সোমবার   ০১ জুন ২০২০ ||  জ্যৈষ্ঠ ১৭ ১৪২৭ ||  ০৯ শাওয়াল ১৪৪১

ইলিশের জীবন রহস্য

উৎপাদন ও ব্র্যান্ডিং এ ভূমিকা রাখবে যেভাবে

বিশেষ প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১০:৫৩, ৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮

ইলিশ হাতে ড. সামছুল আলম ও অন্য গবেষকরা

ইলিশ হাতে ড. সামছুল আলম ও অন্য গবেষকরা

পাটের জীবন রহস্য উন্মোচন সোনালী আঁশের সুদিন ফিরিয়ে আনার জন্য নতুন নতুন জাত উদ্ভাবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ইলিশের জীবন রহস্য উন্মোচন বাংলাদেশের মাছের রাজার ক্ষেত্রে কী ভূমিকা রাখবে সেটি নিয়ে অনেকেরই কৌতুহল রয়েছে কারণ ইলিশ যেহেতু প্রাকৃতিকভাবেই সাগর জলাশয়ে বেড়ে উঠছে।

ময়মনসিংহে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে ইলিশের জীবন রহস্য উন্মোচনের ঘোষণা দেয়ার পর গবেষকদের কাছে এমন প্রশ্ন ছিলো সাংবাদিকদেরও। জীবন রহস্য উন্মোচন গবেষণায় বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের চার গবেষক দলের নেতৃত্ব দেয়া বিশ্ববিদ্যালয়টির ফিসারিজ বায়োলজি এন্ড জেনেটিক্স বিভাগের অধ্যাপক ড. সামছুল আলম বলেন, এই সফলতা ইলিশ মাছের সংরক্ষণ, উৎপাদন ও গুণগত মান বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

ড. সামছুল আলম জানান, ২০১৫ সাল থেকে এই জিনোম সংক্রান্ত গবেষণা শুরু করেন তারা। তিনি বলেন, "জিনোম হচ্ছে কোনও জীবের পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান। জীবের জন্ম, বৃদ্ধি, প্রজনন এবং পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়াসহ জৈবিক কার্যক্রম পরিচালিত হয় জিনোমের মাধ্যমে। "

"ইলিশ সারা বছর সাগরে থাকে। শুধুমাত্র ডিম ছাড়ার জন্য নদীতে আসে। আর এই পূর্ণাঙ্গ জিনোম সিকোয়েন্স থেকেই জানা যাবে এরা কখন, কোথায় ডিম দেবে” বলেন ড. সামছুল আলম। তিনি বলেন, এখন থেকে আমরা নিশ্চিত করে বলতে পারবো কোনটি সাগরের ইলিশ আর কোনটি নদীর, কোনটি পদ্মা এবং কোনটি মেঘনার। ফলে ইলিশের ব্র্যান্ডিং এ এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করেন মাছটির জীবন রহস্য উন্মোচনকারী এই গবেষক।

বাংলাদেশের জলসীমার মধ্যে ইলিশের মজুত কত, কোন ভৌগোলিক এলাকায় এর বিস্তৃতি কী পরিমাণে এসব বিষয়ে জানা যাবে বলেও জানান গবেষকরা।

মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনের প্রায় ১২ শতাংশ আসে ইলিশ থেকে। গত মৌসুমে ইলিশ আহরিত হয়েছে প্রায় ৫ লাখ টন। ওয়ার্ল্ড  ফিশের হিসাব বলছে বিশ্বের মোট ইলিশের প্রায় ৬৫ ভাগই উৎপন্ন হয় বাংলাদেশে। সুস্বাদু হওয়ায় দেশ ও বিদেশে বাংলাদেশের  ইলিশের চাহিদা বেড়েছে অনেক।

এই বিপুল চাহিদা মেটাতে প্রয়োজন ইলিশের উৎপাদন বাড়ানো। আর সেজন্য ইলিশের জন্ম, বৃদ্ধি, প্রজননসহ বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে জানা জরুরি বলে মনে করেন গবেষকরা।

গবেষণা দলের আরেক সদস্য একই বিশ্ববিদ্যালয়ের পোল্ট্রি সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মোঃ. বজলুর রহমান মোল্লা সাংবাদিকদের জানান, প্রথমত ইলিশের জিনোম সিকোয়েন্স জানার মাধ্যমে ইলিশের টেকসই আহরণ নিশ্চিত করা যাবে।

"সেইসঙ্গে অন্য দেশের ইলিশ থেকে আমাদের ইলিশ বৈশিষ্ট্যগতভাবে স্বতন্ত্র কিনা তাও নিশ্চিত হওয়া যাবে", বলে জানান ড. মোঃ. বজলুর রহমান মোল্লা।

 ইলিশের জীবন রহস্য উন্মোচনে কী সুফল পাওয়া যাবে জানতে চাইলে ইলিশ গবেষক ও বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট চাঁদপুর নদী কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আনিসুর রহমান কৃষি প্রতিদিনকে বলেন, এই উদ্ভাবন ইলিশ ভোক্তা ও গবেষকদের জন্য একটি সুখবর। ড. আনিস বলেন, “ইলিশ কখন ডিম ছাড়বে তা ইলিশের আকার, ডিমের আকার, অমাবস্যা ও পূর্ণিমার দিন তারিখের উপর আমরা নির্ভর করি। 
এখন যেহেতু এর জেনোম সিকোয়েন্সিং হয়েছে আমরা এখন এর জীনের বৈশিষ্ট্য থেকে বলতে পারবো মা ইলিশ কখন ডিম ছাড়বে। ফলে এর সময় নির্ধারণ করাটা আমাদের জন্য সহজ হবে।”

এছাড়া ইলিশের জন্য দেশের কোথায় কোথায় ও কতটি অভয়াশ্রম প্রতিষ্ঠা করা বা তুলে নেয়া প্রয়োজন এবং কী ধরণের ফিড স্টক তাদের জন্য রাখা প্রয়োজন তা নির্ধারণ করাও সহজ হবে বলে মনে করেন ড. আনিসুর রহমান।

এই গবেষণা যদি বাস্তবে প্রয়োগ করা হয় তাহলে বাজারে আগের চাইতে বেশি পরিমাণে এবং বেশি সময় ইলিশ পাওয়া যাবে বলে জানান আরেক ইলিশ গবেষক এবং ওয়ার্ল্ড ফিশ বাংলাদেশের ইকোফিশ প্রকল্পের টিম লিডার ড. আব্দুল ওয়াহাব। তিনি বলেন, শুধু তাই নয়, নদীর ইলিশ এবং সাগরের ইলিশের স্বাদের পার্থক্য কী কারণে হয়ে থাকে সেটিও জানা যাবে। এটি ইলিশের গবেষণা, ব্যবস্থাপনা ও ব্র্যান্ডিংকে আরো তরান্বিত করবে বলেও জানান ড. ওয়াহাব।

জীবন রহস্য উন্মোচনের আগে গত বছর আন্তর্জাতিক মেধা-স্বত্ব কর্তৃপক্ষের ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে বাংলাদেশের মাছের রাজা ইলিশ।