সোমবার   ০১ জুন ২০২০ ||  জ্যৈষ্ঠ ১৭ ১৪২৭ ||  ০৯ শাওয়াল ১৪৪১

করোনা সংকট

অগ্রাধিকারে বৈষম্য, হুমকিতে পড়বে পুষ্টি নিরাপত্তা

কৃষিবিদ মশিউর রহমান

প্রকাশিত: ০১:৩৩, ২৫ এপ্রিল ২০২০

যে পর্যন্ত কোভিড-১৯ মহামারী নিয়ন্ত্রণের উপযুক্ত কোন ঔষুধ বা টিকা আবিষ্কার হয়নি, সে পর্যন্ত রোগটির সাথে লড়াই করার অন্যতম অস্ত্র হলো মানুষের প্রাকৃতিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা (inherent immunity). করোনা ভাইরাসের হাত থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে গবেষকরা এ পর্যন্ত যতগুলো সম্ভাব্য উপায় বাতলে দিয়েছেন তার মধ্যে এটিই সর্বাধিক গ্রহনযোগ্য মনে হয়েছে সর্বসাধারণের মধ্যে। আর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে সুসংগঠিত করতে হলে তাদের পরামর্শ অনুযায়ী সুশৃংখল জীবন অভ্যাস গড়ে তোলার পাশাপাশি দরকার পরিমিত পরিমাণে পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করা। আর বাংলাদেশের মানুষের জন্য অন্যতম পুষ্টিকর খাদ্য তথা মাছ, মাংস, দুধ, ডিম ও পোল্ট্রির যোগান দেয়ার ম্যান্ডেট রয়েছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের। অথচ খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনোর অগ্রাধিকার তালিকায় কৃষি মন্ত্রণালয়ের নামের সাথে রাখা হয়নি এই মন্ত্রণালয়ের নাম।

বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, মহামারী করোনা ভাইরাসের প্রভাবে খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে পৃথিবীর বহু দেশের সরকার প্রধানদেরকে উদ্বিগ্ন মনে হলেও বাংলাদেশ এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম বলতেই হবে। যে জাতির চালিকা শক্তি হিসেবে খ্যাত মন্ত্রণালয়ের আধিকারিকগণ দেশের মানুষের দৈনন্দিন খাদ্য তালিকা থেকে মাছ, মাংস, দুধ, ডিমের নাম বাদ দিতে পারেন, সে জাতির ভাগ্যে আর যাই থাকুক না কেন, পুষ্টিহীনতা দূর হবার সম্ভবনা কম।

আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, শেখ হাসিনা এক্ষেত্রে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী যে আমাদের মতো উর্বর জমি ও পরিশ্রমী মানুষ যেখানে রয়েছে সেখানে কখনো খাদ্যের অভাবে মানুষ মারা পড়বে না। অত্যন্ত যৌক্তিক তার এ আত্মবিশ্বাস। তিনি বিভিন্ন সময়ে তার বক্তব্যের মাধ্যমে কোভিড-১৯ মহামারী মোকাবেলায় খাদ্য উৎপাদনের সাথে জড়িত মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোকে অগ্রাধিকার খাত হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন। কিন্তু গত ২২ এপ্রিল তারিখে অর্থ মন্ত্রণালয় হতে জারিকৃত ১৭৮ নং পরিপত্রে কেবল কৃষি মন্ত্রণালয়কে খাদ্য উৎপাদনের সাথে জড়িত বিধায় অগ্রাধিকার প্রাপ্ত খাত হিসেবে ঘোষণা করলেও সেখান থেকে বাদ পড়েছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের নাম। এ বাদ পড়াটা অত্যন্ত দুঃখজনক। কেননা, সরকার প্রধান কর্তৃক সময়ে সময়ে প্রদানকৃত নির্দেশনা থেকে মৎস্য অধিদপ্তরের একজন কর্মী হিসেবে এটা আমার কাছেও সহজেই অনুমেয় ছিল যে, খাদ্য উৎপাদনের সাথে জড়িত অন্যান্য মন্ত্রণালয়, সংস্থা ও অধিদপ্তরের ন্যায় মৎস্য অধিদপ্তরও তার চলমান উন্নয়ন প্রকল্পের পাশাপাশি নতুন করে বিশেষ বরাদ্দ পেতে যাচ্ছে। সেই অতিরিক্ত বরাদ্দ কিভাবে সর্বোত্তম দক্ষতার সাথে ব্যয় করতে পারে অধিদপ্তর, সে বিষয়ে আমি এর আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়েছিলাম।

বাংলাদেশের মানুষের দৈনন্দিন খাদ্য ও পুষ্টি তালিকার অন্যতম অনুসংগ হিসেবে মাছের যে ক্রমবর্ধমান চাহিদা রয়েছে, তার যোগান ঠিক রাখতে হলে মৎস্য অধিদপ্তরের করণীয় কি হতে পারে, সেটাই ছিল আমার পূর্বোক্ত লেখার মূল লক্ষ্য। কিন্তু আমার কোন রকম পূর্ব ধারণাই ছিল না যে, অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাগণ মানুষের খাদ্য তালিকা থেকে মাছ, মাংস, দুধ, ডিমের নাম আগেই বেধরক বাদ দিয়ে দিতে পারেন। পুষ্টির বদলে তারা কেবল দানাদার শস্য (food grains) ও শাক-সব্জিকেই (Vegetables) সম্ভবত মানুষের খাদ্য নিরাপত্তার অংশ হিসেবে বেছে নিয়েছেন। তা না হলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক বারংবার নির্দেশনা দেবার পরেও অর্থ মন্ত্রণালয় কিভাবে এমন পরিপত্র জারি করতে পারে , তা সত্যিই আমার বোধগম্য নয়।

পরিপত্রে করোনা ভাইরাসের কারণে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সরকারকে অগ্রাধিকার খাতসমূহে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে উল্লেখ পূর্বক ২০১৯-২০ অর্থ বছরের সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (আরএডিপি) বাস্তবায়নে কতিপয় বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। কিন্তু বিশেষভাবে লক্ষনীয় যে, পরিপত্রের ২নং ক্রমিকে অগ্রাধিকার প্রাপ্ত খাত হিসেবে চিকিৎসা খাতে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণায়, এবং খাদ্য উৎপাদন খাত হিসেবে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাস্তবায়নাধীন উন্নয়ন প্রকল্পসমূহকে ব্যয় নিয়ন্ত্রণের সেই তালিকা থেকে অব্যহতি দেয়া হয়েছে। এ থেকে স্পষ্ট বুঝা যায় যে, করোনা মহামারীর প্রভাব থেকে মৎস্য উৎপাদনে প্রবৃদ্ধির ধারা রক্ষা করার জন্য নতুন বিশেষ ধরণের কর্মসূচী ও প্রকল্প গ্রহণ তো দূরে থাক তার চলমান প্রকল্পসমূহের অর্থায়ন টিকিয়ে রাখাই মুশকিল হয়ে যেতে পারে, বৈকি?

অথচ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে বিগত ০৯ এপ্রিল, ২০২০ তারিখে জারিকৃত ১৭৮নং পরিপত্রে কৃষি মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন দপ্তর ও সংস্থাসমূহকে জরুরী প্রয়োজনীয় পরিসেবা প্রদানকারী হিসেবে চিহ্নিত করে তাদেরকে সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটির আওতামুক্ত রাখা হয়েছে। এমনকি সেই পরিপত্রে কৃষি পণের পাশাপাশি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উৎপাদন ও বিপণনের সাথে জড়িত যানবাহন, শ্রমিক ও কর্মীদের চলাচলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হয়েছে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে এমন অনেক সংস্থাও তো রয়েছে, যাদের খাদ্য উৎসাপদনের সাথে দূরতম কোন সম্পর্কও নাই – উদাহরণস্বরুপ তুলা উন্নয়ন বোর্ডের কথা বলা যেতে পারে। তাদের চলমান প্রকল্পের বরাদ্দও কি তাহলে বহাল তবিয়তে থাকবে? কিংবা তারাও কি অগ্রাধিকার খাত হিসেবে বিশেষ বরাদ্দ পাবে? যেহেতু তারা কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন!

আমাদের সরকার প্রধান তথা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত সংবেদনশীল দেশের মানুষের কষ্ট লাঘবের বিষয়ে। তিনি আগ বাড়িয়ে আরো একটি সাহসী ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, দেশের এই সংকটকালে অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় কর্তন করে তা করোনা মোকাবেলায় ব্যয় করা হবে। ইতোমধ্যেই তিনি প্রায় লক্ষ কোটি টাকার বিভিন্ন প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন। সেসব প্রণোদনা কাজে লাগিয়ে নিশ্চয়ই আবার ঘুরে দাঁড়াবে বাংলাদেশের অর্থনীতি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সেই ঘোষণার ধারাবাহিকতাই অর্থ মন্ত্রণালয় চলতি ২০১৯-২০ অর্থ বছরের আরএডিপি বাস্তবায়নে কতিপয় বিধিনিষেধ আরোপ করে উক্ত পরিপত্র জারি করলো। কিন্তু খুবই অল্প কিছু দিনের ব্যবধানে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে ইস্যুকৃত দুই পরিপত্রের ভাষা দুই রকম হওয়ার কারণে সেক্টর সংশ্লিষ্টদের মধ্যে একটি বিভ্রান্তির সৃষ্টি হতে পারে। আর এর দ্বারা দেশের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উৎপাদন বাধাগ্রস্থ হলে প্রকারান্তরে ক্ষতিগ্রস্থ হবে দেশের আপামর জনসাধারণ। আর সে কারণে কারোর ইমেজ সংকট হলে তা হবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর। যিনি দেশের মানুষের জন্য দানাদার খাদ্যের পাশাপাশি বারংবার মাছ, মাংস, দুধ, ডিম, পোল্ট্রি উৎপাদন বৃদ্ধির তাগাদা দেয়ার পরেও তার সে নির্দেশনা বাস্তবায়ন পর্যায়ে এসে অর্থ মন্ত্রণালয় কর্তৃক এমন ভ্রান্তি সৃষ্টি করাটা একেবারেই অনভিপ্রেত।

পুনশ্চঃ প্রশ্ন আসতেই পারে – এটা কি তাহলে অনিচ্ছাকৃত কোন ভুল? কিংবা সিম্পলি কারণিক ভুলের কারণে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের নাম বাদ পরেছে অগ্রাধিকার প্রাপ্ত তালিকা থেকে। যদি কারণিক ভুল হয়ে থাকে তাহলে অবশ্যই খুশী হবো এই ভেবে যে দ্রুততম সময়ে সেই ভুল সংশোধন হবে। আর যদি সচেতনভাবেই মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়কে খাদ্য উৎপাদনের সাথে সম্পর্কিক বিবেচনায় সৃষ্ট অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়ে থাকে, তাহলে বলবো, যে জাতির চালিকা শক্তি হিসেবে খ্যাত মন্ত্রণালয়ের আধিকারিকগণ দেশের মানুষের দৈনন্দিন খাদ্য তালিকা থেকে মাছ, মাংস, দুধ, ডিমের নাম বাদ দিতে পারে, সে জাতির ভাগ্যে আর যাই থাকুক না কেন, পুষ্টিহীনতা দূর হবার সম্ভবনা কম।

লেখক: সহকারি পরিচালক, মৎস্য অধিদপ্তর।