটি স্লোগান চোখে পড়বে – “We have new stuff coming in every day, so why don’t you?” যার অর্থ দাঁড়ায়, প্রতিদিনই আমাদের এখানে নতুন নতুন পণ্য আসছে, আপনি কেন নিচ্ছেন না?  আশ্চর্যজনকভাবে, ক্রেতারা দ্বিতীয় স্লোগানের প্রতিই বেশী আকৃষ্ট। ক্রেতারা এখনো নতুন পোশাক কেনার প্রতি বেশী আগ্রহী। বোধ হয় সে কারণেই আগামী ২০৩০ পর্যন্ত বৈশ্বিক পোশাক ও জুতার বাজারে বার্ষিক ৫% প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশা করা হচ্ছে যেখানে অতিরিক্ত ১০০ মিলিয়ন টন পণ্য উৎপাদন করতে হবে। 

শিল্প উৎপাদনে প্রবৃদ্ধি অর্জনের উচ্চাকাঙ্খা ও পণ্যের পুনঃব্যবহারের নীতি একসাথে চলতে পারে না। এটা ঠিক যেন Jevons paradox – যার অর্থ হলো শিল্প উৎপাদনে ক্রমবর্ধমান দক্ষতা (efficienc) অর্জন কখনো মানুষের ভোগের প্রবণতা কমায় না, বরং বাড়িয়ে দেয়। প্রকৃতপক্ষে, চক্রাকার অর্থনীতি কোন ‘সিলভার বুলেট’ নয় যে, করোনা ভাইরাস মহামারীর বিরুপ প্রভাবকে পাশ কাটিয়ে আমাদের অর্থনীতির প্রতিটি খাতকে খুব দ্রুত ও অধিক গ্রহণযোগ্য কোন সমাধানের পথে নিয়ে যেতে পারে, যেখানে কর্মসংস্থান, ব্যবসায়িক স্থায়িত্বশীলতা ও সমৃদ্ধি সমানতালে চলবে।  তাছাড়া শিল্প ও পণ্য ভেদে এর কার্যকারীতা সব সময় সমান নাও হতে পারে। কাজেই বিষয়গুলো আমাদেরকে খুবই সতর্কতার সাথে মূল্যায়ন করতে হবে।

তবে আশার কথা হলো আমাদের দেশের সরকার ইতোমধ্যে বিশেষ ধরণের প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে সার্বিক কৃষি খাতকে সুরক্ষিত করার মাধ্যমে দেশের মানুষের জন্য খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। এই প্রণোদনার পরিকল্পিত ও সুষম ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে দেশের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি করোনা মহামারীর প্রভাবে বৈশ্বিক যে খাদ্য ঘাটতির আশংকা দেখা দিয়েছে তা পূরণে বাংলাদেশও উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারে। এটাই আশার কথা।

তথ্যসূত্র: Kevin Moss, Global Director, Center for Sustainable Business, U.S.A. এর আর্টিকেল অবলম্বনে ভাষান্তর ও সম্পাদনায় কৃষিবিদ মশিউর রহমান, বিসিএস (মৎস্য), সহকারী পরিচালক, মৎস্য অধিদপ্তর, ঢাকা। যোগাযোগ: mrahmandof28@gmail.com