বুধবার   ১২ আগস্ট ২০২০ ||  শ্রাবণ ২৮ ১৪২৭ ||  ২২ জ্বিলহজ্জ ১৪৪১

ACI Agri Business

এন্টি-ডিজিজ সবজি করলা; স্বাদে তেতো কিন্তু গুনে ভরপুর

পুষ্টিবিদ নুসরাত দীপা

প্রকাশিত: ২৩:৩৫, ১১ জুলাই ২০২০

সবজি হিসেবে করলা নামটা শুনলে অনেকেই কপাল কুচকে ফেলেন হয়তো। তবে ভিন্ন স্বাদের কারনে অনেকেই সবজি হিসেবে একে পছন্দ করেন, আবার তেতো স্বাদের কারনে কেউ কেউ একেবারেই মুখে নিতে পারেন না। এই তালিকায় বড়দের চেয়ে ছোটরা বা কমবয়সীদের সংখ্যাই বেশি বলে মনে হয়। করলা গ্রীষ্মকালীন একটি সবজি হলেও এখন প্রায় সারা বছরই কিন্তু পাওয়া যায়। 

এন্টি-ডিজিজ’ হিসেবে পরিচিত স্বল্পমূল্যের এই সবজিটি আমাদেরকে অনেকভাবে সুস্থ রাখতে পারে। আজ আমরা করলার পুষ্টিগুন সম্পর্কে চিরাচরিত কথার বাইরে আরও কিছু অসাধারণ পুষ্টিগুনাগুন জানবো। 

• করলায় প্রচুর পরিমাণে আয়রন থাকে যা হিমোগ্লোবিন তৈরি করে রক্তস্বল্পতা কমাতে সাহায্য করে। 

• করলাতে পালংশাকের চেয়েও বেশি পরিমাণ ক্যালসিয়াম ও কলার চেয়েও বেশি পরিমাণ পটাশিয়াম থাকার কারনে এই করলা দাঁত ও হাড়ের সুস্থতায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে।

• যারা উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের জন্য করলা অত্যন্ত উপকারী। কারণ করলাতে বিদ্যমান পটাসিয়ামের কারনে তা সপ্তাহে দুই তিন দিন খেলে রক্তচাপ স্বাভাবিক হতে তা সহায়তা করে। আর রক্তচাপ বা ব্লাড প্রেসার স্বাভাবিক থাকা মানে কিন্তু আপনার হার্টকেও ভাল রাখা।

• আমরা কমবেশি সবাই জানি ত্বক সুন্দর রাখতে ভিটামিন সি এর জুড়ি নেই । করলায় যথেষ্ট পরিমাণে ভিটামিন সি থাকার কারনে তা আমাদের ত্বক ও চুলকে সুস্থ রাখে। ভিটামিন সি এর আরেকটা চমৎকার গুন হলো তা যেকোন ধরনের ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিরোধক ক্ষমতা গড়ে তোলে। তাই যাদের ত্বকে ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন, সোরিয়াসিসের সমস্যা, ফাংগাল ইনফেকশন বা ভাইরাল রোগে আক্রান্ত হবার হার বেশি থাকে তারা নিয়ম করেই পরিমিত পরিমাণে করলা খাদ্য তালিকায় রাখতে পারেন।

• করলা ফাইবার সমৃদ্ধ হওয়ায় কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা কমায়।

• করলা তে যথেষ্ট পরিমাণে বিটা ক্যারোটিন রয়েছে। তবে এই যথেষ্টর পাথর্ক্য বোঝাতে গেলে দামী সবজি ব্রকলির কথা বলতে হবে। স্বাস্থ্যকর সবজি হিসেবে এবং বিটা ক্যারোটিন, ক্যারোটিনয়েড সম্দৃদ্ধ সবজি হিসেবে ব্রকলির তুলনা নেই। কিন্তু ব্রকলি থেকেও অনেক বেশি পরিমাণে বিটা ক্যারোটিন রয়েছে  এই স্বল্পমূল্যের করলাতে। যার কারনে আমাদের দৃষ্টি শক্তি ভালো থাকে ও চোখের বিভিন্ন সমস্যা সমাধান সাহায্য করে।

• যাদের ঠান্ডাজনিত এ্যালার্জিক সমস্যা রয়েছে তারা করলা পাতার রসের সাথে অল্প পরিমাণ লেবু, মধু মিশিয়ে খেলে অ্যাজমা ও ব্রঙ্কাইটিস, ফেরেনজাইটিসের মতো গুরুতর শারীরিক অসুবিধায় কিছুটা হলেও আরাম পেতে পারেন ।

• বর্তমানে বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশেই খুব কমন একটি রোগ ডায়াবেটিস। মানুষের অনিয়ন্ত্রিত জীবন যাত্রার কারনে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা অস্বাভাবিক ভাবে বেড়েই চলেছে। করলাতে বিদ্যমান পলিপেপটাইড পি ব্লাড সুগার ও ইউরিন এর মাধ্যমে বের হওয়া সুগার লেভেল নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। করলা শরীরে এডিনোসিন মনোফসফেট অ্যাকটিভেটেড প্রোটিন কাইনেজ নামক একধরনের এনজাইম বৃদ্ধি করে শরীরের সেলগুলোর চিনি গ্রহণের ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। করলার ভাজী বা তরকারীর চেয়ে করলার রস শরীরের কোষের ভিতর কার্বোহাইড্রেট হতে কনভার্ট হওয়া গ্লুকোজের বিপাক প্রক্রিয়া বাড়িয়ে দেয়। যা রক্তের সুগার এর পরিমাণ কমাতে সাহায্য করে।
তাই ডায়াবেটিস রোগীরা নিয়মিত করলার রস বা করলা সিদ্ধ করে খেলে ব্লাড সুগার কন্ট্রোলে রাখতে পারেন।

• যারা সবসময় দুবর্লতা অনুভব করেন তারা নিজেদের বুস্ট আপ করার জন্য পছন্দ অনুযায়ী মেন্যু তৈরি করে করলা খেতে পারেন।

• যারা হয়তো জন্ডিসে কখনো মারাত্বক ভাবে আক্রান্ত হয়েছিলেন যার কারনে লিভার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলো বা অতিরিক্ত এলকোহল গ্রহণ করতেন তাদের অনেকের ক্ষেত্রেই অনেক সময় লিভার নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, সে ক্ষেত্রে প্রাথমিক পর্যায়ে পরিমিত পরিমাণে করলা পাতার রস বা করলার জুস এই সমস্যা উপশমে কিছুটা উপকার করে। পরিমিত পরিমাণে করলা খেলে তা লিভার পরিষ্কার করতে সাহায্য করে, ফলে বদহজম হয়না। তবে জেনে রাখা ভালো যে লিভার সিরোসিসের ক্ষেত্রে যদি অতিরিক্ত করলা বা করলার রস বেশি খাওয়া হয় তবে করলার তেতোর কারনে তা টক্সিন সৃষ্টি করে লিভারের আরও ক্ষতি করতে পারে।

• কাজের চাপ বা মাইগ্রেইন যেকোন কারনেই হোক  করলা কিন্তু মাথা ব্যথা কমিয়া দেয়।

• লাইকোপিন একটি শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এটা আমরা কম বেশি অনেকেই জানি। করলায় প্রচুর লাইকোপিন থাকে। তাই বার্ধক্য ঠেকিয়ে রাখতে করলা খেতে পারেন প্রতিনিয়ত।

তবে কিছু রোগের ক্ষেত্রে করলা খাওয়ায় বিধিনিষেধ রয়েছে। যেমন- যাদের রক্তে পটাশিয়ামের মাত্রা বেশি বা যাদের ক্রনিক কিডনি সমস্যা রয়েছে তাদের করলা না খাওয়াই ভাল।

• করলা আশঁযুক্ত খাবার হওয়ার কারনে ডায়রিয়া বা পেটের পীড়াজনিত রোগীদের ক্ষেত্রে করলা খেতে নিষেধ করা হয়।

• ডায়াবেটিক রোগী হিসেবে যাদের হঠাৎ করে ব্লাড সুগার কমে যায় বা হাইপোগ্লাইসেমিয়া দেখা দেয় তাদের ক্ষেত্রে  প্রতিদিন বা নিয়মিত করলা খাওয়াটা উচিত নয়। 

তবে আপনার শারীরিক চাহিদা, বয়স  এবং রোগ অনুযায়ী আপনার প্রতিদিনের খাদ্যকালিকায় করলা অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রে অবশ্যই একজন দক্ষ পুষ্টিবিদের পরামর্শ নিন।

লেখিকা: ক্লিনিক্যাল ডায়টেশিয়ান, স্কয়ার হসপিটাল, ঢাকা।

Advertisement
Advertisement