বৃহস্পতিবার   ২৪ অক্টোবর ২০১৯ ||  কার্তিক ৮ ১৪২৬ ||  ২৪ সফর ১৪৪১

আশানুরূপ ফসল উৎপাদনে জৈব সার (পর্ব ১)

কৃষিবিদ মীর মোঃ মুনিরুজ্জামান

প্রকাশিত: ১১:৩৫, ২৩ অক্টোবর ২০১৮

অত্যন্ত জণগুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ে আলোচনার পুর্বে কিছু আনুসাঙ্গিক বিষয়ে আলোকপাত করা অপরিহার্য্য বিধায় প্রথমেই সেগুলি পর্য্যায়ক্রমে উল্ল্যেখ করা হলো।

খাদ্যঃ যে সকল অজৈব (Inorganic) বা জৈব (Organic) যৌগ (Compond) বা দ্রব্য/জিনিষ (Material) খেয়ে/গিলে ফেলে (Swallow) বা গ্রহণ (Injest) করতঃ হজম (Digest) করার মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনধারণ (Life leading) তথা দেহবৃদ্ধি (Body developement) ও যৌন কর্মকান্ড সম্পাদনের মাধ্যমে বংশ বিস্তার (Reproduction) করা সম্ভব, সেগুলিই খাদ্য !

মানুষ, পাখী বা জন্তুর মত জৈব বা অজৈব খাবার খাওয়ার জন্য উদ্ভিদ বা গাছ বা বিভিন্ন ফসলের মুখ নেই। গাছ তার শিকড়স্থ মূল রোম (Root hair) বা পাতার সাহায্যে পানির দ্রবন হিসাবে মাটি, পানি বা বাতাস থেকে বিভিন্ন মৌলিক পদার্থ (Nutrient elements) আয়নিক আকারে (Ionic form) শুষে (Suck) নিয়ে পাতায় পরিবহন (Transport) করে এবং আলো ও পানির উপস্থিতিতে সালোকসংশ্লেষণ (Phosynthesis) এর সাহায্যে জৈব রাসায়নিক বিক্রিয়ার (Bio-Chemical Reaction) মাধ্যমে জটিল জৈব যৌগ (Complex Organic compounds) তৈরী করে এবং অংগজ বৃদ্ধি সহ জৈবিক কর্মকান্ড তথা ফুল, ফল উৎপাদন করতঃ বংশ বিস্তার করে থাকে। বিভিন্ন মৌলিক পদার্থের (Basic Elements) দ্রবিভূত আয়নই (Ions) গাছের খাদ্য।

অত্যবশ্যকীয় খাদ্যোপাদান (Essential nutrient elements): 

বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষায় দেখা গিয়েছে যে গাছের সুষ্ঠু বাড়বাড়তি ও জৈবিক প্রক্রিয়া সম্পাদনের জন্য ১৬ (ষোল) টি মৌলিক পদার্থ (খাদ্যোপাদান) একান্তভাবে অপরিহার্য্য, যার মধ্যে একটিরও অভাব হলে গাছের জীবনের যে কোন পর্য্যায়ে (at any stage) স্বাভাবিক কর্মকান্ডে কোন না কোন সমস্যা দেখা দিতে পারে। এই ১৬টি মৌলিক পদার্থকে অত্যাবশ্যকীয় খাদ্যোপাদান নামে অভিহিত করা হয়। এগুলির মধ্যে সাতটি পরিমানে অনেক বেশী দরকার হয় বলে তাদেরকে মূখ্য উপাদান এবং নয়টি পরিমানে কম দরকার হয় বলে তাদেরকে গৌণ উপাদান বলে।

মুখ্য উপাদানগুলির মধ্যে কার্বন, অক্সিজেন ও হাইড্রোজেন (C, O, H) বাতাস ও পানি হতে গাছ গ্রহণ করতে পারে। অন্য তিনটি প্রধান মুখ্য খাদ্যোপাদান, যথা - নাইট্রোজেন, ফসফোরাস, পটাশিয়াম (N, P, K) ও তিনটি মূখ্য (অপ্রধান), যথা - গন্ধক, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম (S, Ca, Mg) এবং সাতটি গৌন উপাদান, যথা - দস্তা/জিংক, বোরন, ম্যংগানিজ, মলিবডেনাম, ক্লোরিন, তামা/কপার ও লোহা/আয়রন (Zn, B, Mn, Mo, Cl, Cu, Fe) পানিতে আয়ন হিসাবে দ্রবিভূত অবস্থায় (এক বা একাধিক উপাদান একত্রে) গাছ শিকড়ের সাহায্যে মাটি বা পানি থেকে শুষে গ্রহণ করে থাকে। প্রয়োগ করা হলে পাতার মাধ্যমেও গাছ খাদ্য গ্রহন করতে পারে।

বেশিরভাগ সময়ে বিভিন্ন কারণে মাটির নিজস্ব ভান্ডারে (Parent/Inherent/Initial nutrient reserve) না থাকলে বা ফুরিয়ে গেলে বা ঘাটতি হওয়ায় ঠিক মত গাছের বাড়বাড়তি না হলে গাছ বা ফসলের প্রার্থিত উৎপাদনের জন্য নাইট্রোজেন, ফসফোরাস, পটাশিয়াম (N, P, K) এই তিনটি মুখ্য খাদোপাদান, এক বা একাধিক মৌলিক উপাদান বিশিষ্ট অজৈব সার (Inorganic compound / fertilizer) এর গুড়া বা পাউডার বিভিন্ন মাত্রায় জমির মাটিতে, কিম্বা সম্ভব হলে এক বা একাধিক খাদোপাদানের মিশ্রণ পানির দ্রবণ আকারে গাছ/ফসলের পাতায় ছিটিয়ে প্রয়োগ করা হয়ে থাকে।

সারঃ

গাছের প্রয়োজনীয় মৌলিক পদার্থগুলির অভাব মিটানোর জন্য খাদ্য হিসাবে মাটি বা গাছ জন্মানোর মাধ্যমগুলিতে (Growth media) আমরা বিভিন্ন মৌলিক পদার্থ সম্বলিত যে জৈব (Organic - গোবর বা আবর্জনা পঁচা, সবুজ সার, কেঁচো সার ইত্যাদি) বা অজৈব (Inorganic - ইউরিয়া, টিএসপি, এমওপি, জিপসাম ইত্যাদি) দ্রবাদি প্রয়োগ করে থাকি সেগুলিকে এক কথায় সার (Manure - Organic origin or Fertilizar - Inorganic origin) বলা হয়।

জৈব সারঃ

জৈব পদার্থ বলতে আমরা জীব জাতীয়, অর্থাৎ প্রাণী ও উদ্ভিদের দেহাবশেষ এবং নিঃসরিত ও সংশ্লেষিত দ্রব্যাদি বুঝে থাকি, যা সতেজ, অল্প পঁচনকৃত, পচনরত বা সম্পুর্ণ পচনকৃত, এমনকি হিউমাস ইত্যাদির যে কোন পর্যায়ের হতে পারে। আদর্শ মাটিতে ৫% জৈব পদার্থ থাকা উচিত। সাধারনত গাছের শুকনা বা কাঁচা পাতা, লতা, নরম ডালপালা, খড়, নাড়া, ফসলের অবশিষ্টাংশ, ধানের চিটা, তুষ, ফসলের খোঁসা, আঁখের ছোবড়া, কড়াতের গুড়া, দ্রুত বর্ধনশীল শুটিজাতীয় গাছ (যেমন- ধৈঞ্চা, বরবটি, খেসারী, শন পাট ইত্যাদি), এজোলা, বাড়ী ঘরের ঝাঁট দেওয়া ময়লা আবর্জনা, জীব জন্তুর নাড়ীভুঁড়ি, দেহাবশেষ, রক্ত, গোবর, মল মূত্র, হাঁস মুরগীর বিষ্ঠা, কেঁচো, মাছের অবশিষ্টাংশ, পৌর ময়লা, কাঁচা/সবজি বাজারের ফেলা পাতা ও আবর্জনা, স্লারী, সিউয়ারেজ স্লাজ ইত্যাদি প্রাপ্ত জৈব পদার্থ জীবিত ও মৃত অনুজীব সহ মিশিয়ে নিয়ম মত নির্দিষ্ট সময় যাবৎ পঁচিয়ে জৈব সার তৈরী ও মাটিতে প্রয়োগ করার কাজে ব্যবহৃত হয়ে থাকে।

জৈব পদার্থ মাটির জীবনী শক্তি (Life blood) হিসাবে কাজ করে ! জৈব সারে গাছের জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরণের খাদ্যোপাদান পাওয়া যায়। এটি মাটির স্বাস্থ্য ভালো রাখা সহ মাটিকে ঝুরঝুরা করে, মাটির বুনট উন্নত করে, গাছে শিকড় বাড়তে ও কেঁচো ইত্যাদি চলাচলে সাহায্য করে, পানি ও বিভিন্ন খাদ্য উপাদানকে ধরে রাখতে (Adsorb) ও ধীরে ধীরে যোগান দিতে সাহায্য করে, ধুয়ে (Wash away), উবে গিয়ে (Volatalize), কিম্বা নীচের দিকে চুঁইয়ে (Leach) গিয়ে খাদ্যোপাদানকে নষ্ট (Loss) হতে দেয় না, বিভিন্ন অনুজীবের কার্য্যকারিতা বাড়ানো সহ খাদ্য ও জৈব রাসায়নিক প্রক্রিয়ার জন্য শক্তি যোগায়, জৈব রাসায়নিক প্রক্রিয়া উন্নত করে, তাপমাত্রার পরিবেশ বজায় রাখতে সাহায্য করে।

(চলবে....)

লেখক: প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (অবসর), খামার ব্যবস্থাপনা ও মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগ, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি), গাজীপুর - ১৭০১, বাংলাদেশ।