সোমবার   ০১ জুন ২০২০ ||  জ্যৈষ্ঠ ১৭ ১৪২৭ ||  ০৯ শাওয়াল ১৪৪১

করোনায় ভালো নেই ঔষুধী গ্রামের মানুষ

বিশেষ প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ০১:১০, ১৫ মে ২০২০

করোনার কারনে ভয়াবহ অবস্থায় দিনাতিপাত করছেন দেশের বৃহত্তম ভেষজ গ্রাম বলে পরিচিত নাটোরের লক্ষিপুর-খোলাবাড়িয়ার মানুষ। বেচাকেনা বন্ধ থাকায়, পচে নষ্ট হচ্ছে শত শত কেজি ঔষধী কাঁচামাল।ফলে অর্থ সংকটে পড়ে পথে বসার উপক্রম হয়েছে ঔষুধী কাঁচামাল উৎপাদকদের। চাষী ও ব্যবসায়ীদের ঘরে ঘরে এখন চলছে হাহাকার। 

নাটোর সদর উপজেলার লক্ষিপুর-খোলাবড়িয়া ইউনিয়নের প্রায় সাড়ে ৪ হাজার পরিবার ভেষজ উদ্ভিদ চাষের সাথে জড়িত। এদের সাথে যুক্ত আরো ১ হাজার হকার ও ছোট-বড় অসংখ্য ব্যবসায়ী। এখানে গড়ে উঠেছে ওষুধ প্রক্রিয়া করার জন্য কারখানা ও ছোট বড় আড়ত। তবে গত ৩ সপ্তাহ ধরে সবই স্থবির। 

প্রতিদিন যেখানকার আড়ত গুলো থেকে প্রায় ৩০ হাজার কেজি এলোভেরা সহ অন্যান্য ঔষধী কাঁচামাল রপ্তানী করা হত। অথচ গত ৩ সপ্তাহে সেখান থেকে ২ কেজি কাঁচামালও কেউ কেনেনি। আড়তগুলোর সামনে পচে নষ্ট হচ্ছে শত শত কেজি এলোভেরা সহ অন্যান্য ঔষধী। জমিতেও নষ্ট হচ্ছে হাজার হাজার কেজি ওষধী বৃক্ষ। অনেক ক্ষুদ্র ঔষধী চাষী ও ব্যবসায়ীর ঘরে খাবার সংকট দেখা দিয়েছে।শংকিত বড় চাষী ও ব্যবসায়ীরাও।অস্বিত্ব হারানোর শংকায় এখানকার প্রতিটি মানুষ তাকিয়ে আছেন সরকারের দিকে।  

ঘৃতকুমারী চাষী আবুল কালাম জানান, গত দুই মাস ধরে কোন ক্রেতা নেই। তাই মাঠেই নষ্ট হচ্ছে মূল্যবান এই ঔষধী গাছ।বেচাকেনা না থাকায় সংসার চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে, বলেন কালাম।গ্রামের আরেক কৃষক বলেন, করোনা তাদের পথে বসিয়ে দিয়েছে।এভাবে আর কয়দিন পর সন্তানদের নিয়ে পথে বসতে হবে তাদের।প্রত্যেকটি পরিবারই অসহায় অবস্থাই জীবন-যাপন করছেন বলেও জানান এই কৃষক।

ঔষধী কাঁচামাল প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানার এক মালিক নাম প্রকাশ করার শর্তে বলেন, লজ্জায় মানুষের কাছে সাহায্যও চাইতে পারি না।দুই মাস ধরে কারখানা বন্ধ।শ্রমিকের বেতন দিবো কোথা থেকে, আর নিজেরাই কীভাবে চলবো।পরিস্থিতির উন্নতি না হললে এই গ্রামের মানুষ নিস্ব: হয়ে পড়বেন বলেও আশংকা প্রকাশ করেন তিনি। ঔষধী পণ্য পরিবহণে কোন বাধা-নিষেধ থাকা উচিত নয়, তাদের বাঁচাতে সরকারের সহায়তা চান তারা।

ওষুধ তৈরীর কাঁচামাল হিসাবে নাটোরের ভেষজ গ্রাম থেকে পন্য পরিবহণের ক্ষেত্রে ছাড় দেয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান এ সমিতির নেতারা।লক্ষিপুর খোলাবাড়িয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আলতাফ হোসেন বলেন, চাষীরা বাইরে কোথাও তাদের পণ্য পাঠাতে পারছেন না লকডাউনের কারণে, এই ভেষজ পণ্য কেনাবেচার সাথে জড়িত প্রায় এক হাজার হকার রয়েছেন, তারাও বেকার হয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন।ক্ষতিগ্রস্তদের পর্যাপ্ত ত্রাণও দিতে পারছে না ইউনিয়ন পরিষদ। সরকার ও বিত্তশালীরা এগিয়ে না আসলে ঔষুধী গ্রামটির ইতিহাস-ঐতিহ্য ধরে রাখা কঠিন হবে বলেও জানান চেয়ারম্যান। শাক-সবজির মত ঔষুধী গাছগুলোকে পঁচনশীল ও ঝুঁকিপূর্ণ পণ্যের তালিকায় এনে তাদের পরিবহণ উন্মুক্ত করে দেয়ারও দাবি জানান তিনি। 

ঔষধী গ্রাম উন্নয়ন সমিতির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন বলেন, ঔষুধি পণ্যের বেচাকেনা ও সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সাড়ে চার হাজার চাষীর সাথে এক হাজার হকার যেমন বেকার হয়েছেন, তেমনি এর সাথে সংশ্লিষ্ট স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও ক্ষতির মুখে পড়েছেন। যে কারণে এ গ্রামের মানুষের এখন মানবেতর জীবন-যাপন করতে হচ্ছে। কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য এখন শূণ্যের কোটায়। সরকার সহযোগিতা না করলে তাদের অবস্থা আরো নাজুক হবে বলেও জানান দেলোয়ার।

দেশের বৃহত্তম ভেষজ গ্রাম এবং সিংহ ভাগ হারবাল ওষুধের কাঁচামাল উৎপাদনকারী এ অঞ্চলকে বাঁচাতে খাদ্য সহায়তাসহ কার্যকর পদক্ষেপ অত্যন্ত জরুরী বলে মনে করেন এলাকাবাসী।